Tuesday, 12 September 2023

রবীন্দ্র পরম্পরা - মহাশ্বেতা দাস // ই-কোরাস ৩৬

 


রবীন্দ্র পরম্পরা

পর্ব - ৩৬

আলোর আড়ালে

মহাশ্বেতা দাস 

                    

  "আমার এ ধূপ না পোড়ালে গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে " 

    নিজস্ব প্রতিভা কম ছিলো না। তবু শুধুমাত্র "বাবামশায়ের" ইচ্ছে পূরণের লক্ষ্যে যে মানুষটি জীবনের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন তিনি আর কেউ নয় "রথি" .... রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মৃণালিনী দেবীর দ্বিতীয় সন্তান জৈষ্ঠ্য পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

        

      বিশ্বকবির রবি কিরণের আড়ালে রথীন্দ্রনাথের  প্রদীপের নীচে অন্ধকারের সমতুল্য জীবন পলে পলে মহাভারতের কর্ণের কথা মনে করিয়ে দেয়। 

          শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মবিদ্যালয় যে পাঁচজন ছাত্রকে নিয়ে তার পথ চলা শুরু করেছিল রথীন্দ্রনাথ তাদের মধ্যে অন্যতম। রথি'র প্রাথমিক শিক্ষা শান্তিনিকেতনের মাটিতে এভাবেই শুরু হয়েছিল। তারপর বাবামশায়ের ইচ্ছেতেই আর্বানায় ইলিনয়ের স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে কৃষি বিজ্ঞানে বি. এস হয়ে দেশে ফিরে আসা। বিদেশে থাকা কালীন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক চিঠিতে ছেলেকে লিখলেন - " আমাদের দেশের হাওয়ায় কী চাষা কী ভদ্রলোক কোনমতে সমবেত হতে জানে না। তোরা ফিরে এসে চাষাদের মধ্যে থেকে তাদের মতি গতি যদি ফেরাতে পারিস তো দেখা যাবে।" 

    ছেলের মুখে কৃষিবিদ্যা, প্রজনন শাস্ত্র শুনতেন খুব মন দিয়ে। রথীন্দ্রনাথের কথায় - " সেই সময়টাতে আমরা পিতাপুত্র পরস্পরের যত কাছাকাছি এসেছিলাম তেমন আর কখনও ঘটে নি।" 

       এবার রথি'র জীবনে নেমে এলো বাবামশায়ের ইচ্ছে পূরণের আর এক কঠিনতম পরীক্ষা। ১৯১০ সালে রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেতেই রথীন্দ্রনাথ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন প্রতিমা দেবীর সাথে।  অবনীন্দ্রনাথ এবং গগনেন্দ্রনাথের বোন বিনয়িনী দেবী ও শেষেন্দ্রভূষণ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে ছিলেন প্রতিমা দেবী । রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী ছোট প্রতিমাকে দেখে তাকে নিজের পুত্রবধূ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন একসময়। কিন্তু মৃণালিনী দেবীর অকালমৃত্যুর ফলে তা সম্ভব হয়নি। জীবন তো থেমে থাকে না! তাই  মাত্র ১১ বছর বয়সে প্রতিমার বিয়ে হয়ে গেল গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটবোন কুমুদিনীর ছোট নাতি নীলানাথের সাথে। কিন্তু নিয়তির অমোঘ লীলা ঠেকায় কে?..... বিয়ের অল্পকিছুদিনের মধ্যেই গঙ্গায় সাঁতার কাটতে গিয়ে জলে ডুবে  মৃত্যু হল নীলানাথের।  পাঁচ বছর পরে রবীন্দ্রনাথ নিজের  ছেলে রথীন্দ্রনাথের  সাথে  প্রতিমার আবার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। এর আগে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি সমাজ সংস্কারকে অগ্রাহ্য করে অনেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বটে। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেয়ে সুজাতা কে ব্লাউজ/সেমিজ পরিয়ে বিয়ের আসরে বসানো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোন সৌদামিনী দেবী বেথুন স্কুলে পড়তে গেলে তৎকালীন কবি ঈশ্বর গুপ্ত ছড়া লিখলেন- 

 " যত ছুঁড়ি গুলো তুড়ি মেরে কেতাব হাতে নিচ্ছে যবে। 

 তখন এ. বি শিখে বিবি সেজে বিলাতি বোল কবেই কবে।" 

   স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন দীপ্তিমান নারী, বাংলা সাহিত্যের সার্থক লেখিকা। মহর্ষি তাঁকে আশীর্বাদ করেছিলেন - " স্বর্ণ তোমার লেখনীতে পুষ্প বৃষ্টি হউক।" 

   লেখালেখির পাশাপশি তিনি বিধবা বিবাহ ও নারীকল্যাণমূলক কাজ করার মানসে "সখি সমিতি" প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

  আর ঠাকুরবাড়ির পুত্রবধূ জ্ঞানদানন্দিনী দেবী এবং কাদম্বরী দেবী সম্পর্কে তো আগেই বলেছি আবার বলবো প্রসঙ্গ ক্রমে।

  সে যাইহোক মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম হয়েও নিষ্ঠার সঙ্গে হিন্দু ধর্মের সংস্কার মেনে চলতেন। তাই বিবাহের পরিকল্পনায় সেভাবে কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন এর আগে দেখা যায় নি ঠাকুরবাড়িতে।

সেদিক থেকে উল্লেখ্য রথীন্দ্রনাথ আর প্রতিমা দেবীর বিয়ে ছিল ঠাকুর বাড়ির প্রথম বিধবা বিবাহ। 

         

     বাবামশায়ের  নির্দেশেই রথীন্দ্রনাথ শিলাইদহের পতিসরে তৈরী করিয়েছিলেন মাটি পরীক্ষার গবেষণাগার। বিদেশ থেকে আমদানি করেছিলেন ভুট্টা আর গৃহপালিতপশুদের আহারের জন্য  ঘাসের বীজ। তৈরী করিয়েছিলেন লাঙল,ফলা, নানা যন্ত্রপাতি। আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এর কাছ থেকে পতিসরের জন্য চেয়ে এনেছিলেন ট্রাক্টর যা নিজেই চালাতেন। পুরোদমে চলছে যখন এই কর্মযজ্ঞ এবং নতুন দাম্পত্য জীবন…. ঠিক তখনই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতী গড়ে তোলার লক্ষ্যে একা হিমশিম খাচ্ছেন ! তাই ডেকে পাঠালেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ কে। বাবামশায় কে সর্বদিক দিয়ে সুখী করাই যাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত তাঁর কাছে এ আর নতুন কথা কী!! .... আবার পিতার লক্ষ্য পূরণে তাই আহুতি দিলেন নিজের সর্বস্ব। 

         

     ১৯২২ সালে প্রতিমা দেবী আর রথীন্দ্রনাথের মাঝে বাবামশায়ের ইচ্ছেতেই আবার এলো পালিতা কন্যা নন্দিনী, দাদামশায়ের আদরের "পুপে "। 

           

        "যদি আরও কারে ভালবাস

                 যদি আর ফিরে নাহি আসো

      তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও

                  আমি যত দুঃখ পাই গো।" 

      

      সব ঠিকঠাকই চলছিল। কাল হল অতি সাহসী বন্ধুত্বে। শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী মীরার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন রথীন্দ্রনাথ এক অপ্রতিরোধ্য প্রেমের সম্পর্কে। এক অসম্ভব দাবী করে বসলেন…. বন্ধু নির্মলচন্দ্রের কাছে চেয়ে নিলেন প্রায় ৩৬ বছরের ছোট মীরা কে। প্রথাভাঙা অন্তরঙ্গতার দরুণ প্রতিমা দেবী কে রেখে মীরাকে সাথে নিয়ে চলে গেলেন দেরাদুন। যাওয়ার সময় প্রতিমা দেবী কে বললেন-  "লুকিয়ে চুরিয়ে যাচ্ছি না। এখানে সবাই কে জানিয়ে যাচ্ছি। মীরা আমার সঙ্গে যাচ্ছে।" 

     এরপর প্রতিমা দেবীর আর কী বা বলার থাকতে পারে!! দাম্পত্যে একাকীত্ব যেন প্রতিমা দেবীর ললাট লিখন। শিল্পীদের সাধনার জন্য জীবন না কি তাঁদের একাকীত্ব আর বিষাদ উপহার দেয়! প্রতিমা দেবী নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন তাঁর বিভিন্ন সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডে। অভিমানের আগুন কখনও প্রতিমা দেবীর কাজের পথে বাধা হতে পারে নি। 


     পত্র মারফৎ কুশল বিনিময় হতো রথীন্দ্রনাথ আর প্রতিমা দেবীর মধ্যে। যদিও রথীন্দ্রনাথ তখন সমগ্র মন নিয়েই অন্য কারো। সময়ের স্রোত সব আবেগ সব যন্ত্রণা মুছে দেয়। রয়ে যায় কর্মের কোলাহল। তাই শান্তিনিকেতনের সৃষ্টিকর্মেই নিজেকে ডুবিয়ে রাখলেন প্রতিমা দেবী। আর স্বামী রথীন্দ্রনাথ কে লিখলেন - 

    " ভালো আছ এই খবর পেলেই খুশী হব।" 

           …………………………. 


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

প্রচ্ছদ ভাবনা - মহাশ্বেতা দাস

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

Saturday, 9 September 2023

অঞ্জন দাস এর কবিতা // ই-কোরাস ১৪৫


 


আগুনের ধাতুরূপ

অঞ্জন দাস  


ছয়


নেট পেরিয়ে বল চলছে  পেরোয় টেনিস কোট

উল্টো নীলের খাম ভর্তি নেশার পলাশ তোর

এই ছোঁবেনা এই ছুয়েছি বলের বাতাস  সাঁই

ফ্রক ভেঙেছে ব্রেক মারেনি তোর ককিলা ভোর       

   

 সহজ পাঠে ঠাকুমা ভীষণ পুরোনো কান টানে 

 গানের বেলা নিত্যনতুন ফরমেটে পান ভানে

 এই বিকেলে রঙের ঘোড়া পিক্ ফেলেছো  মেঘে

 জোকার শোনে রবীন্দ্রনাথ বাঁকি পুটের গাঙে


জল তো নয় জামাইবাবু টুকরো  কথায় ভাঙে

দইমিষ্টি তাঁতের শাড়ি বাড়ির মুখে তালা

ত্যাাজী ঘোড়া কূলভেঙে চাঁদ ডুবছে কলোনি   

পাড়ায় আসে দমকা বাতাস খিস্তিকাটে শালা     



সাত


"তোমারহাতে ছুঁচ সুতোটি আমার হাতে ফুল

তাইনা দেখে বিশ্বজুড়ে হিংসা হুলুস্থুল"


প্রিয়কবি স্ব-ভূমি সীমানা লেখে পার্বত্য নদী ঢালু পথে 

জলডুবি সিনেমায় রিল ছোটে ভেসে ওঠে দহন মথুরা 

ল্যণ্ডমাইন পোতা আছে বাঁশির ফোকরে কিছু লয়

মনে হয় হত্যা করি কলঙ্ক ভয়ের কিছু গানের পসরা  

 

পরাগে পরাগ ময় চোখ অন্ধকারে নামে খুশিগন্ধ রেণু 

ঘোরশাখা আলো খোলে অনন্ত পতনের প্রিয় প্রসাধনী

পাপড়ি ঠোঁটের কিছু মৌমাছি উড়ে যায় আয় ঠোঁটে

ঝড় ওঠে রটে যায় খণ্ডাংশ মেঘপদ্য সংক্ষিপ্ত জীবনী  


হলুদ পাখির শীষে ঘন হয় টি শার্ট  লবঙ্গ প্রশাখা

অল্প বয়সী জলে  কোমরের যন্ত্রণা  ঢালে নলকূপ  

ততটাই  শীতল বোধ যতটা উষ্ণ রাখো রোদের বর্ণনা

প্রতিবারে লেখো"তোমাকে ছোঁয়ালে কমে আমার অসুখ


আট


সাত সকালে নৌকাবিহার আলমারিতে রাধা

মাটির পথে ডুবল বাঁশি লাগে প্যাচকা কাদা   

শিপন  মেয়ে আক্কেলে তোর ভীষণকালা জ্বর  

পত্রলেখার  রজকিনী পাতায় খোজেন ধাঁধা


দিগন্ত ক্লাব বন্ধ চাবি রামির  তেরো তাস

শান্তিঘাটের চায়না বাতাস ভাঙছে বারমাস

চুমুক দিকে মঞ্চ হলো  ঝিল শুকিয়ে কাট

বেতের রানী তোর কলোনি বাঁশের কারুকাজ


দাঁড়িয়ে থাকিস বাদাম মোড়ে পাল্টে যাবে গলি

সিরিশ  কাগজ তুলছে জীবন  টিন ও খড়ের চালা   

ইনবক্সের  বকুল   মালায়  চণ্ডী দাসের  থলি

আলমারি  তোর পাণ্ডুলিপি শিখছে তাসের খেলা


নয়


"শাঙন রাতে যদি স্মরণে  আসে মোরে......  "


চিরকালের গান  

জল পুরুষের গায়ে কলস চুবালে 

পরিসীমা বেচে দেয় ঘড়ির আওয়াজ    

লাফিয়ে বেরোয় আত্মা কলস জানেনা  

কখন  ঢুকে  পড়ো দেহের গভীরে 


ট্যাপ খোলা মাথা গেলে সরষের বাড়ি

পড়ে নিও পৃথিবীর ভূগোল চারিতা    

কখন উঠলে নয় নামছো কতটা তুমি

বৃহৎ জলোভাগ গ্রহণ বিচারে   


পারঙ্গম সাগরে সংগ্রামী মায়া

ফেলে আসে সংসারী কন্ঠনীল জ্বালা

অবলার কৌশল  সমস্ত দেবতা 

মহালক্ষী পানে করো প্রেম নির্ধারণ


জলপুরুষ গায়ে দেবতার চিহ্ন নেই  

অসুর গেয়েছি তাই  কলসির জলে 

দেওয়ালের বেলাপুড়ে ছুটছে  টায়ার  

হাফ গায়ে কেরোসিন আলো আহরণ     


দশ


কর্পুর নগরী ডাকে গোলাপি বনের টিয়া 

দেবিকার বোধি নাও  মধুপর্ক বাটি

খরাটি মরসুম ঢালো যজ্ঞের আগুনে  

তুমি গন্ধ বাংলা হরফে থেকো খাঁটি


আরতি আওয়াজ ছিল দালানের খাঁজে 

পায়রার ডিমঠোঁটে আত্মগোপন  

ত্রিবর্ণা নদীর ছায়া স্নানে আসে প্রতিদিন

ছুরির ভেতরে  তার কথোপকথন

..........................


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

প্রচ্ছদ - অঞ্জন দাস

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


Tuesday, 5 September 2023

রবীন্দ্র পরম্পরা - মহাশ্বেতা দাস // ই-কোরাস ৩৫

 



রবীন্দ্র পরম্পরা

পর্ব - ৩৫

শমীর পৃথিবী

মহাশ্বেতা দাস 


      "বসন্ত সে যায় তো হেসে, যাবার কালে

      শেষ কুসুমের পরশ রাখে বনের ভালে॥" 

    

  "শমী ঠাকুর" অর্থাৎ কবি পুত্র শমীন্দ্রনাথের জন্ম জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে হলেও তাঁর ছোটবেলাটা বেশিরভাগই কেটেছে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি…. মাঝে মধ্যে কলকাতা আর শান্তিনিকেতনে ঘুরে। ১৯০১ সালে ব্রহ্মবিদ্যালয়ের সূচনা হলে এবং রবিপরিবার ওখানেই বসবাস করতে শুরু করলে শমীও বেড়ে উঠেছেন বোলপুরের মাটিতেই। ওই আশ্রমিক পরিবেশেই তাঁর প্রথম পাঠ শুরু। 

   

     নিরুপদ্রব শান্ত প্রকৃতির ছেলেটি আপনমনে খেলে বেড়ায় বোলপুরের শান্ত পরিবেশে। বাবার লেখা গান,  কবিতা তাঁর বড়ো প্রিয়। আপন মনে গুন গুন আর একটি সাদা খাতায় লিখে রাখেন পছন্দের গান গুলি। খাতার মলাটের উপর লেখা থাকে "বন্দেমাতরম"। আর একেকটি গানের শেষে বাবার অনুকরণে স্বাক্ষর  - "শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর" । রূপে, গুণে, ভাবে, ভঙ্গিতে কবি যেন নিজের শৈশবকেই ফিরে পান এর মাঝে। তাইতো আদর করে ডাকেন "শমী ঠাকুর" বলে। 


      মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু এবং কয়েক মাস পরেই রেণুকা…. শৈশব কাটতে না কাটতেই শমীর জীবনে নেমে এসেছিল মা ও দিদির মৃত্যুর করাল ছায়া। মৃত্যু কী!! এটা ঠিক করে বোঝার বয়সও তার হয়নি তখন! মাতৃহারা শমীকে কবি তাই বোধয় একটু বেশীই কাছে কাছে রাখতেন। তিনি অন্যান্য সন্তানদের সাথে এক শয্যায় ঘুমাতে পছন্দ করতেন না। কিন্তু শমী ইচ্ছে প্রকাশ করলে তাকে লাগোয়া খাটে নিয়ে ঘুমাতেন। গভীর রাতে শমী ঘুমের ঘোরে মা কে খুঁজে হাত বাড়িয়ে দিলে কবি পরম স্নেহে সেই হাত টেনে নিতেন নিজের কাছে। 


    " খোকা এবং খোকার মার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠমধুর সম্বন্ধ সেইটে আমার গৃহস্মৃতির শেষ মাধুরী" 

    এই স্মৃতির পাতা থেকেই উঠে এসেছিল "শিশু" কাব্যগ্রন্থের কবিতা গুলি। অর্থাৎ শিশু কাব্যগ্রন্থের নায়ক (খোকা) রবি-পুত্র শমীন্দ্রনাথই। 

   

    শমী'র দাদা রথীন্দ্রনাথ প্রায় আট বছরের বড়ো ছিলেন শমীর থেকে। রথীন্দ্রনাথ ও খুব স্নেহ করতেন ছোট ভাইকে। রথীন্দ্রনাথ আমেরিকায় কৃষি বিদ্যার শিক্ষা করতে গেলে তাঁকে চিঠিতে আশ্রমের সমস্ত খবরাখবর দিতেন এই ছোট্ট শমীন্দ্র। কোন বন্ধুর সাথে কী কথা হলো, কোন গাছে কী ফুল ফুটেছে, কোন সভায় কোন আবৃত্তি এমনকি জ্যোৎস্না রাতে তাঁরা কোথায় বেড়াতে বেরিয়েছে…. সব কিছুই তাঁর দাদাকে বলা চাই।


     তাঁর সরল-শান্ত হাসি-খুশী মুখ,  নম্র-শিষ্ট আচরণ সবাইকে আকৃষ্ট করত, মুগ্ধ করত খুব। নামমাত্র বিলাসিতা তো ছিলই না তাঁর পোশাকে-আশাকে,...… ব্যবহারে-চালচলনেও ছিল না বিন্দুমাত্র অহংকার। কবি বলতেন -  'আমার ছোট ছেলে শমী লোকজন এলে তাদের মোট ঘাড়ে করে আনত।' শমী বরাবরই দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন, তাই বড় ছেলেরা তাঁকে বেশি ভারী বোঝা বইতে দিতেন না কিন্তু শমী তাতে ক্ষুণ্ন হতেন- দুঃখিত হতেন।


     অধ্যাপক যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এবং ভূপেশচন্দ্র রায়ের সঙ্গে প্রায়শঃই বিকেলের দিকে শমীন্দ্রনাথ যেতেন  ভুবনডাঙায়, সঙ্গে থাকত হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স। গ্রামের অসুস্থ মানুষদের  প্রয়োজন মতো সে-সব ওষুধ বিলিয়ে দিতেন, কখনও রোগীকে বিছানায় বসিয়ে নিজে হাতে ওষুধ খাইয়ে দিতেন। 


    ১৯০৭ সালে বসন্তপঞ্চমীর দিন শান্তিনিকেতনে শমীন্দ্রনাথ ঠিক করলেন ঋতু উৎসব করবেন। রবীন্দ্রনাথ সেই সময় শান্তিনিকেতনে উপস্থিত ছিলেন না। কী আশ্চর্যের বিষয়…. বাবার অনুপস্থিতিতেই মাত্র দশ বছরের ছেলেটি আয়োজন করে ফেললেন ঋতু উৎসবের! নিজে সাজলেন বসন্ত। অন্যান্য ছেলেদের কাউকে শরৎ, কাউকে শীত…. এভাবেই সূচনা হয়ে গেল ঋতু উৎসবের। নিজ কন্ঠে গান গাইলেন- "এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ"।  অনুষ্ঠান হয়েছিল প্রাককুটিরে, আজ যা শমীন্দ্র পাঠাগার বলে পরিচিত। আর এভাবেই ঋতু উৎসবের মধ্যে দিয়ে সূচনা হয়েছিল আজকের বসন্ত উৎসবের। 

    

     "কাছে এল পূজার ছুটি" । মীরা অসুস্থ তাই কবিকে ফিরতে হবে কলকাতায়। শমী কলকাতা যেতে চায়না। এদিকে পূজার ছুটিতে সবাই বাড়ি চলে গেলে শান্তিনিকেতনে শমী একা থাকতে পারবে না।…. কোথায় রাখবেন শমী কে? প্রথমে ঠিক করলেন আশ্রমের শিক্ষক মহাশয় সুবোধচন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে দিল্লী পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু সেখানে তখন ম্যালেরিয়ার প্রকোপ প্রচুর। বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদার কে চিঠি লিখলেন। ঠিক হলো শ্রীশচন্দ্রের ছেলে শমীর সমবয়সী বন্ধু সরোজ চন্দ্র মজুমদার ওরফে ভোলা' র সাথে মুঙ্গেরে ভোলা'র মামাবাড়িতে যাবে শমী। ওদের মুঙ্গের রওনা করিয়ে দিতে কবি সেই সময় এলেন শান্তিনিকেতনে। ১৯০৭ সালের ১৬ই অক্টোবর বিজয়া দশমীর দিনে শমীন্দ্রনাথের যাত্রা শুরু হলো মুঙ্গেরের উদ্যেশ্যে। সেদিন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে বিজয়া দশমীর দিনে শমীর এই যাত্রা ছিল বিসর্জনের যাত্রা। এরপর আর কোনো দিন ফিরে আসেনি সে! 

    

     একমাস পরেই কবির কাছে দুঃসংবাদ এলো শমী কলেরায় আক্রান্ত। ১৭ই নভেম্বর কবি উপযুক্ত ডাক্তার সহ মুঙ্গেরে গেলেন। সেখানেও ভোলা'র দুই মামা ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার। অক্লান্ত চেষ্টা চললো কয়েকদিন ধরেই। কিন্তু সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে ২৪শে নভেম্বর অর্থাৎ পাঁচ বছর আগে ঠিক যেদিন মৃণালিনী দেবী পাড়ি দিয়ে ছিলেন না ফেরার দেশে…. আদরের শমীও পা বাড়ালো মায়ের কাছে যাবে বলে। 

   

   রবীন্দ্রনাথ স্ত্রী মৃণালিনী দেবী ও কন্যাদের বিদায় দিয়েছেন মৃত্যু শয্যার পাশে বসেই। কিন্তু সেদিন রাতে তিনি শমীর কাছে গেলেন না। ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে রইলেন পাশের ঘরে। কবির ভাবনায় - " বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোক তাকে একটুও যেন পিছনে না টানে।" 


      মুঙ্গের শ্মশানেই শমীন্দ্রনাথের  শেষকৃত্য করা হলো। রবীন্দ্রনাথ শ্মশানে গেলেন না…. বসে রইলেন একই রকম ধ্যান গম্ভীর হয়ে। পুত্রশোকাতুর রবীন্দ্রনাথ পরের রাত্রে ট্রেনে করে ফিরে আসার সময় দেখলেন-  "জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথা কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই।  মন বললে, কম পড়েনি- সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তার মধ্যে। সমস্তর জন্যে আমার কাজও বাকি রইল। যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে। সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে, কোনখানে কোন সূত্র যেন ছিন্ন হয়ে না যায়। যা ঘটেছে তাকে যেন সহজে স্বীকার করি, যা কিছু রয়ে গেল তাকেও যেন সম্পূর্ণ সহজ মনে স্বীকার করতে ত্রুটি না ঘটে।" 


    রবীন্দ্রনাথ ফিরে এলেন শান্তিনিকেতনে। তখনও আশ্রমের কেউ সেভাবে শমীর চলে যাওয়ার খবর পায় নি। খবর যখন আশ্রমিকদের কানে গেল… এ যেন  বিনা মেঘে বজ্রপাত! রবীন্দ্রনাথ অবিচল। বাইরে থেকে দেখে বুঝার উপায় নেই। দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই সময় শান্তিনিকেতনে উপস্থিত ছিলেন। তিনি কবির পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শুধু কয়েকবার উচ্চারণ করলেন - "রবি, রবি" ….. কবির চোখের কোণ চিকচিক করে উঠলো। 


  "মৃত্যুর পর সবাই যেখানে যায়, সেখানে মানুষের সেবা পৌঁছয় না কিন্তু ভালোবাসা হয়তো বা পৌঁছায়।" 


    কবি জগদীশচন্দ্র বসু কে একটি চিঠিতে লিখলেন - "আমাদের চারিদিকে এত দুঃখ, এত অভাব, এত অপমান পড়িয়া আছে যে নিজের শোক লইয়া অভিভূত হইয়া এবং নিজেকেই বিশেষ রূপ দুর্ভাগ্য কল্পনা করিয়া পড়িয়া থাকিতে আমার লজ্জা বোধ হয়।" 


   অপরিসীম এই মনের জোর থেকেই তিনি শমীর জামাকাপড় আশ্রমের ছাত্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন। শমীন্দ্রনাথ যে ঋতু উৎসবের সূচনা করেছিলেন কবি সেই উৎসব কে মনে রেখেই পুত্রশোক কে রূপান্তরিত করলেন প্রকৃতি বন্দনায়। 


     "সে  ঢেউয়ের মতন ভেসে গেছে,  

       চাঁদের আলোর দেশে গেছে।" 


প্ল্যানচেট করে শমীর সাথে কথা বলতে চেয়েছিলেন  বেশ কয়েকবার। সত্যাসত্য বিশ্লেষণ তর্কের বিষয়! কবি জেনেছিলেন শমী পরপারে এক নূতন পৃথিবী গড়েছে…. নাম রেখেছে "শমীর পৃথিবী।"  পরপারে শমীর নাকি অনেক কাজ! "শমীর পৃথিবী"  ভরে উঠছে শমীর লেখায়। 


     জীবনের শেষ প্রান্তে তাই কবিরও মনে হয়েছিল… এবার "শমীর পৃথিবী" তে যাওয়ার সময় হয়েছে তাঁর। 


         "আমারে যে জাগতে হবে, 

         কী জানি সে আসবে কবে

        যদি আমায় পড়ে তাহার মনে

       বসন্তের এই মাতাল সমীরণে ॥" 

             …………………….


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

প্রচ্ছদ ভাবনা - মহাশ্বেতা দাস

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

Saturday, 2 September 2023

অঞ্জন দাস এর গুচ্ছ কবিতা // ই-কোরাস ১৪৪




অঞ্জন দাস  এর গুচ্ছ কবিতা

আগুনের ধাতুরূপ

এক


বুকখোলা শহরের আলো মুখে পুরি

চিকচিক হজমোলা ড্রাগনের বিষ

সুতোছাড়ে পৃথিবী নামি মহাপথ

শীল পঞ্জিকা চোখ তুমিও জ্যোতিষ     


কতবার নিয়ে যাবে শ্যাম্পেন   দ্বীপ

বদলানো আগুনের ধাতুরূপ আঁকা

জামাহীন সমুদ্দুর একুশ কিনারে

হারানো  গানের দিন বাতাস পতাকা     

  

ক্লোরোফিল বুড়ো হয় পাতার বয়সী

বোঁটা ছাড়ে মায়াকাল ফুল পাড়ে মাটি

সে তার ভেঙেছে দেখি তারের আওয়াজ

ফোটাও  মুদ্রা ধ্যান লিরিকের ডাঁটি  


দুই


জলপাই রং তুমি  ব্রীজের বক্ষ তুলে নিলে

ক্রুশগতি কঙ্কাল আবহমানের যিশু নয়

নখের অন্তর পাঠে বনময়  বাঘের দেবিকা   

কদর্য জমলেই বাঁক নেবে পেরোনোর ভয় 


ফুরনো কথায় আগে শিষ দেয়  নারকেল  বালা

 পখার বিজোড়  কথা রেকডিং হয় গাছে গাছে

নর্তকী সন্ধ্যা  কতশব্দ আঁকলো তোমার মুখ    

জলথেকে উঠে এল  ফাঁকাবাড়ি বাড়িটির কাছে     


গৃহস্থ  জলায় গুম  প্রতিদৃশ্য দরজাও খোলে

 ছাদেওঠা অতসী বানানো ক্যানেলে মুখ দেখে

 জলপাই রং তুমি   ব্রীজের বক্ষ তুলে নিলে     

একবুক জলপাই নেইলপালিশেই দেবো ঢেকে 



তিন


ঝাউ বাগানের গায়ে গেঁথে যায় ভীষ্ম শলাকা  

শাশ্বতিক  শাসনে সমবেত হাওয়া ভাঙে মাথা

চিদাভাস নির্বাসন তোমার বেনির ফুলে গাঁথি  

বজরা ফোকরে দেখি ঘেঁটেছ ফিরিস্তি কথা  


নিপাতন নিদ্রায় নির্দেশিত নিধুবন ঘোরে  

বটিকা বচসা  ডোবে পলাশ নদীতে ছায়া রং  

মনিপুরী মণ্ডনে মতিহারি রুদ্র বালিকা 

ঝাউ বাগানের গায়ে রোদলেখে প্রিয়াছাড়া জং


মেঘ পুরুষের ধ্বনি ঝমাঝম কাঁপছে  ধরণী

অরণিকাষ্ঠ ভাঙে মহুলের মুকুলিত পালা

তারায় মরে যায় চোখের বিপাশা চাঁদে রাহু

বাহুভেঙে পড়ে বাজ বিপন্ন শাঁখ মুখে তালা



চার


সাইকেল ঢুকে গেছে পাঁজর কলোনি চুপ

পাড়ার অবুঝ ছেলে ফুটো করে হর্টবিট দেখে     

চৈত্র শেলের স্টাইল চোখ মুখ রেলা নেয়  

তেলমাখা গতকাল টেরি কেটে পথে পথ রাখে


জলেপড়া সাবানের সীমায় আয়ত হাত 

ঠেসে যায় অন্ধকার ক্রমশ ঠেলছে আরো কেউ   

সংকেত পেয়েছে পাড়া ভক্তের প্রভুরা ডাকে 

জালে প্রজাপতি ফুল পাপড়ি ভাঙেনি একা ফাউ


সেলাই মেশিনে আলো টুকিটাকি ছেঁড়া দিন

সিটভরতি কোমর অতসী তার উল্লসিত শাঁখে

মায়ের গোছানো গল্প জমাতো বাবুই জেনে   

চেনে এক ঘেয়ে তার কখনো পড়েই যেতো বাঁকে  



পাঁচ


"গোলাপ ফুল তুলতে গেলে হাতে লাগে কাটা

তোমার কথা পড়লে  মনে প্রাণে লাগে ব্যাথা "  


প্রচলিত 

এমন মস্ত চিঠি গাছেরা ও লেখেনি কখনো

গলাভরতি ডাক থাকে হাঁসেদের বর্ষা পুকুরে

তিনতলা বাড়িটার জ্যাকেট ভীষণ গ্লেজি

এসেই জমছে দেখি রোদপাড়া শীতের দুপুরে     


নকল মিত্তালে তখন প্রথম ফাঁসে পরিচিত যুবা

মনেহয় শ্রেষ্ঠ  সুন্দরী তার দীঘার ল্যারিকা ইন

"যত ভাবনা যত স্বপ্নছিল সব দিলাম তোমায়"

সমুদ্রে গর্জন- নট আউট একশো তখনো শচীন   


একদিন চলে এলো আমাদের মচমচ খাটে   

দোয়াত কালিতে পাখা পেছনে নজর ছিলকোনো              

সুপুরি কাটছে জাঁতি আড্ডার বন্ধুরা ঘরে ঘরবাঁধা

এমন মস্ত চিঠি গাছেরা ও লেখেনি কখনো

-----------------------------------


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ১০

  গ্রামীণ গাজন উৎসব, দাসপুর ২ বঙ্কিম মাজী  বাংলায় গাজন উৎসব শব্দের অর্থ গ্রামের জনসাধারণের উৎসব। এই উৎসবে যারা অংশগ্রহণ করেন আমাদের গ্রামীণ...