Tuesday, 17 March 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ১

 


রসকুণ্ডুকে মহিমান্বিত করেছে বাবা বসন্ত রায় জীউ ও তার গাজন মেলা

মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি


   রাঢ় বাংলার অন্যতম তীর্থ জনপদ হল রসকুণ্ডু। বর্ধিষ্ণু এই গ্রামটি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা–৩ ব্লকের মধ্যে অবস্থিত। এই গ্রামটি বর্তমানে সর্বজনবিদিত যে কারণে তা হল এখানে বাবা বসন্ত রায় জীউ-এর মন্দির আছে। এই মন্দিরে দেবাদিদেব মহেশ্বর বা শিব ‘বাবা বসন্ত রায় জীউ’ নামে বিরাজ করেন এবং পূজিত হন। বাবা বসন্ত রায় জীউ-এর  অপার কৃপা ও করুণাধারায় নিত্যদিন সিক্ত হচ্ছে রসকুণ্ডুর পবিত্র মাটি। প্রেম ও ভক্তিরসে পরিপূর্ণ  হয়ে বাবা বসন্ত রায়ের লীলাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই অঞ্চল। বহুকাল ধরে হাজার হাজার মানুষ এখানে অধিষ্ঠিত জাগ্রত দেবতা এই শিব অর্থাত্‍ মহেশ্বরের চরণে নিজেদের নিবেদন করে সুখ-ও শান্তি অনুভব করে আসছেন। বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ এই দেবতাকে একেবারে কাছের জন বলে মনে করেন। প্রতিদিন শ’য়ে শ’য়ে পুণ্যার্থী এখানে আসেন এবং ভক্তিভরে পুজো দিয়ে বাবার কৃপা লাভ করেন। ‘টেরাকোটা’ পত্রিকার সম্পাদক তুলসীদাস মাইতি বাবা বসন্ত রায়ের চরণাশ্রিতা ভক্তিমতী কাঞ্চন পাল-এর “গীতি অর্ঘ্য : নম: বাবা বসন্ত রায়’ গ্রন্থের প্রাক-কথন লিখতে গিয়ে বলেছেন – “শিব বাঙালির খুব কাছের জন। ঘরের মেয়ে উমা, মেনকার জামাতা। একই সঙ্গে আদরের আবার গঞ্জনারও পাত্র, একাধারে ভোলানাথ আশুতোষ  আবার প্রলয়ঙ্করী রুদ্র, শ্মশানচারী ভূতনাথ আবার শিবসুন্দর মহাদেব সর্বমঙ্গলময় দেবাদিদেব। তাঁর পূজায় খুব বেশি নিয়মকানুন, মন্ত্র-তন্ত্র না করলেও চলে। সেজন্য সহজ-সরল-অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত আপামর  স্ত্রী-পুরুষের কাছে বিশেষ প্রিয় তিনি। তাঁর মন্দির সকলের জন্যই অবারিত। প্রকৃত প্রস্তাবে রসকুণ্ডুতে অধিষ্ঠিত দেবাদিদেব বসন্ত রায় মানুষের কাছের দেবতা হিসেবেই প্রকাশিত। পৌরাণিক ও লৌকিক নানান কাহিনি ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই ক্ষেত্রটি এক চলমান ইতিহাসের ধারার মতো বয়ে চলেছে।”

   শিব মন্দির থাকবে আর সেখানে অনুষ্ঠান-মেলা-পার্বণ হবে না তা তো নয়। সারা বছর ধরে এই রসকুণ্ডুর বাবা বসন্ত রায়ের মন্দির স্থলে বিভিন্ন পূজার্চনা ও ক্রিয়ানুষ্ঠান চলে। বিশেষ করে শ্রাবণমাসে ভক্তদের জলঢালা দেখার মতো। শিব চতুর্দশীতেও বিরাট মেলা বসে। তবে সব অনুষ্ঠানকে ছাপিয়ে বিশেষ করে জায়গা করে নিয়েছে এখানকার গাজন মেলা। বাবা বসন্ত রায় জীউকে কেন্দ্র এখানে যে গাজন মেলা বসে তা অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। গড়বেতা-১, গড়বেতা-২ এবং গড়বেতা-৩ ব্লক নিয়ে গড়বেতা। এই তিনটি ব্লকের মধ্যে যত যেখানে শিবের গাজন ও মেলা অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রসকুণ্ডুর এই গাজন মেলা। ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ এবং ওপার বাংলার বাংলাদেশে যে গাজনমেলাগুলি ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে এবং বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে তার মধ্যে এই রসকুণ্ডুর গাজন মেলাও একটি। এখানকার এই মেলাকে কেন্দ্র করে হাজার ছাড়িয়ে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম ঘটে। শুধু গলায় উত্তরীয় নিয়ে বাবার সন্ন্যাস বা ভক্তের সংখ্যাই হয় পনেরো থেকে কুড়ি হাজার। আর বছর বছর এই ভক্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গাজন মেলার ক’দিন হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাগমে রসকুণ্ডু ও আশেপাশের গ্রামগুলির আকাশবাতাস সরগরম হয়ে উঠে। মন্দির এবং মন্দির চত্বর বিভিন্ন রঙ, ফুল ও আলোকমালায় সুসজ্জিত হয়ে উঠে।   

গাজন মেলা হল গ্রাম্য লৌকিক উত্‍সব। গা অর্থাত্‍ গাঁ(গ্রাম) এবং জন অর্থাত্‍ জনগণ। গ্রামের জনগণের মিলন মেলা হল গাজন। প্রচলিত এই ধারণার সম্যক রূপটি ধরা পড়ে রসকুণ্ডুর বাবা বসন্ত রায় জীউ-এর গাজন মেলায়। পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর এই দুই মেদিনীপুরের গড়বেতা, চন্দ্রকোনা, রামজীবনপুর, শালবনী, কেশপুর, ঘাটাল সহ হুগলি, বাঁকুড়া জেলার জয়পুর, আরামবাগ, গোঘাট, কোতুলপুর, ময়নাপুর  ইত্যাদি ব্লকের অসংখ্য গ্রামের মানুষের মধ্যে এই বাবা বসন্ত রায়ের গাজন মেলাকে কেন্দ্র করে যে বিপুল উত্‍সাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দ লক্ষ্য করা যায় তা এককথায় অনবদ্য। গড়বেতা ও চন্দ্রকোনা শহরের মধ্যর্বতী অঞ্চল হল এই রসকুণ্ডু। গাজন মেলার সময়ের চার পাঁচদিন এলাকার  রাস্তাঘাটগুলিতে  বাবার ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের ঢল নামতে দেখা যায়। রসকুণ্ডু মন্দিরের চারপাশ জুড়ে তিন-চার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত সার সার মোটর সাইকেল, সাইকেল, মারুতি, ভ্যানরিক্সা, অটো, টোটো, ট্যাক্সিতে ছয়লাপ হয়ে যায় যে মেলাতে প্রবেশ করাই দু:সাধ্য হয়ে পড়ে। বাবা বসন্ত রায়ের একটুখানি কৃপা ও দয়া পেতে কাতারে কাতারে মানুষ এই বসন্ত রায়ের গাজন মেলাতে ছুটে আসেন। এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের এমন কোনো বাড়ি নেই যে সেই  বাড়ির সদস্য একবারও ভক্ত বা সন্ন্যাসী হয়নি। অনেকে আবার বছর বছর সন্ন্যাস বা ভক্ত হয়ে থাকেন। এ এক আশ্চর্য মহিমা বাবা বসন্ত রায়ের। 

   বাবা বসন্ত রায জীউ-এর র গাজন মেলা অনুষ্ঠিত হয় চৈত্র সংক্রান্তিতে। আর পাঁচটা চৈত্র সংক্রান্তির গাজন মেলার মতোই। বাংলা চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হয় এবং চৈত্র সংক্রান্তিতে শেষ হয়। রেশ থেকে যায় ১লা বৈশাখ পর্যন্ত। মূলত শিবের পুজোকে ঘিরেই বাবা বসন্ত রায়ের গাজন মেলা। গলায় উত্তরীয় নিয়ে শিবের ভক্ত সাজে বা সন্ন্যাসী হয় হাজার হাজার। শুধু পুরুষ ভক্ত নয় অসংখ্য মহিলাও শিবের ভক্ত হয়। বছর বছর মহিলা ভক্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তাই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ এখানে সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনী হতে পারে।  দীর্ঘদিন ধরে রসকুণ্ডুর এই গাজন মেলায় পূজার্চনার কাজ করে আসছেন এখানকার বিখ্যাত পলসাঁই বংশধরগণ। কথিত এই পলসাঁই বংশেরই কোনও একজন স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে বহুকাল আগে প্রথম পুজো শুরু করেন। জনশ্রুতি ও বিভিন্ন লোক কাহিনি থেকে জানা যায় এই রসকুণ্ডু অঞ্চলটি একসময় জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। মানুষজনের তেমন যাতায়াত ছিল না। রাখাল বালকেরা এই জঙ্গলে গরু চরাতে আসত। তারই একজনের একটি দুধেল গাভীর কাছ থেকে বেশ কিছুদিন ধরে দুধ মিলছিল না। বলা যেতে পারে দুধ চুরি হয়ে যাচ্ছিল। গাভীর কাছ দুধ না মেলায় সেই রাখালের মালিক রাখালকে খুব বকাঝকা করতে থাকে। রাখাল কোনো সদুত্তর দিতে পারে না। এরপর গাভীর দুধ কোথায় যাচ্ছে গোপনে তা দেখার জন্য কয়েকজন গাভীর পিছু নেয়। তারা দেখতে পায় ওই গাভীটি গভীর জঙ্গলে গিয়ে লতাপাতায় ঢাকা একটি কালো শিবলিঙ্গের কাছে দাঁড়িয়েছে এবং গাভীটির বাঁট থেকে অঝোরে দুধ ঝরে যাচ্ছে। এরপর পলসাঁই বংশের একজন এই শিবলিঙ্গকে স্বপ্ন দেখেন। অনুমান করা হচ্ছে সম্ভবত তিনিই স্বপ্নাদেশ পেয়ে এখানে শিবের পুজো শুরু করেন। বাঁশ-কাঠ, খড় আর মাটি দিয়ে প্রথম মন্দির নির্মিত হয়। ইনিই হলেন বাবা বসন্ত রায় জীউ। এই সুত্র ধরে আরও জানা যায় একসময় এই মন্দির ছিল পুরোপুরি পলসাঁই বংশেরই। পরে রসকুণ্ডু গ্রামবাসীদের অধীনে আসে। কিন্তু পুজোর দায়িত্ব পান ঐ পলসাঁই বংশ। পুজোর দায়িত্ব ছাড়াও এখনো মন্দিরের একটা অংশ পলসাঁইদের অধীনে আছে। গাজন মেলার মূল দায়িত্ব পালন করেন যখন যিনি বাবা বসন্তরায়ের নিত্য পূজার দায়িত্বে থাকেন। বর্তমানে বাবা বসন্ত রায়ের পূজারি বা সেবাইত আছেন মৃণালকান্তি পলসাঁই। তিনি বসন্ত রায় জীউ এর পুজো যেমন করেন তেমনই অদূরেই আছে শ্রী শ্রী শ্যামামায়ের মন্দির তারও পুজো করেন। শিবের পাশাপাশি তাই শক্তিদায়িনী দেবী কালী মাও বিরাজ করছেন। একই সঙ্গে শিব ও শক্তির আরাধনা চলে এই বসন্ত রায়ের মন্দির চত্বরে। শিব ও শক্তির একটি অপূর্ব মিলন স্থল হিসাবেই গণ্য এই রসকুণ্ডু অঞ্চলটি।  

   রসকুণ্ডুতে বাবা বসন্ত রায় জীউ এর আবির্ভাব কখন ঘটেছিল তা সঠিকভাবে জানা যায়নি অনুমান করা হচ্ছে প্রায় চারশো থেকে সাড়ে চারশো বেশি সময় ধরে বাবা দেবাদিদেব মহেশ্বর এখানে পূজিত হচ্ছেন। তা যাই হোক বাবা বসন্ত রায়ের মন্দির অনেক প্রাচীন। আর সুদীর্ঘকাল ধরে এখানে গাজন মেলাও অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এখানকার গাজনের নিয়ম-নীতি আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে অনেক কথাই জানালেন মন্দিরের বর্তমান পুরোহিত শ্রী মৃণালকান্তি পলসাঁই মহাশয়। রসকুণ্ডুর গাজন মেলার ঢাকের কাঠি পড়ে যায় ঘেঁটু সংক্রান্তি থেকেই। চৈত্র মাসের ২১ কিংবা ২২ তারিখে শনিবার বা মঙ্গলবার দেখে  কামিল্যা পূজার ঘটস্থাপন শুরু হয়। চলতি কথায় যাকে ক্যামলা উঠা বলে। এটাই গাজনের সূচনা। এরপর ২৫ শে চৈত্র একজন বাবার পাটভক্ত হন। তারপরে ২৭ শে চৈত্র দেউল ভক্ত হন। পাটভক্ত যিনি হন তাঁর গলাতে উত্তরীয় প্রথমেই পরিয়ে দেওয়া হয় না। সেটা সংকল্প করে তুলে রাখা হয়। এর কারণ হচ্ছে এখানে বসন্ত রায় জীউ-এর গাজনে অসংখ্য সাধারণ ভক্ত হন। সাধারণ ভক্তদের আবার অনেকেই এখানে উত্তরীয় নিয়ে তাঁরা পছন্দমতো নিজের এলাকায় অন্য কোনো শিবের মন্দিরে ভক্ত হয়ে থাকেন। এবং সেখানকার নিয়ম-নীতি-আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। এদের মধ্যে আবার কেউ কেউ নিয়ম ভঙ্গের দিন এখানে এসে পুরোহিতের মাধ্যমে গলার উত্তরীয় খুলে দেন। পাট ভক্ত হওয়ার পর থেকে সাধারণ  ভক্ত হওয়ার ভিড় পড়ে যায়। তাঁরা সকলেই নিজের নিজের গোত্র ছেড়ে শিবগোত্র ধারণ করেন। সকলের গলায় থাকে উত্তরীয়, পরনে ধুতি এবং হাতে বেতের তৈরি লাঠি। ২৮ চৈত্র সবশেষে হন রাজার ভক্ত। এই রাজার ভক্ত যারা সাধারণ ভক্ত হতে ইচ্ছুক থাকেন সকলকে ডেকেডুকে নিয়ে  বাবার মন্দিরে হাজির করান। রাজার ভক্ত একবার হয়ে গেলে আর সে বছর কোনো সাধারণ ভক্ত হওয়া যাবে না এটাই এখানকার নিয়ম। রাজার ভক্তই শেষ ভক্ত হিসাবে গলায় উত্তরীয় পরিধান করেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে এই বাবা বসন্ত রায়ের গাজন মেলায় চার রকম ভক্ত থাকেন। তাঁরা হলেন পাটভক্ত, দেউল ভক্ত, রাজার ভক্ত এবং সাধারণ ভক্ত। 

   গাজনকে কেন্দ্র করে বিশেষ কিছু  ক্রিয়াকলাপ ও আচার অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এগুলো এখানে পালন করতেই হবে। এটাই এখানকার নিয়ম। প্রথম দিন আলম কাটা। এই আলম কাটা ঘটকদের বাড়ির কাছে বলা যেতে পারে বাবার নিজস্ব যে পুষ্করিণী বা বড়ো দিঘিটি আছে তার বায়ু কোণে একটি বাঁশঝাড় আছে সেখানে গিয়ে একটি বাঁশ কাটা হয়। সেই বাঁশটির মাথায় গাজনের পতাকা বাঁধা হয়। সেই পতাকা বাঁধা বাঁশটি নিয়ে ভক্তরা বাদ্যবাজনা সহযোগে নাচ করতে করতে মন্দিরে নিয়ে আসেন। এটি পুজো দিয়ে  মন্দিরের এক কোণে ঠেসিয়ে রাখা হয়।  একে বলে আলম কাটা। ওইদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে সূর্যপূজা হয়। তারপরে হয় হরগৌরীর পুজো। সারি সারি ভক্তরা বসে পড়েন। মন্ত্র উচ্চারণ করেন। হরগৌরী পূজা শেষে হ্যাদোলা শুরু হয়। মনের মধ্যে অনির্বচনীয় এক আনন্দ নিয়ে ভক্তদের অনেকেই সেই হ্যাদোলাতে দুলতে থাকেন। রাত বারোটায় ওইদিনের গাজন শেষ হয়। 

   পরের দিন হল গামার কাটার পালা। রসকুণ্ডু গ্রামের উত্তর পাড়ায় আছে একটি গামার গাছ। ভক্তরা সেখানে যান । গামার গাছের একটি ডাল কেটে তাকে পতাকার মতো করে নিয়ে আসেন মন্দিরস্থলে। এদিনও আগের দিনের মতো সূর্য পূজা হয়। হরগৌরীর পুজো শেষে ভক্তরা হ্যাদোলাতে দুলে আনন্দ উপভোগ করেন। পরের দিন মেল ও রাত গাজন। মেল বলতে বোঝায় শিবের মাথায় জল ঢালা। রসকুণ্ডু গাজনে মেল ও জলঢালা একটা বিরাট ব্যাপর। জলঢালাকে ঘিরে ব্যাপক আনন্দ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায় এদিন মন্দির স্থলে। ভক্তদের জলঢালা তো আছেই সেইসঙ্গে আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে বাবার মাথায় জল ঢালতে আসেন পুণ্যার্থীরা। মহিলা পুণ্যার্থীর সংখ্যা চমকে দেওয়ার মতো। দেবাদিদেব মহাদেব বাবা বসন্ত রায়ের একটুখানি কৃপা ও দয়া লাভের আশায় পুণ্যার্থীদের ছুটে আসা। সংসারের সুখ-শান্তি লাভ, সন্তানের মঙ্গলকামনা করেন শিবের কাছে। এদিন প্রথমে পুরোহিত, ভক্তরা জল ঢালেন। তারপর সাধারণ ভক্ত ও সাধারণ পুণ্যার্থী। জল ঢালাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ভিড় ও জমায়েত লক্ষ্য করা যায়। একেবারে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট পথ আছে সেই পথ দিয়ে শিবের মাথায় ঢালা ঘটি ঘটি জল বেরিয়ে যায়। ভক্ত ও পুণ্যার্থীরা শ্রদ্ধাবনত চিত্তে, শুদ্ধ বস্ত্র পরে ঘটি ভরে জল নিয়ে এসে বাবর মাথায় ঢালেন। মন্দিরের পিছনে উত্তরদিকে ৫০ মিটার দূরে বাবার নিজস্ব পুষ্করিণী আছে সেই পুকুর থেকে স্নান করে জল নেন ভক্তরা। সকাল থেকেই ভিড়ে ঠাসা হয়ে যায় মন্দির চত্বর। মেলের দিনই রাত্রিতে রাত গাজন। বিকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় সূর্যপূজা। তারপর হরগৌরীর পূজা। রাত দশটার পর থেকে আদাগা ভক্তদের দাগার কাজ শুরু হয়। আদাগা ভক্ত বলতে যারা এর আগে কোথাও কোনো শিব মন্দিরে ভক্ত হয়নি। এই প্রথম ভক্ত হয়েছে। তাদের দাগা হয়। কাকেও আমপাতা গরম করে দাগা হয়, কাউকে গরম ধুনোচুর দিয়ে দাগা হয়। যে যেমনটি চায় সেই মতো দাগা হয়। দেগে দেওয়া ভক্তদের মাথা ঢেকে মন্দিরের চারপাশ ঘোরানো হয়। ভক্তের বাড়ির লোকজন বা তার আত্মীয় স্বজনেরা এই ভক্ত ঘোরানোর কাজটি করে থাকেন।

   ভক্তরা এরপর হ্যাদোলাতে দুলতে থাকেন। মাথা নিচু করে উপর দিকে পা বেঁধে হ্যাদলা দুলানো। নিচে ধুনোর আগুন জ্বলতে থাকে। অনেকে হ্যাদোলা দুলতে ভীষণ পছন্দ করেন। হ্যাদোলা থেকেই নামতেই চান না। অনেকে আবার ভয়ে কুঁকড়ে যায়। ওদিকে মহাদেবের ষোড়শপোচারে ব্যস্ত থাকেন পুরোহিত মশাই। ‘জয় বাবা বসন্ত রায়’, ‘বাবা বসন্ত রায়ের চরণে সেবা লাগে-মহাদেব’ এই সব জয়ধ্বনিতে সারা গাজন মেলা প্রাঙ্গণ সরগরম হয়ে উঠে। রাত তিনটা পর্যন্ত এই রাত গাজন চলে। একই সঙ্গে চলে ধুনুচি নাচ। এই গাজনের ক’টা দিন প্রতিটি ভক্তকেই হবিষ্যান্ন রান্না করে খেতে হয়। নিজের হাতেই মাটির সরা বা  মাটির হাঁড়িতে এই রান্না করতে হয়। মেলের দিন সন্ধেবেলা আর একটা অনুষ্ঠানের রীতি আছে যা চিরাচরিত প্রথা হিসাবেই পালন করে আসা হচ্ছে। তা হল কোনো জিওল মাছ বিশেষ করে মাগুর মাছ এনে তার পুজো দেওয়া হয়। এবং এই মাছটি নির্দিষ্ট একটি যন্ত্র আছে মন্দিরের সেখানে বিশেষ পদ্ধতিতে রাখা হয়। এমনভাবে রাখা হয় যাতে মাছটি মরে না যায়। এই মাছটি বিশেষ একজন জেলের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় যিনি একডুবে এই মাছটি পুকুর বা খাল-নদী থেকে ধরে এনেছেন। মাগুর মাছ না পাওয়া গেলে অন্য কোনো জিওল মাছ  ধরে আনা হয়। রাত গাজনের দিন রাত্রিবেলা বাজি পোড়ানো হয় নির্দিষ্ট দিঘিতে। পাশের রাজ্য ওড়িষ্যা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বাজি কারিগররা আসেন এবং বাজি খেলার কেরামতি দেখান। প্রতিযোগিতা ভিত্তিক এই বাজি পোড়ানো হয়। উড়িষ্যা ছাড়াও হুগলী জেলার কয়াপাট, বদনগঞ্জ, ফুলুই, তাতারপুর প্রভৃতি গ্রাম থেকেও অনেক বাজি কারিগররা এসে থাকেন এবং বাজি পোড়ানো প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। আসাবধান হলে বিপদও ঘটতে পারে।  

    রাত গাজন শেষে আসে দিন গাজন। দিন গাজন শুরু হয় আগুন সন্ন্যাস দিয়ে। আগুন সন্ন্যাসও একটি মজার অনুষ্ঠান। শ্মশানে যাদের দাহ করা হয় সেখানে অনেক আধপড়া কাঠ বা অব্যবহৃত কাঠ পরে থাকে। সাহসী ভক্তরা সেই কাঠ নিয়ে এসে কামদেবকে স্মরণ করে তাকে দাহ করা হয়। রীতিমতো চিতা সাজানো হয়। সেই চিতার আগুনকে সামনে রেখে ঢাক ও নানারকমের  বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়। বিশেষ করে ঢাকিরা ঢাকের মাধ্যমে নানারকম ক্রিয়াকৌশল প্রদর্শন করতে থাকে। গাজনের মূল বাজনা হল এই ঢাক। কোনও বাজনা না হলেও চলবে কিন্তু ঢাক থাকতেই হবে। ঢাকের তালে তালে ভক্তবৃন্দের দল সেই চিতার আগুনকে নিয়ে খেলা করতে থাকে। কেউ গনগনে আগুন কাঠের অঙ্গার হাতে নিয়ে নানান কসরত করতে থাকে, কেউ গনগনে অঙ্গার দিয়ে হাঁটতে থাকে। সে এক মজার আগুন সন্ন্যাস খেলা। আগুন সন্ন্যাস শেষ হয়ে গেলে প্রতিদিনকার মত বিকালে পুজোয় মত্ত হয়। হরগৌরীর পুজো শেষে ভক্তেরা বাবার পুকুরে স্নান করে প্রণাম সেবা খাটে, যাকে দন্ডি কাটা বলে। দন্ডি কাটার সময় সে এক বিরাট ব্যাপার। পুরো মন্দির চত্বরে হুলস্থুল পড়ে যায়। ঢাক অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র তুমুলভাবে বাজতে থাকে। হরগৌরীর মন্দির ও বাবা বসন্ত রায় মন্দিরকে মাঝে রেখে তিনবার প্রদক্ষিণ করে প্রণাম সেবা খাটা ভক্তবৃন্দের দল। ভক্তদের অনেকেই খুব তাড়াতাড়ি এই কাজটি শেষ করে। অনেকে প্রণাম সেবা খাটতে খাটতে রাস্তার মধ্যে শুয়ে থাকে উঠতে চায় না। অনেকে ঢাক ও অন্যান্য বাজনার সঙ্গে সঙ্গে বিভোর হয়ে নাচতে থাকে নাচতেই থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত সকল ভক্তবৃন্দের দন্ডি খাটা বা প্রণাম সেবা খাটা শেষ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত গাজনের অন্যান্য পুজোর কাজ শুরু করা যায় না। তাই কমিটির তরফ থেকে তাড়া দেওয়া হয় যাতে ভক্তবৃন্দ প্রণাম সেবা খাতার কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করেন। ভক্তদের প্রণাম সেবা খাটা শেষ হলে তাঁরা আবার পুকুরে স্নান করে ঘটি ভরে জল নিয়ে বাবার মাথায় ঢালেন। এরপর পুরোহিত তাঁকে স্নান জল খাওয়ান। এরপর মন্দিরের কাউন্টার থেকে গুড় ছোলা সংগ্রহ তা খেয়ে নিয়মভঙ্গ করেন। এইদিন রাত্রে ভক্তরা নিরামিষ রান্না ভাত খান। এইভাবে দিন গাজন শেষ হয়। এইদিনটি হল ৩০শে চৈত্র। পরের দিন ১লা বৈশাখ নতুন বছরের দিন ভক্তরা দাঁড়ি কেটে, গায়ে হলুদ মেখে স্নান করেন। এই দিন হয় আঁশ পাটনা। মন্দিরের নিজস্ব ব্যবস্থায় সমস্ত ভক্তকে মাছ রান্না ভাত খাওয়ানো হয়। রসকুণ্ডু গ্রামবাসী বিশাল এই কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন। বিপুল সংখ্যক ভক্তকে মাছ ভাত খাওয়াতে প্রায় ৪০ কুইণ্ট্যল মাছ লাগে। এই এত পরিমাণ মাছ বাবার নিজস্ব পুকুর থেকে ধরা হয়। অন্য জায়গা থেকেও কিছু কেনা হয়। বেলা পাঁচটার মধ্যে ভক্তদের খাওয়ানোর কাজ শেষ হয়। আর খাওয়ানো শুরু হয় বাবা বসন্ত রায়ের পুজোর পর পরই। ভক্তরা যখন খেতে বসেন তখনই পুরোহিত মশাই নিজে গিয়ে ভক্তদের গলা থেকে উত্তরীয় খুলে নেন। সঙ্গে সঙ্গে ভক্তরা পুনরায় শিবগোত্র ত্যাগ করে নিজ নিজ গোত্রে ফিরে যান। এইভাবে শেষ হয় বাবা বসন্তরায় জীউ-এর গাজন পর্ব।  

   এত বড়ো মেলা। এত ভক্ত, এত লোকজন। সবকিছু সামাল  দেওয়া হয় কী করে? আর এত আর্থিক ব্যয়ভারই বা বহন করে কে? খোঁজ নিয়ে জানা গেল এখানে একটি ট্রাস্টি বোর্ড তৈরি করা হয়েছে। সেই ট্রাস্টি বোর্ডের তিনবারের প্রাক্তন সম্পাদক অরুণকান্তি ভুঁইয়া, বর্তমান সম্পাদক শ্রী সমীর, এখানকার শ্রী শ্রী শ্যামামায়ের সেবিকা কল্যাণী মা, ট্রাস্টি বোর্ডের প্রাক্তন সদস্য সত্যসাধন চৌধুরী এবং পুরোহিত ত্রিপুরানন্দ পলসাঁই জানালেন সেই ট্রাস্টি বোর্ডই মন্দিরের যাবতীয় বিশাল কর্মকাণ্ডকে সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করে থাকেন। এই ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান সদস্য সংখ্যা মোট তেরো জন। ১২ জনকে মনোনীত বা নির্বাচিত করা হয়। একজনকে রসকুণ্ডু গ্রামবাসীরা ঠিক করেন। এই বোর্ডের মেয়াদ তিন বছর। তিন বছর ছাড়া ছাড়া বোর্ডের সদস্যদের পরিবর্তন করা হয়। সদস্যদের মধ্য থেকে সম্পাদক, সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ ঠিক করা হয়। বর্তমান বোর্ডে অর্থাত্‍ ২০২৬ সালে সভাপতি আছেন বাদল দাস, সম্পাদক হলেন সমীর বারিক এবং কোষাধ্যক্ষ আছেন রাজীব ভুঁইয়া।  রসকুণ্ডু গ্রামে আছে ছয়টি পাড়া। জানপাড়া, ঘটকপাড়া, বারিকপাড়া ,দক্ষিণপাড়া, উত্তরপাড়া এবং পশ্চিমপাড়া। প্রতি পাড়া থেকে দু’জন করে সদস্য নেওয়া হয়। রসকুণ্ডু বোর্ডের সদস্য ছাড়াও রসকুণ্ডু গ্রামবাসীরাও মেলাটিকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। 

   আরও জানা গেল মন্দির চত্বর এবং পুষ্করিণী এইগুলি ছাড়া মন্দিরের আয়ের উত্স তেমন নেই। এখানে সারা বছর ধরে যে সকল পুণ্যার্থী ও ভক্তরা আসেন তাঁরা ভক্তিভরে যা দেন এবং প্রণামী দেন তাতেই চলে যায়। এখানে পুণ্যার্থীদের আসার ভিড় এই কারণে হয় বাবা খুব জাগ্রত। বাবার স্বপ্ন দেওয়া বাতের ওষুধ আছে এখানে। যে সকল রোগী বাতের ব্যথায় ভুগছেন তাঁরা এসে বাতের ওষুধ নেন। সে ওষুধ গায়ে মাখতে হয়। ভক্তদের বিশ্বাস এখানকার ওষুধে বাত সেরে যায়। বাতের ব্যথায় আক্রান্ত রোগীদের এখানে রেখেও চিকিত্‍সা করা হয়। রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য বেশ কয়েকজন সেবিকাও আছেন। তাঁদের মাসি বলে সবাই ডাকেন। ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান সম্পাদক শ্রী সমীর রঞ্জন বারিক মহাশয় জানালেন এখানে বাতে আক্রান্ত রোগীদের সেবা করার জন্য ৮৫ জন মাসি রয়েছেন। প্রতিদিনই প্রায় দশ থেকে বারো জন বাতের রোগী ভর্তি হন। এক সপ্তাহ এখানে থেকে চিকিত্‍সা পরিষেবা পাবার জন্য রোগীদের মাত্র ৯০০ টাকা দিতে হয়। তার মধ্যেই রোগীদের থাকা, ওষুধ এবং মাসিদের সাম্মানিক দেওয়া হয়।  রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে যান, আবার নতুন রোগী ভর্তি হন। সুস্থ হচ্ছেন বলেই তো আসেন নইলে তাঁরা আসবেন কেন। বাবার দেওয়া ওষুধে সুস্থ হয়ে আমলাগোড়া শ্রী গোপীকিষাণ ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড এর পরিচালক শ্যামসুন্দর কাজোরিয়া  বাবার মন্দিরের সামনে ভক্তবৃন্দের সুবিধার জন্য নিজ ব্যয়ে একটি সুদৃশ্য নাট মন্দির নির্মাণ করে দেন। সেটা ১৯৭৫ সালের কথা। অনেক বাতের রোগী ভালো হয়ে মানত করেন এখানে গাজন মেলায় ভক্ত থাকার। গাজনের সময় ভক্ত হয়ে তাঁরা সে মানত পরিশোধ করেন। গাজন মেলায় এত সংখ্যক ভক্ত বা সন্ন্যাসী হওয়ায় এটাও একটা অন্যতম কারণ। ২০২৫ সালের শ্রাবণ মাস থেকে বসন্ত রায় জীউ মন্দিরে অন্নভোগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেসকল ভক্তরা এখানে পুজো দিতে আসেন তাঁরা ৪০ টাকার বিনিময়ে এই অন্নভোগ পাবেন। কাউন্টার থেকে সেজন্য টিকিট কেটে নিতে হয়। ভক্তরা যাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গায় বসে  অন্নভোগ খেতে পারেন তারজন্য বিরাট এক পান্থশালা ও রন্ধন শালা নির্মাণ করা হয়েছে। এই নির্মাণ কাজ এখনো চলছে। নাম দেওয়া হয়েছে অন্নপূর্ণার মন্দির। সবে মিলে বাবা বসন্ত রায় জীউ-এর মন্দির এখন জমজমাট। এখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন সবই বাবার কৃপাতেই সুসম্পন্ন হচ্ছে। বেঁচে যাক বাবার প্রতি মানুষের এই বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভক্তি। দেবাদিদেব বাবা বসন্ত রায় জীউ-এর চরণে প্রণাম।  “বাবা বসন্ত রায়ের চরণে সেবা লাগে – মহাদেব-।” 

ঋণ স্বীকার :-

১. মৃণালকান্তি পলসাঁই (পুরোহিত-বাবা বসন্ত রায় জীউ মন্দির)।

২. অরুণকান্তি ভুঁইয়া (প্রাক্তন সম্পাদক-বাবা বসন্ত রায় জীউ ট্রাস্টি বোর্ড)।

৩. সমীর রঞ্জন বারিক ( বর্তমান সম্পাদক-বাবা বসন্ত রায় জীউ ট্রাস্টি বোর্ড)।

৪. সত্য সাধন চৌধুরী ( প্রাক্তন সদস্য–বাবা বসন্ত রায় জীউ ট্রাস্টি বোর্ড)।

৫. ত্রিপুরানন্দ পলসাঁই  (পুরোহিত-বাবা বসন্ত রায় জীউ মন্দির)

৬. তুলসীদাস মাইতি (সম্পাদক-টেরাকোটা)

৭. কাঞ্চন পাল (গীতি অর্ঘ্য : নম:বাবা বসন্ত রায় )

৮. প্রশান্ত পাল ( প্রবন্ধ – ‘শিব শক্তি ধাম-রসকুণ্ডু’)

৯. কল্যাণী মা (সেবিকা -শ্রী শ্রী শ্যামা মায়ের মন্দির) 

ছবি ঋণ : সুমন ভুঁইয়া (শিক্ষক-রসকুণ্ডু)

                 ................................ 


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

প্রচ্ছদ - বিশ্বজিৎ ভৌমিক

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


Sunday, 29 December 2024

অমৃত মাইতি এর গদ্য // ই-কোরাস ১০৮

 



আমি এক নদী

অমৃত মাইতি


আমি এক আঁকাবাঁকা নদী। জন্মের পর থেকেই শুধু বাধা বাধা আর  বাধা। বাধার পাহাড় বেরিয়ে আমি কিন্তু এগিয়ে যাচ্ছি মোহনার দিকে। আমার সিদ্ধান্ত নির্ভুল। বাধা পেয়ে আমি বিচলিত হই না। অনতিক্রম্য হলে আমি আমার পথ ঘুরিয়ে নিই লক্ষ্যবস্তু কিন্তু ঠিক থাকে। চলার পথে আমার কৌশল বদলাতে হয়। কিন্তু মোহনায় যাওয়ার স্থির সিদ্ধান্ত আমি বদলাই না। বাধা পেলে আটকে যাই না। কৌশল বদলাই ঠিকই কিন্তু কৌশলটা আমার শেষ কথা নয়। আমার শেষ কথা মোহনায় যাওয়া। আঁকাবাঁকা পথে মনে হয় আমি বোধহয় কোথাও হারিয়ে গেছি। কিন্তু না। আমার সঙ্গে এগোতে থাকো দেখবে আবার বাঁক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি সামনের দিকে। চপলমতি মানুষ আমাকে ভুল বুঝতে পারে। বাঁক নেওয়ার সময় মনে  হতে পারে আমি হারিয়ে গেছি। পরক্ষণে তুমি দেখবে তোমার ভুল ভেঙ্গে গেছে। আমি কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার জন্য জন্মাইনি। নদীর স্থবিরতা তার কলঙ্কময় জীবন। গতিময় নদী তার বৈশিষ্ট্যকে ধরে রাখে। সে কিছুতেই শ্যাওলা জমতে দেয় না তার দেহে। শ্যাওলা জমে যাওয়া তার সৃষ্টির অসম্মান। শ্যাওলা শরীরকে অসুস্থ করে দেয়। তার গতিপথ সমাজদেহ ভূমিপৃষ্ঠ তার বক্ষস্থল । তার অবলম্বন। বালি মাটি কাঁকর পাথর ভাঙ্গা নুড়ি নদীর অলংকার। নদীর দুই পাড়ে সবুজ বনানী জনপদ জনতার আদালত তার পাহারাদার। আমি এমনি এক নদী কখনো আমার ভাঙ্গনের রুপ দেখে মানুষ মনে করে এই বুঝি নদী হারিয়ে গেল অন্য পথে। সজাগ জনপদ সজাগ জনতা ঠিক আমার পাশে সতর্ক প্রহরার মতো আমাকে সঠিক রাস্তায় প্রবাহিত করার শত চেষ্টা তাদের। কত অন্ধকার রাত্রি নক্ষত্র তাকিয়ে থাকে নদীর দিকে। বেগবতী নদী সব দেখে। নদীর নির্ঘুম রাত কাটে অমাবস্যার সৌন্দর্য আর তার শরীরের ঢেউ গুনতে গুনতে। রাতের স্নিগ্ধ বাতাস আর ভাটিয়ালি সুরে মাঝির গান নদীকে পাগল করে দেয়। নদী যেন নান্দনিক তত্ত্বের জন্মদাত্রী। বুড়িগঙ্গা থেকে বরিশালের পথে লঞ্চের ডেকে বসে বসে রাতের গঙ্গার মোহিনী রূপ আর দুই তীরের অপরূপ রূপে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। নিজেরই অজান্তে কখনো নদী হয়ে যাই । মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনটা  সত্যিই যদি নদী হয়ে যায় তাহলে এক আদর্শ জীবনের খোঁজ পাই।নদীকে অস্বীকার করে না কেউ ,যদিও সে হারিয়ে যায় মোহনায় । কিন্তু উৎসকে অস্বীকার করা মুর্খামি এবং স্থূল-বুদ্ধির পরিচয়ক। মোহনাও জানে তার সমস্ত নির্জনতা নদীর সঙ্গমস্থল। আমি এখন মোহনায় যাব সেখানে কি সীমাহীন নির্জনতা। মোহনা আমাকে হাতছানি দিচ্ছে। মোহনা আমাকে ডাকছে তার সীমাহীন সৌন্দর্য আর নির্জনতায় ভরিয়ে দিবে আমাকে। জীবনানন্দ তখন আমাকে কানে কানে বলে,"তুমি জল, তুমি ঢেউ -সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন /তোমার দেহের বেগ তোমার সহজ মন/ভেসে যায় সাগরের জলে আবেগে"।

সেদিন রাতের অন্ধকারে জল আর ঢেউ ভালবেসে লঞ্চে উঠেছিলাম।"তোমাকে কে ভালবাসে,তোমারে কি কেউ/বুকে ধরে রাখে/জলের আবেগে তুমি চলে যাও/জলের উচ্ছ্বাসে পিছে ধুধু জল তোমারে যে ডাকে/। আমি তখন তাকিয়ে বরিশালের দিকে। হয়তো বরিশালও আমার দিকে তাকিয়ে আছে আপ্যায়নের জন্য।যেন " নিশীথের বাতাসের মতো/একদিন এসেছিলে,/দিয়েছিলে এক রাত্রি দিতে পারি যত"/কেবিনে গিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করি।"ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে"।"ওইদিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর"। আদিম রাত্রির ঘ্রাণ/বুকে লয়ে অন্ধকারে গাহিতেছে গান"। ইচ্ছে তো জাগেই নদী হয়ে যেতে।"ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকব-ধীরে ধীরে পৌষের রাতে-কোনদিন জাগবো না আর/কোনদিন জাগবো না আমি কোনদিন আর"।

আমিও মনে করি আমি নদীর মত। আমিও নদী ভালবেসে তার জল আর ঢেউ ভালোবেসে নিজের শরীরটাকে ভেঙ্গে চুরে তার সমস্ত গুণাবলী গায়ে মেখে নিয়ে নদী হয়ে যাই।


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


Sunday, 22 December 2024

অমৃত মাইতি এর গদ্য // ই-কোরাস ২০৭

 


শীতকাতুরে

অমৃত মাইতি 

এক.

শীতকাল কেন যে ভালো আমি জানিনা। আমার তো ভীষণ কষ্ট হয়। ঠান্ডা লেগে যাওয়ার ভ্য়ে সারাক্ষণ জড়োসড়ো হয়ে গরম জামা কাপড় গায়ে দিয়ে কুঁকড়ে কুঁকড়ে থাকা। দিন ছোট রাত বড়। কাজের সময় কম। শীত আর কুয়াশার কারণে মর্নিং ওয়াক করা বারণ। তারপরে আমার মত বৃদ্ধের কি ভীষণ কষ্ট বোঝাতে পারবো না। হাত-পা শরীরের চামড়া রক্ষা করার জন্য ক্রিম মাখা। ভালো করে চান করার সুযোগ কম। ভোর হয় দেরি করে আবার সন্ধ্যা হয় তাড়াতাড়ি। কেন যে শীতকাল ভালো আমি জানিনা। না বুড়ো হয়ে গেছি বলে নয় আমার কোনদিনই শীতকাল ভালো লাগেনা। কতটুকু সময় পাওয়া যায় কাজের! শীতকালে অবশ্য ভালো ভালো খাওয়ার পাওয়া যায়। ডাল ফুল কফি সিম বড়ি খেজুর গুড এইসব শীতেই ভালো। হরেক রকমের পিঠে পুলি খাওয়ার লোভে আমার ভাই এই অসহ্য কষ্টকর শীত চাই না।আর এখন তো সারা ঋতুতেই সব রকম সবজি পাওয়া যায,। তবে ছোটবেলায় শীতটা ভালো লাগতো। বেশ মজা লাগতো বাড়ির সামনে খড় জ্বেলে গা সেঁকা। তারপর ঝমঝম কুয়াশায় ঘটি হাতে খেজুর গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা । খেজুর রস খাওয়ার জন্য শিউলিকে অনুরোধ করা। রাত্রিবেলা শালুক ডাঁটা খেজুর রসের কলসির মধ্যে দিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে রস খাওয়া বেশ মজার ব্যাপার। এসবের প্রতিযোগিতাও ছিল। তারপর দিনের বেলা মাঠের নাড়া ছিঁড়ে এক জায়গায় জড়ো করে রাখতাম। সন্ধ্যার পরে আলু বেগুন কচু পোড়া আর শীতপতিরোধ করার মধ্যে বেশ আনন্দ ছিল। শীত মনে হতো না। আসলে শীত প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ছিল।এখন এই বার্ধক্যে লেপ-কম্বল শ্রেয়। শীত উপভোগ করার জন্য আর কষ্ট করা যাবে না। এখন ওই শীতকাল নিয়ে গল্প কবিতা লেখা বিছানায় শুয়ে শুয়ে হতে পারে। কবে যে এই কনকনে ঠান্ডাটা যাবে! একটু গায়ে আলো বাতাস লাগিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে পারবো ,! মাঘ মাস  কবে আসবে।তারপর আসবে 'মাঘের আধে কম্বল কাঁধে খনার বচন বলতে পারব।তারপর বলব যাক এবার শীত যাবে শিবের ঝুলিতে। আর ভালো লাগছে না শীত,। শীতের কোন আদর্শ বোধ নেই। আমার নিজেরই শীত শরীর। অন্যকে উত্তাপ দেবো কি করে!


দুই.

হ্যাঁ আমি স্বীকার করছি আমি খুব শীতকাতুরে। কিন্তু তাই বলে শীতকে আমন্ত্রণ জানাবো না তাই কখনো হয়? 

মৃত্যুকেও তো আলিঙ্গন করতে হয়। যেহেতু কোন উপায় থাকে না। তখন বলি "মরণ রে তুহু মম শ্যাম সমান"। রাধার একমাত্র টার্গেট শ্যাম। আমাদেরও টার্গেট মৃত্যু। বোঝার সুবিধার জন্য এই উপমা আমরা ব্যবহার করি। প্রতিটি ঋতুকে আমাদের প্রয়োজন হয় তাই আমন্ত্রণ জানাতেই হয়। প্রতিটি ঋতুর  ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র এবং ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রতিভাত হয় আমাদের সামনে। প্রতিটি ঋতুই আমাদের কাছে প্রিয়। প্রতিটি ঋতু সেই সময়কালে আমাদেরকে মুগ্ধ করে ।আমাদের প্রয়োজন মিটায়।

শীতকাতুরে বলে শীতকে কাছে ডাকবো না তা কি করে হয়। শীত নিয়ে আসে আমাদের বাঁচার রসদ । আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস শীতকালে সংগ্রহ করতে হয়।যার ঘরে রুম হিটার আছে এবং বাথরুমে গ্রীজার আছে প্রবল শীতেও তাদের শীতের আমেজ অনুভব করার সুযোগ হয়। আবার গ্রীষ্মে এয়ার কন্ডিশন যাদের থাকে তাদের গরমে কষ্ট হয় না। প্রবল ঠান্ডায় রুম হিটার থাকলে শীতের সুখ অনুভব করতে পারে। আমার মত শীতকাতুরের যদি এসব সুযোগ না থাকে তাহলে সে শীতকেই ভয় পায়। আসলে শীতে ভীষণ কষ্ট হয়। কখন সূর্য উঠবে উত্তাপ গায়ে মেখে নিতে পারবে সেই অপেক্ষায় রাত কাটে কত মানুষের। আবার শীতের এক অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য শীতভোরে আমরা দেখে মুগ্ধ হই। কবিরা কবিতা লিখে। লেখকরা সে রূপের বর্ণনা দেয়। 

সোনালী ধানের ক্ষেত। শিশির সিক্ত ধানের শীষ। ধানের শীষে শিশির সোনালী রোদে চিকচিক করে। একদিকে ফসলের প্রতি আমাদের মোহ এবং পাশাপাশি তার অপার সৌন্দর্য কনকনে ঠান্ডাতেও আমাদের মনকে রাঙিয়ে দেয়।তখন স্বভাব শীতকাতুরে মানুষটি গেয়ে ওঠে "ও আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি" শীতের এক অদ্ভুত আকর্ষনীয় ক্ষমতা আছে। শীত এবং প্রকৃতির অপরূপ রূপ দেখে মানুষের মনে যে আবেগ সঞ্চারিত হয় তা কবিগুরু সঠিকভাবেই তাঁর গানের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেছেন।

"শীতের হাওয়ার লাগল নাচন আমলকির এই ডালে ডালে"। পূবের লাল টকটকে সূর্য নিথর প্রকৃতির কোলে যে লাবণ্য তৈরি করে তা দেখার সৌভাগ্য যারা শীতকাতুরে তাদের হয় না। আমি শীতকাতুরে ঠিকই কিন্তু শীত ভরে লাবণ্য অবলোকন করার জন্য ঝুঁকি তো নিতেই হয়।

শীত ভোরে কনকনে ঠান্ডায় যখন অন্নদাতাদের আঙুলগুলো বেঁকে যায় ধান কাটার সময় অথবা ধানের আঁটি বাঁধার সময় তখন একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে দেখা এবং সহানুভূতি প্রদর্শন করা শুধু নয় নিজেকে তাদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগকে কিছুতেই হাতছাড়া করা যায় না। সরষে ক্ষেতের হলুদ রাঙা ফুল কার না মন টানে! হরেক রকমের সবজি বাগানের আবেগের ফসল। ধান সবজি গম সরষে ক্ষেত এসবই তো শীতের ফসল। আহা বলতে বলতে জিভে জল এসে গেল। এই শীতে কচু পালং শাক কলাই শাক মুলো সিম বিট গাজর দেশি বড়ী নকশা বড়ি ইত্যাদি। শীতকালে ধান জমি থেকে পাওয়া যায় চুনো পুটি ল্যাঠা শোল কৈ সিঙ্গি মাগুর মৌরালা।এই শীতেই তো পাওয়া যায়। এই শীতের সময় মাঠের জল যখন খাল নালার দিকে চলে যেত গড়িয়ে তার সঙ্গে প্রচুর পুঁটি মাছ ছোট ছোট ল্যাঠা মাছ গুলে মাছ চিংড়ি মাছ বাঁকিতে (মাছ ধরার একরকম সরঞ্জাম) আমরা ধরতাম। এগুলো এত পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যেত টাটকা  মাছ খাওয়ার পরেও বাড়তি কিছু শুকিয়ে রাখা হতো। আমরাই সুখা মাছ ভেজে অথবা পুড়ে শীত ভোরে রোদে বসে বসে খেতাম। কি অসাধারণ টেস্ট । তাইতো মাঝে মাঝে মনে হয়, আবার শীতকাল কবে আসবে।কখনো কখনো  বাড়িতে বেগুন দিয়ে চচ্চড়ি হতো। ভাবলেই জিভে জল চলে আসে। শীতে যতই জুবু থুবু হয়ে থাকি না কেন সকালে হালকা রোদে উঠনে বসে এই মজার খাবার আর সঙ্গে থাকতো বড়ি পোড়া। উত্তরের গা হিম করা শীতের বাতাসক পাত্তা দিতাম না। মা গুড় পাক করে মুড়ি মিশিয়ে মোয়া করতেন। শীতের রোদ গায়ে লাগিয়ে বসে বসে কামড়ে কামড়ে খেতাম। এ তো শীতকালেই সম্ভব। শীতের পদধ্বনি শুনলেই সব চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যতই শীতে কষ্ট পাই না কেন আমি তো জিভের জল সামলাতে পারিনা। কি করব লোভী মানুষ। আমাদের যে সবকিছুই চাই। গ্রীষ্ম চাই বর্ষা চাই শীত চাই সবটাই চাই।


 শীতকাল ভোজন রসিকদের জন্যই উপযুক্ত।তাই শীত ঋতু না হলে মানুষবা বাঁচবে কি করে! তাই শীতের কষ্টটা কিন্তু আমাদেরই প্রয়োজনে সহ্য হয়ে যায় কারণ অন্নদাতারা আমাদের মুখে খাবার তুলে দেয়। তাই শীত ঋতুর গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা অকপটে মেনে নিতে হয়।  তাই শীত যতই কষ্টকর কঠিন হোক না কেন প্রকৃতির প্রেমে তন্ময় কবিগুরুর সাথে গাইতে হয়।"শীতের বনে কোন সে কঠিন আসবে ব'লে; শিউলিগুলি ভয়ে মলিন বনের কোলে"। সারারাত জেগে জেগে মাটির পরে শিউলির বিছানা দেখে ছুটে যাই কুড়িয়ে নিই দুহাত ভ'রে ।মাটির 'পরে শিউলির বিছানার টানে ভোর ভোর উঠে পড়ি শীতকে অগ্রাহ্য করে। কবিগুরু যেন শীতের  সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন।"পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয়রে চলে আয় আয় আয় "। শীত কালকে দুহাত বাড়িয়ে যারা আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতে চায়, আমন্ত্রণ জানায় তাদের কাছে এবং সমগ্র সমাজের কাছে শীতের এক অপরিসীম ক্ষমতা রয়েছে। তাই আমি শীতকাতুরে একজন মানুষ বাধ্য হলাম শীতকে স্বাগত জানাতে। এই ক্ষেত্রে আমি হয়তো একটু প্রাচীনপন্থী কিন্তু শীত উদারপন্থী। তাই শীতের গ্রহণযোগ্যতা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। সবশেষে বলি শীতকালে সবজি চাষিরা অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটাই গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে। গ্রাম থেকে শহরের দিকে ব্যাপক হারে সবজি ব্যবসায়ীরা ম্যাটাডোর লরি ভর্তি করে নিয়ে যায়। সবজি চাষের ফলে শ্রম দিবসও সৃষ্টি হয়। পুনরায় চিত ঋতুকে স্বাগত জানাই জনস্বার্থে।

                          ……………………….. 


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


Sunday, 8 December 2024

অমৃত মাইতি এর গদ্য // ই-কোরাস ২০৬

 



একজন প্রবীণ ব্যক্তি পুস্তকের সমান

অমৃত মাইতি 


একজন প্রবীণ ব্যক্তি পুস্তকের সমান ।এই অভিমত আমার ব্যক্তিগত। আমি সবসময় সদর্থক চিন্তা ভাবনার মানুষ। মানুষ মানুষকে দিতে পারে। সমাজকেও দিতে পারে। তবে সদিচ্ছার উপর নির্ভর করে সবকিছু। যদি মনে করেন সমাজের জন্য তিনি উৎসর্গীকৃত। তাহলে তিনি সময় ও সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন।

মানুষের মধ্যে জীববৃত্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি এই দুইয়ের সমাহার রয়েছে। সব মানুষের মধ্যে জীববৃত্তি আছে। আমি এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি না। আমি যে ধরনের আলোচনার সূত্রপাত করেছি সেই ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তি মূল বিষয়বস্তু। একটি শিশু তার জৈবিক এবং শারীরিক বৃদ্ধি

বুঝতে পারে। সে দিনে দিনে বড় হচ্ছে। প্রতিটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি আছে। সামাজিক পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির উপর মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। বুদ্ধির বিকাশ বাইরের দিক থেকে বোঝা যায় না। কিন্তু শারীরিক বিকাশ বোঝা যায়। মানুষের বুদ্ধাংক সমান নয়।

আই কিউ বা ইন্টেলিজেন্স কুইটেন্ট পরিমাপের পদ্ধতি আছে। মনোবিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে এই বিষয় একটি জরুরী সিলেবাস। মানুষের যত বয়স বাড়ে তার বুদ্ধি বৃত্তি এবং বুদ্ধাংক বাড়তে থাকে। এইসব ব্যবহারিক জীবনের বিকাশ। বয়স বাড়লে বুদ্ধি বাড়ে বা বুদ্ধাংক গভীর হয় 

একথা সবসময় খাটেনা। বুদ্ধাঙ্ক তীক্ষ হলেই তিনি মানবিক হবেন তিনি শিক্ষিত হবেন, জ্ঞানী হবেন এমন কোন কথা নেই। তাঁর জীবন যাপনের ব্যবহারিক দিক যদি খুব খাটো হয় বা ছোট হয়, তাঁর কাছ থেকে বড় কিছু আশা করা যাবে না এবং তিনি অন্য কোন মানুষকে পথ দেখাতে বা আলো দিতে পারবেন না। যদি তিনি আকাশের মত উদার হন তাহলে তিনি সামাজিক বহু ক্ষেত্রে বিজ্ঞ মানুষের পরিচয় দিতে পারবেন। তাঁর জীবন শিক্ষণীয় এবং গ্রহণীয় হবে। তিনিও একটি বইয়ের মত সমাজের কাছে হয়ে উঠবেন।তোতা পাখির মতো পড়াশোনা করেও বুদ্ধি বাড়তে দেখা যায়নি বা বিচক্ষণতা  দেখা যায়নি। বয়সের তুলনায় অনেক কম হলেও , বুদ্ধাংক অনেকের চাইতে যথেষ্ট বেশি দেখা যায়।। তা সত্ত্বেও যদি ধরে নেওয়া যায় বয়স যত বাড়ে, মানুষ বয়সে যত প্রবীণ হয় তত জ্ঞান অভিজ্ঞতা বুদ্ধাংক বাড়ে। একজন প্রবীণ ব্যক্তির সারা জীবনের জ্ঞান অর্জন বিদ্যা বুদ্ধি সামাজিকতা ব্যবহারিক জ্ঞান সমাজ চেতনা সবকিছুই প্রণতা পায়।বহু বিষয়ে একজন প্রবীণ মানুষের পরিপূর্ণতা দেখা যায়। তখন তিনি একজন পুস্তক। অবশ্য একজন স্থূল বুদ্ধি সম্পন্ন প্রবীণের কাছ থেকে তেমন কিছু আশা করা যাবে না ,যা আপনাকে জ্ঞানী করে তুলতে পারে।একজন প্রবীণ ব্যক্তির সমস্ত গুণাবলী একটি ভরা পুকুরের মতো। পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি বই বিক্রি হয় কার্ল মার্কসের। তাঁর জীবনটাই একটি পুস্তক। রামমোহন বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র মাইকেল বিবেকানন্দ বঙ্কিমচন্দ্র জীবনানন্দ নজরুল সুকান্ত

এবং দেশে-বিদেশে সমস্ত মনীষীরা কিন্তু এক একজন এক একটি পুস্তক। তাঁদের জীবনের নির্যাস তাঁদেরই রচিত বই। শৈশব থেকে উদার মনের মানুষরা সমাজকে যেভাবে দেখেছেন তার প্রতিফলন পুস্তকের মধ্যে লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং পুরো জীবনটা অভিজ্ঞতালব্ধ। তাই আমার মনে হয়েছে একজন প্রবীণ মানুষ একটি পুস্তকের সমান। একটি পুস্তক পড়ে আমরা জ্ঞানী হই। আমাদের অভিজ্ঞতা বাড়ে। বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করতে পারি। তখন আমরা সমাজকে নানান ভাবে আলোকিত করার চেষ্টা করতে পারি। পুস্তক আমাদের বন্ধু দার্শনিক এবং পথপ্রদর্শক। ঠিক তেমনি মনীষীরা এমনকি অভিজ্ঞ এবং বিচক্ষণ জ্ঞানী প্রবীণ ব্যক্তিরাও আমাদের বন্ধু দার্শনিক এবং পথপ্রদর্শক। অন্ধকারে নিমজ্জিত সমাজকে, অজ্ঞ মূর্খ কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন মনীষীরা আর তাঁদের চেতনাকে বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে পুস্তকের বিরাট অবদান। প্রবীণ মানুষ আমাদের অভিভাবক এবং পুস্তকও আমাদের অভিভাবক। একজন প্রবীণ মানুষ সাধারণ অজ্ঞ মানুষের অশিক্ষা কুশিক্ষার সুযোগ নিয়ে কুসংস্কারে  আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে; আবার পাশাপাশি সেই প্রবীণ মানুষ জ্ঞানের আলো জ্বেলে দিতে পারে। তাঁদের জন্ম অন্ধ জনের আলো দেওয়ার জন্য। তাঁরা সমাজের বুকে জনজাগরণের ঢেউ তুলতে পারে। বর্তমানে সমাজের মধ্যে যেভাবে ধর্মীয় গোঁড়ামি 

মৌলবাদ মাথা চাড়া দিচ্ছে আর একটা রেনেসাঁসের প্রয়োজন হয়েছে।  ইতিহাসের বিভিন্ন সময়কার জাগরণের পথপ্রদর্শক হিসেবে পুস্তক এবং প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আমাদেরকে পুনর্জাগরণের পথ দেখাতে পারে।প্রবীণরাইতো বলবেন নবীদেরকে"ওঠো জাগো"। সময় হয়েছে মনের দরজা খোলো। পুস্তক খুলে দেখো ইতিহাস তৈরী করতে হবে মানুষকেই । সমস্ত জাগরণের ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে পুস্তকে। একজন সংস্কার মুক্ত সচেতন ধর্মনিরপেক্ষ প্রবীণ মানুষ পুস্তকের সমান। 

শুধু বয়সে প্রবীণ হলেই হবে না। সেই প্রবীণ মানুষ যদি সত্যিই একটি পুস্তক হয়ে উঠতে পারেন তাহলে আমরা একটা নতুন যুগের সৃষ্টির ছবি আঁকতে পারবো। প্রবীণ নবীন উভয়কেই শক্ত করে হাত ধরে এই পচা গলা সমাজের হাল ধরতে হবে। গাইতে হবে রানারের গান।


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

Sunday, 1 December 2024

অমৃত মাইতি এর গদ্য // ই-কোরাস ২০৫

 



তর্ক না আলোচনা - অমৃত মাইতি 

আগে ঠিক করে নিতে হবে তর্ক করব না আলোচনা করব। তর্ক করে সময় নষ্ট করব না আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে আসব। দুজন অভিজ্ঞ মানুষ কোন বিষয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বিষয়বস্তু সম্পর্কে উভয়ের সম্যক জ্ঞান থাকা চাই। ভালো তার্কিক হলে তর্ক করা যায়। তর্কের নিয়ম রীতি মেনে তর্ক করলে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সহজ। সাধারণত এ ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াকে তর্কযুদ্ধ বলা যায় না। আলোচনা বলা যেতে পারে। আমরা অনেক সময় তর্কে অবতরণ করি। কারুর না কারুর যদি জ্ঞানের ঘাটতি থাকে এবং যদি তার নিয়ম রীতি সম্পর্কে জ্ঞান কম থাকে তাহলে সেই তর্ক কোনদিন থামবে না। দুজনে যদি বুদ্ধিমান মানুষ হন যদি প্রকৃতপক্ষে তাঁরা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার মানসিকতা নিয়ে বসেন তাহলে কোন একজন নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবেন এবার থামা উচিত। একটি কথা প্রচলন আছে"বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর"। প্রকৃত তার্কিক যারা কোথায় থামতে হবে সেটুকু জ্ঞান তাদের আছে। তর্কের মধ্য দিয়েও জ্ঞানের আদান প্রদান জ্ঞানের গভীরতা নির্ণয় হয়। আসলে সবকিছু নির্ভর করে তার্কিকদের মেনে নেওয়া এবং মানিয়ে নেওয়ার উপর। পাশাপাশি কোন এক পক্ষ যদি মূর্খ অবিবেচক হয় এবং একগুঁয়ে প্রকৃতির হয় তাহলে তার সঙ্গে তর্ক করা বা আলোচনা করা একেবারেই উচিত নয়। অনেকে তর্ক বা আলোচনার আগে থেকেই ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত করে নিয়ে বসেন। তাকে আপনি যতই সহজ সরল ভাষায় যুক্তি দেখান না কেন সে কিছুতেই মানবে না।

পরাজয় স্বীকার করতে তাঁর ইগোতে বাধে। সিদ্ধান্ত গ্রহণটা তাদের কাছে বড় নয়, তাদের কাছে বড়  হলো নিজের ভুল চিন্তাকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং নিজের পক্ষে কথা বলা। হেরে গেলেও সঠিক যুক্তিপূর্ণ কথা বা সিদ্ধান্ত তিনি মানবেন না। অনেক সময় বিপত্তি ঘটে উভয়ের জ্ঞান মানসিকতা চিন্তাধারার যদি গরমিল হয়। আলোচনা বা তর্কে বসার আগে মনটাকে যুক্তিবাদী করে নিতে হয়। অনেক সময় গোঁড়া মতবাদের বা কোন প্রাচীন ভ্রান্ত ধারণার বিশ্বাসী মানুষ কিছুতেই তার মানসিক অবস্থান থেকে সরে আসতে চাইবে না। যেমন কুসংস্কার একবার ঢুকে গেলে তার মাথা থেকে বের করা কঠিন। সে কোন যুক্তি মানে না তর্ক মানে না কোন আলোচনা মানে না। মান্ধাত্তার আমলের ভ্রান্ত ধারণাকে আঁকড়ে বসে থাকবে সে। সাপের কামড়ের তীব্র বিষ শরীর থেকে বের করা যাবে কিন্তু এদের মন থেকে কুসংস্কার বের করা যাবে না। মন্দিরের চারপাশে দন্ডি মাপা মেয়েদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করে দেখেছি সে আপনার কথা মন দিয়ে শুনছে কিন্তু তার মনের ধারণাকে কিছুতেই  বিসর্জন দিতে পারছে না। তর্ক বা আলোচনা যাই করি না কেন অনেক সময় সামাজিক অবস্থানের উপর কিন্তু নির্ভর করে। সামাজিক কু -প্রথা ও মন্দ প্রভাব থেকে মনকে যদ মুক্ত করতে না পারা যায় তাহলে তাদের সঙ্গে তর্ক করে পারা যাবে না। এই সমস্ত মানুষরা এক জোট বেঁধে আপনাকে বিব্রত করে  আপনাকেই মূর্খ বানিয়ে দিবে।

তর্কবিদ্যা না পড়েও অনেকে ভালো তর্ক করতে পারে।

সেক্ষেত্রে কিন্তু পদে পদে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যারা তর্কবিদ্যা সম্পর্কে ভালো জ্ঞান অর্জন করার পরে তর্কে অবতরণ করেন তাদের ভুলের সম্ভাবনা কম থাকে। একজন ভালো তার্কিক এবং আলোচক তার জ্ঞানের কারণেই নম্র বিনয়ী হয়। তাদের সঙ্গে যে কোন বিষয়ে তর্ক করা বা আলোচনা করা যুক্তিসঙ্গত। আপনারও জ্ঞান বাড়ে তাঁরও আপনার কাছ থেকে কিছু নেওয়ার থাকে। সর্বোপরি যুক্তি-তর্ক আলোচনা আমাদেরকেই সমৃদ্ধ করে। আমি দেখেছি অজ্ঞ মূর্খ গোঁয়ার লোকদের সঙ্গে এমনি সামাজিক সম্পর্ক রাখা ভালো কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনরূপ ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে কথা বলা ভালো নয়। কখন প্রয়োজন ছড়া সে আপনার সঙ্গে কথা বলবে না। সে আপনার কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবে। কারণ আপনি তার মনের মত কথা বলতে পারছেন না।বরং সামাজিক সম্পর্ক নিবিড় করার মধ্য দিয়ে যদি তাকে কাছে টানতে পারেন, আমার মতে হয়তো সফল হতে পারবেন কোন একদিন।


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ১

  রসকুণ্ডুকে মহিমান্বিত করেছে বাবা বসন্ত রায় জীউ ও তার গাজন মেলা মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি    রাঢ় বাংলার অন্যতম তীর্থ জনপদ হল রসকুণ্ডু। বর্ধিষ্ণু এই...