Tuesday, 31 March 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৫

 


গাজনের গর্জনে ভুবনেশ্বর : এক প্রাচীন উৎসবের আখ্যান

বিশ্বজিৎ ভৌমিক 


বাংলার লোকসংস্কৃতির মানচিত্রে রাঢ় অঞ্চল এক আদিম ও অকৃত্রিম জনপদ, যেখানে কংসাবতী বা স্থানীয়দের প্রাণের নদী 'কাসাই' তার আপন ছন্দে বয়ে চলে। এই কাসাই নদীর দুই কূলে যখন চৈত্র শেষের তপ্ত বাতাস বইতে শুরু করে, তখন রুক্ষ লাল মাটিতে কান পাতলে শোনা যায় এক উন্মাদনার প্রতিধ্বনি। এটি গাজনের সুর—যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক অবিনাশী লোক-উৎসবের গর্জন। ‘গাজন’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। কেউ বলেন ‘গা’ অর্থাৎ গ্রাম আর ‘জন’ অর্থাৎ জনগণ- যা আসলে জনপদের উৎসব। আবার কেউ বলেন ‘গর্জন’ থেকে গাজন, যেখানে আর্তনাদ আর ভক্তির এক অদ্ভুত মিলন ঘটে। কাসাই পাড়ের এই গাজন মূলত চৈত্র সংক্রান্তির রৌদ্রদগ্ধ দুপুরে শুরু হওয়া এক আদিম উপাখ্যান, যেখানে জাত-পাত, উঁচু-নিচু সব বিভেদ ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে যায় শিবের চরণে। 'গাজন' শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে মতান্তর থাকলেও, লোকমুখে এটি 'গর্জনে'রই নামান্তর; যেখানে ভক্তের আর্তনাদ, শিবের আরাধনা আর প্রকৃতির রুদ্ররূপ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। যা  এই অঞ্চলের অন্ত্যজ, শ্রমজীবী মানুষের আত্মদান ও ত্যাগের এক লৌকিক আখ্যান।

প্রখর গ্রীষ্মে যখন ধরিত্রী তৃষ্ণার্ত, যখন কাসাইয়ের বুক চড়া পড়ে ধুধু করে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়ালে দেখা যায় লোকসংস্কৃতির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এখানে মহাদেব বা 'বুড়ো শিব' কোনো মন্দিরের বদ্ধ ঈশ্বর নন, বরং তিনি কাসাই পাড়ের কৃষকের পরমাত্মীয়, যার কাছে চৈত্র সংক্রান্তির এই বিশেষ তিথিতে ভক্তরা নিজেদের শরীর ও মনকে সঁপে দেয়। কাসাই নদীর জল ছুঁয়ে শুরু হওয়া এই গাজন উৎসবের মূলে রয়েছে বৌদ্ধ তান্ত্রিকতা, শৈব সাধনা এবং আদিবাসী সংস্কৃতির এক প্রাচীন রসায়ন। শহরকেন্দ্রিক আধুনিকতার চাকচিক্য যখন সবকিছুকে গ্রাস করছে, তখনও কাসাইয়ের কূলে কূলে শিবের গাজন তার আদিমতা নিয়ে টিকে আছে। শ্মশানের ছাই মেখে, নীলকণ্ঠের নাম জপে, কাঁটা ঝাঁপ কিংবা বান ফোঁড়ানোর মতো দুঃসাহসিক কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা যেন জীবনের চরম সত্যকেই অন্বেষণ করতে চায়। এই গাজন কোনো ড্রয়িংরুমের শোপিস নয়, বরং কাসাই নদীর পলিমাটিতে মিশে থাকা ঘাম আর রক্তে লেখা এক জীবন্ত ইতিহাস। চলুন সেই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে পাথেয় করে আমাদের এলাকার কাঁসাই পাড়ের কিছু সুপ্রাচীন গাজন উৎসব সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

প্রথমেই আসি দেবকুল গ্রামের বহু প্রাচীন একটি শিব মন্দিরের গাজন উৎসব ও মন্দির সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায়...

শ্রী শ্রী ভুবনেশ্বর জীউ (শিব ঠাকুর) :

(চর্তু‌ঃসীমা : দক্ষিণ দিকে - বাড়কাশিমপুর গ্রাম, উত্তর দিকে - মাছগেড়িয়া গ্রাম, পূর্ব দিকে - জগন্নাথবাটি গ্রাম, পশ্চিম দিকে - বৃন্দাবনপুর গ্রাম)। মন্দিরের নাম 'ভুবনেশ্বর' হলেও মন্দিরটি দেবকুল গ্রামে অবস্থিত। কথিত আছে গ্রামটি গড়ে ওঠা বা নামকরণের বহু পূর্বেই এই মন্দিরের স্থাপনা হয়। এই গ্রাম এলাকার বেশিরভাগ জায়গা বা সম্পত্তি দেবতার নামেই ছিল। পরবর্তীতে বর্ধমান রাজাদের শাসনকালে এই মন্দিরের কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের হাতে সম্পত্তির অংশ চাষবাসের জন্য তুলে দেওয়া হয়। যখন এলাকায় গ্রাম গঠন করা হয়েছে তখন যেহেতু এলাকাটি দেবতার জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল তাই দেবতার কূল থেকেই এই গ্রামটির নাম দেবকুল হয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন করেন যেহেতু প্রথমে এই মন্দিরের আকৃতি দেউল মন্দির হিসেবে ছিল তাই সেখান থেকেই দেবকুল গ্রামের নামকরণ হয়েছে। 

যাই হোক ঐতিহ্যের ক্যানভাসে দেবকুলের ভুবনেশ্বর গাজন বাংলার লোকসংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত অধ্যায় হলো গাজন উৎসব। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাসপুর থানার অন্তর্গত হাট সরবেড়িয়া পোষ্ট অফিসের দেবকুল গ্রাম এই ঐতিহ্যের এক সগৌরব বাহক। এখানকার প্রাচীন ভুবনেশ্বর শিব মন্দিরকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে যে গাজন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, তা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং শৌর্য, ভক্তি এবং লৌকিক বিশ্বাসের এক অনন্য মহামিলন। ঘাটাল মহকুমার এই জনপদে ভুবনেশ্বর মহাদেব কেবল বিগ্রহ নন, তিনি গ্রামবাসীর পরম নির্ভরতার প্রতীক। চৈত্র মাসের তপ্ত দ্বিপ্রহরে যখন গ্রাম বাংলার আকাশ-বাতাস ‘বম বম ভোলানাথ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়, তখন দেবকুল গ্রাম যেন এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। কঠোর কৃচ্ছসাধন, উপবাস এবং লৌকিক আচারের মধ্য দিয়ে ‘ভক্ত্যারা’ যেভাবে নিজেদের উৎসর্গ করেন, তা এই অঞ্চলের লড়াকু মানসিকতা ও আধ্যাত্মিক চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগেও দেবকুলের ভুবনেশ্বর শিব মন্দিরের গাজন তার নিজস্ব গরিমা ও গ্রামীণ সংহতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই উৎসব একদিকে যেমন লৌকিক ইতিহাসের সাক্ষী, অন্যদিকে মেদিনীপুরের লোকশিল্প ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল। লোকশ্রুতি ও প্রবীণ মানুষজনের এই মন্দিরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায় মন্দিরের যে বিগ্রহ দেবতা অর্থাৎ শিবলিঙ্গটি মানুষ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং স্বয়ং মাটি ফুঁড়ে আবির্ভূত হয়েছেন। শিবলিঙ্গের ধরনটিও অন্যান্যদের থেকে আলাদা। তাই এটিকে 'স্বয়ম্ভু শিবলিঙ্গ' বলে উল্লেখ করা হয়। আনুমানিক ৫০০ বৎসরের প্রাচীন এই মন্দিরের প্রাথমিক নির্মাণ শৈলী ছিল দেউল মন্দির হিসেবে, পরবর্তী কালে সংস্করণ করে এটিকে চাঁদনী মন্দিরের রূপ দেওয়া হয়। মন্দিরের বর্তমান রূপটি আমরা দেখতে পাই সেটি পূর্ব মেদিনীপুর থেকে আগত এবং অন্যান্য কিছু স্থানের মিস্ত্রী দ্বারা ২০১০ সালে নির্মিত হয়েছে এবং সুদক্ষ ভাবে অলংকরণ করেছেন নাড়াজোলের এক প্রতিমা শিল্পী সুব্রত দাস ও তার সহযোগীরা।

সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ সাত দিন এখানে গাজন উৎসব সম্পন্ন হয়। মন্দিরটি পাঁচ ভোগের মন্দির। তবে বিশেষ কোন চাপ নেই যে সন্ন্যাসীদের এই ৭ দিন ধরেই বাবার সেবায় নিয়োজিত থাকতে হবে। তবে নিজের নিজের ক্ষমতা ও সুবিধা অনুযায়ী শেষ পাঁচ বা তিন দিন এই কৃচ্ছ্রসাধনের অধিকার রয়েছে। প্রতিবারই এলাকার ৫০ জনের অধিক মানুষ ভোক্ত্যা বা সন্ন্যাসী থাকেন এরমধ্যে প্রচুর সংখ্যক মহিলা সন্ন্যাসী প্রত্যক্ষ করা যায়। পরম্পরা ও বংশানুক্রমিকভাবে পাট ভোক্ত্যা হিসেবে মাজী বংশ এবং দেউল ভোক্ত্যা হিসেবে মূলা বংশের লোক নিযুক্ত থাকে।

এই মন্দিরের গাজন উৎসবের একটি বিশেষ আচার বা রীতি হলো গাজনের শুরুতে মন্দিরের সেবাইত বা পুরোহিত একটি মাগুর মাছের মাথায় তেল, সিন্দুর লাগিয়ে মন্ত্রপাঠ করে বলি দেন। তারপর গাজনের অন্যান্য আনুষঙ্গিক অর্চনা ও পূজা পাট শুরু হয়। এবং শেষ দিন এক‌ইভাবে এই রীতি অনুযায়ী অর্থাৎ মাগুর মাছ বলি দিয়েই সমস্ত আচার অনুষ্ঠান শেষ হয়। এছাড়াও অন্যান্য মন্দিরের গাজন উৎসবের মতো হিন্দোলা, কাঁটাগড়ানো এই দুটি মূল আচার‌ও লক্ষ্যনীয়।

এখানকার গাজন উৎসবের এক অত্যন্ত ভক্তিপূর্ণ ও মাঙ্গলিক অধ্যায় হলো ‘নীল পূজা’ বা ‘নীল ষষ্ঠী’ এলাকার এই উৎসব জলঢালা নামে পরিচিত। দেবকুল গ্রামের ভুবনেশ্বর শিব মন্দিরে এই দিনটি এক বিশেষ মর্যাদা পায়। লৌকিক বিশ্বাস মতে, নীল পরমেশ্বর শিবের এবং নীলমণি বা নীলচণ্ডিকা দেবী দুর্গার প্রতীক। এই দিনেই মহাদেব ও দেবী চণ্ডিকার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল বলে ভক্তরা বিশ্বাস করেন। দেবকুল ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের মায়েরা তাদের সন্তানদের বা স্বামী ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় এই দিন নির্জলা উপবাস রাখেন। শুধু মায়েরা নয় অনেক পুরুষ ব্রতীও এই উপবাস করেন। উপবাসের পর ভুবনেশ্বর জীউ শিবের মাথায় জল ঢালেন এবং মন্দিরের পুরোহিত তাদের হাতে সাদা সুতো বেঁধে দেন। 'সন্তানের আয়ু যেন পাথরের মতো শক্ত হয়'—এই কামনাই থাকে নীল পূজার মূল ভিত্তি।

কাঁসর, ঘণ্টা আর ঢাকের আওয়াজে দেবকুল গ্রামের প্রতিটি অলিগলি মুখরিত হয়ে ওঠে। গৃহস্থ বধূরা ভক্তিভরে নীলের চরণে তেল-সিঁদুর অর্পণ করেন। সন্ধ্যার আকাশ যখন গোধূলির রঙে রাঙায়, তখন ভুবনেশ্বর শিব মন্দিরের চত্বরে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। শত শত মা ও বোনদের হাতের প্রদীপের আলোয় মন্দির প্রাঙ্গণ এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শিবের মাথায় ডাব বা গঙ্গার জল ঢালার দৃশ্যটি ভক্তি ও নিষ্ঠার এক পরম নিদর্শন। নীল পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি গ্রামীণ বাংলার সামাজিক মেলবন্ধনের প্রতীক। এই দিনটিতে জাতপাত নির্বিশেষে গ্রামের মানুষ ভুবনেশ্বর শিবের চরণে প্রণত হন। এটি ত্যাগের মাধ্যমে মঙ্গলের আবাহন করার এক চিরন্তন উৎসব।

এবার আসি এই গাজন কে কেন্দ্র অনুষ্ঠিত মেলার বিষয়ে। বর্তমানে এই মেলা অনেক বেশি বাণিজ্যিক ও আধুনিক হলেও, শতাব্দী প্রাচীন এই মেলার রূপ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগেকার মেলাটি আজকের মতো আলোকসজ্জায় ঝলমলে ছিল না। বিজলি বাতির বদলে হ্যাজাক লাইট বা মশাল ব্যবহার করা হতো। মন্দির বা সংলগ্ন এলাকাগুলোতে তখন এত ভিড় থাকলেও তার মধ্যে একটা শান্ত, গ্রাম্য ভাব ছিল। মানুষ পায়ে হেঁটে বা গরুর গাড়িতে করে দূর-দূরান্ত থেকে মেলায় আসত। বিনোদন বলতে সারারাত ধরে পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে যাত্রা বা পালাগান চলত। সন্ন্যাসীরা শিবের মহিমা গেয়ে বেড়াতেন। আবার মাঝে মাঝেই তাদের গলায় শোনা যেত "হিন্দোলের চরণে সেবো— মহাদেব!"

মেলার বাজার ছিল মূলত গৃহস্থালির প্রয়োজনে। আধুনিক প্লাস্টিকের খেলনার বদলে পাওয়া যেত: মাটির পুতুল, কাঠের খেলনা এবং বাঁশের তৈরি জিনিস। এখানে পাশাপশি দুটি গ্রাম দাদপুর ও সামাটবেড়িয়ার প্রচুর কুমোর মাটির বাসনপত্র, কলসি, হাঁড়ি ইত্যাদি নিয়ে বসতো। এখানে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হতো মুড়ি ভাজার পোড়া মাটির খাপরি। এছাড়াও পাওয়া যেত কামারদের তৈরি লোহার দা, বঁটি বা চাষাবাদের সরঞ্জাম।

স্থানীয় খাবার যেমন— এখানকার প্রচলিত একটি বিশেষ খাবার ছিল পেটাই পরটা ও ঘুগনি। যা এখনও এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ।

কালের নিয়মে মেলায় অনেক আধুনিকতা এলেও দেবকুলের গাজন তার নিজস্বতা হারায়নি। বর্তমান মেলার প্রধান দিকগুলো হলো বর্তমানে ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি মেলা প্রাঙ্গণে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যাত্রাপালা, বাউল গান এবং স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গীতানুষ্ঠান মেলাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। মেলা উপলক্ষে দাসপুর ও সংলগ্ন অঞ্চলের মৃৎশিল্পী এবং কুটির শিল্পীদের সমাগম ঘটে। মাটির হাড়ি-কুঁড়ি থেকে শুরু করে কাঠের আসবাবপত্র এবং শিশুদের খেলনার এক বিশাল বাজার বসে এখানে। দেবকুলের এই মেলা কেবল হিন্দুদের উৎসব নয়; জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দাসপুর এলাকার সমস্ত মানুষ এই মেলায় শামিল হন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

বর্তমানে যুগে রকমারি চাইনিজ ও অন্যান্য খাবার বিশেষভাবে সমাদৃত হলেও মেলার প্রধান আকর্ষণ হল কিন্তু সেই আগের জিলিপি, গজা এবং স্থানীয় মিষ্টির দোকান। তাই গরম জিলিপি আর পাপড় ভাজা ছাড়া এখানকার গাজন মেলা আজও অসম্পূর্ণ।

সবশেষে আসি মেলা পরিচালনার কথায়, প্রাথমিক পর্যায়ে মেলা পরিচালনার সমস্ত দিকটিই মন্দিরের সেবাইত দ্বারা পরিচালিত হতো, বর্তমান এক সেবাইত বংশধর ভূবন চক্রবর্ত্তীর কথায় তারা অষ্টম পুরুষ হিসেবে এই কাজে নিযুক্ত। কিন্তু বর্তমানে মেলা এবং এর আয়োজন বৃহত আকার ধারণ করায় মেলাটি পাঁচটি গ্রামের মানুষ দ্বারা তৈরী করা কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়। গ্রামগুলি হলো দেবকুল, মাজগেড়িয়া, বৃন্দাবনপুর, বাড়কাশিমপুর ও আংশিক জগন্নাথবাটী। মেলা কমিটির বর্তমান সভাপতি - সুবল চন্দ্র দুয়ারী (দেবকুল গ্রাম), বর্তমান সম্পাদক - সুধীর চন্দ্র মন্ডল (বাড়কাশিমপুর)। বর্তমান গাজন মেলাটি ১০ দিন যাবত চলে।

মন্দিরের বর্তমান অবস্থা খুবই ভালো। কিন্তু আটচালাটি অনেক পুরাতন ও ভগ্নপ্রায়, যদিও এটি পুনঃ নির্মাণ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো এই মন্দির নির্মাণ কার্যে যারা অর্থ দান করেছেন সকলের নাম মার্বেল পাথরের উপর খোদাই করা রয়েছে মন্দিরের মেঝেতে। মন্দিরের চারপাশটি বেশ সাজানো গোছানো পার্কের মতো।

গাজন উৎসবের সমাপ্তি ঘটে কৃচ্ছ্রসাধনের চরম শিখরে পৌঁছে। ভক্তদের এই দেহজ কৃচ্ছ্রসাধন আসলে অহংকার বিনাশ ও ত্যাগের প্রতীক। ভুবনেশ্বর মহাদেবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই মেলা ও উৎসব গ্রামবাংলার প্রান্তিক মানুষের জীবনদর্শনকে তুলে ধরে। লৌকিক দেবতার প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর লৌকিক আচারের এই অদ্ভুত মিশেল গাজনকে এক অনন্য উচ্চতা প্রদান করেছে। উৎসব শেষে ভক্তরা যখন সাধারণ জীবনে ফিরে যান, তখন তাঁদের অন্তরে থেকে যায় আগামী বছরের প্রতীক্ষা আর এক অনাবিল আধ্যাত্মিক প্রশান্তি। সবশেষে বলি আমরা মন চাইলেই আসতে পারি লোকসংস্কৃতির এই প্রাচীন মেলায়।


তথ্য ঋণ : 

১. ভুবন চক্রবর্তী (সেবাইত)

২. মহাদেব চক্রবর্তী (সেবাইত)

৩. শম্ভুনাথ চক্রবর্তী (সেবাইত)

 এছাড়াও এলাকার বিভিন্ন প্রবীণ মানুষজন

চিত্র‌ ঋণ : সোনাক্ষী পোড়্যা ও কিছু নিজস্ব চিত্র।


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


Friday, 27 March 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৪

 


৺শ্রী শ্রী যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্র শিব মন্দির 

জনার্দনপুর • উত্তরধানখাল • দাসপুর • পশ্চিম মেদিনীপুর

বিশ্বজিৎ ভৌমিক 


আজ থেকে আনুমানিক ৩৫০ বছর পূর্বে, বর্ধমান রাজা শোভা সিংহের অর্থানুকূল্যে চুন, সুরকী এবং পোড়া পেটের ভিতে এই মন্দির নির্মিত। বর্তমানে এই পুরাতন আদলের উপর পেমেন্টের কলেক আবৃত হয়েছে মন্দিরের প্রাচীনতা। বিলীন হয়ে গেছে নাটমন্দির, নহবতখানা, ভোগশালা, ভান্ডারঘর। মন্দিরের পশ্চাৎ ভাগে কংসাবতী নদীতে ভগ্নপ্রায় অবস্থায় এখনো পাকার ঘাট বিদ্যমান রয়েছে। ঘাটটিও নির্মিত হয়েছিল পোড়া মাটির ইট ও চুন সুরকীতে। বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনো শতাধিক যাত্রী একস‌ঙ্গে স্নান করতে পারে। সুপ্রাচীন বটবৃক্ষ (বয়স আনুমানিক চারশত বৎসর) ছায়ায় নদীর শীতল বাতাসে পথিকজন এখনো ক্ষনিক বিশ্রাম করেন। মন্দির গাত্রের টেরাকোটার কাজ বর্তমানের শিল্পকলায় ঢাকা পড়েছে। চলে আসা পরম্পরা অনুযায়ী জানা যায় যে যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্র শিব শম্ভু রাজনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের যদপুর গ্রামে প্রথম ভাগে পূজিত হতেন। বর্তমান সেবাইতগণের পূর্বপুরুষোত্তম তুই যজ্ঞেশ্বর চক্রবর্তী ছিলেন যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্র শিবের নিত্য সেবক। প্রত্যহ নদী পার করে যদুপুরে পুজোর জন্য আসতেন। বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বয়সের ভার প্রভৃতি কারণে তিনি মনোদুঃখ যজ্ঞেশ্বরের শ্রীচরণে নিবেদন করলে যজ্ঞেশ্বর যজ্ঞেশ্বরের সেবা গহনে যদুপুর ত্যাগ করে জনার্দনপুরে কংসাবতী নদী তীরে বটবৃক্ষ তলে স্বয়ম্ভু অবস্থায় অবতীর্ণ হয়ে স্বপ্নাদেশ দ্বারা পূজা প্রচলনের নির্দেশ দেন। অদ্যাবধি সেই ধারায় নিত্য পূজা সেবাকার্য যথা নিয়মে প্রতিপালিত হয়ে চলেছে। গর্ভগৃহের গভীর কুণ্ড মধ্যে স্বয়ম্ভু মহারুদ্র যজ্ঞেশ্বর শিব অধিষ্ঠিত। কথিত আছে যজ্ঞেশ্বর স্বপ্নাদেশ দ্বারা বলেছিলেন যে তার পূজার বন্দোবস্ত তিনি নিজেই করে নেবেন। কোথাও সেই সত্য আজও যেন সুরক্ষিত। কোথাও সেই সত্য আজও যেন সুরক্ষিত। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও থেকে তার নিত্য পূজার গোদগ্ধ, শর্করা, ডাব এবং গঞ্জিকা কোন না কোন ভক্ত সূর্যাস্তের পূর্বেই মন্দিরে নিয়ে আসেন। এই ধারা বিজ্ঞানের বাড় বাড়ন্তের যুগেও অব্যাহত। তাই মন্দিরে সবার মাথা আজও শ্রদ্ধায় নত হয়ে যায়। যদুপুরের সেই সুপ্রাচীন শিব গহ্বর যেখানে যজ্ঞেশ্বর অবস্থান করতেন সেটি আজও অবিকল রয়েছে ঘাস, পাতা ঢাকা অবস্থায়। প্রতি বছর গাজন উৎসবের নবম দিনে সেখানে পূজা করা হয়। 

বর্তমানে যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্রের মন্দির এক ভোগশালা সহ মূল গর্ভগৃহে সজ্জিত। সুউচ্চ চূড়া‌।  চুড়াশীর্ষে একটি তাম্র ত্রিশূল বিদ্যমান, উচ্চতা প্রায় ৫০ ফিট। মন্দিরটি দক্ষিণ দুয়ারী। পশ্চিম ভাগে নদী থেকে সোজা প্রবেশ করা যায়। মন্দিরের পশ্চিমাংশে সুপ্রাচীন বটবৃক্ষমূলে যজ্ঞেশ্বরের বাহন নন্দী শায়িত রয়েছেন। আর রয়েছে সন্ন্যাসীদের শপথ গ্রহণ সূর্যস্তম্ভ। অদূরেই অগ্নি উপাচারে শিব সাধনার হিন্দোল মঞ্চ। আগে ছিল কাঠের তৈরি দরজা বর্তমানে সেটি লৌহ নির্মিত।

প্রতিবছর চৈত্র মাসে ১৬ তারিখ সন্ধ্যায় ঢাক বাদ্য এর (ম‌উলা) পূজা দ্বারা (ধুম্বুল) যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্রের গাজন উৎসবের মন্দিরে পূজার সূচনা হয়। এখানে নয় দিবস ধরে গাজন উৎসব সম্পন্ন হয়। যা এখানকার গ্রামীণ ভাষায় ন-ভোগের মাড়ো। অতঃপর ১৬,১৭,১৮,১৯ শে চৈত্র পর্যন্ত ঢাকা সহযোগে নিত্য পূজা চলে। ১৯ শে চৈত্র বিকালে যজ্ঞেশ্বর ১৭ গ্রামের ঠাকুর হওয়ায় তার ভক্তদের বাড়ি বাড়ি পুরোহিত ঠাকুর ভিন্ন পত্র বিতরণের মাধ্যমে গাজনের আমন্ত্রণ জানান গ্রাম্য কোথায় এর নাম 'মালা কেরানো'। পরদিন ২০শে চৈত্র অতি প্রত্যুষে চাঁচর ঢাকের বাধ্য সহযোগে দেউল তোলা হয় এবং মাগুর মাছ বলি দেওয়ার কথা আজ‌ও অব্যাহত। এর নাম কামিন্যা উঠানো। এরপর নতুন বাঁশের মাথায় ত্রিকোণ লাল নিশান বেঁধে মন্দির বাঁচতে রাখা হয়। একে বলা হয় দেউল বাঁশ। 

প্রতিদিন চলতে থাকে ভোগ মোদার পূজা। প্রথম দিন পুরোহিত ব্রাহ্মনের ভোগ। পাশাপাশি সবাই ঐ দিন পুরোহিত ব্রাহ্মণের গৃহে আমন্ত্রিত হয়ে জলযোগের দ্বারা শিব প্রসাদ গ্রহন করেন। দ্বিতীয় দিন পাট ভোক্তার ভোগ। ক্রমান্বয়ে তৃতীয় চতুর্থ পঞ্চম ও ষষ্ঠ দিন গুলিতে যথারীতি মোদা হয় রাজার ভোগ, দেশের ভোগ, গোয়ালার ভোগ এবং পাখিরার ভোগ। ৭ম দিবস এর নাম ছোট ভোগ। ঐ দিনই গ্রাম বা দূরের গ্রাম  এখন শহর থেকেও বাবার মানত পরিশোধের নিমিত্ত সবাই মন্দিরে উপস্থিত হয়ে নব বস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কংসাবতী তে স্নান সেরে মন্দির দ্বারে উপস্থিত হয়ে সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন। কোনো কোনো বৎসর সংখ্যা ৬০ এর অধিক হয়ে যায়। স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে ব্রত গ্রহন করতে পারেন। কোনো বাধা কারুকে করা হয় না। ৮ম দিন বড়ভোগ, ভোগ সংখ্যা ২৯ টি পরিবার, অধিক রাত্রে সন্ন্যাসীরা ফেরেন, ভোগ রান্না করে নিবেদন করতে রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যায়। নবম দিন ভোগের নাম গুড়ান ভোগ, ঐ দিনই যদুপুরে বাবার পুরানো কুন্ডে পূজা নিবেদন সহ ভোগ মোদা হয়। দশম দিন মহা সমারোহে সহস্রাধিক ভক্ত পূন্যার্থী সমাগমে কংসাবতী নদী থেকে জল নিয়ে সবাই মন্দিরে বাবার মাথায় ঢালেন। চলে বেলা গড়িয়ে এক দিনের মেলা। রাত্রিতে মহাসমারোহে বাবার মহা মিলন পূজা বাদ্য বাজি আলোক সজ্জা সহযোগে সম্পন্ন হয়। পর দিবস অখণ্ড পোড়ানো, তারপর কাঁটা গড়ানো সন্ন্যাসীদের ব্রতভঙ্গের মধ্য দিয়ে গাজন পর্বের সমাপ্তি হয়। ছোট ভোগের দিন থেকেই চলতে থাকে প্রতি সন্ধ্যায়, জলন্ত দন্ড সহযোগ নৃত্য, দেউল দৌড় হাত চালা, মাথা চালা প্রভৃতি শিব পূজার আঙ্গিক সহ শিব সাধনা। জলন্ত অগ্নিকুন্ডে ধূনা পুড়িয়ে হিন্দোল দোল। দেখতে ভিড় করে গ্রাম ও পাশাপাশি গ্রামের অসংখ্য নরনারী।

যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্র শিবের ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে বাবা খুবই জাগ্রত। এ বিষয়ে অগাধ  বিশ্বাস মানুষ জনের। বন্যা কাতর জনার্দনপুরবাসী যজ্ঞেশ্বরের অপার করুণাতেই নদী ভাঙ রুখতে পারেন। এ সম্পর্কে কথিত আছে ভাঙে ভাঙে বাঁধ, বাবার দয়ায় আর ভাঙে না। অতীত থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর দহতে জল কখনও শুকানো হয় না। নানান প্রজাতির মাছের ঘর যজ্ঞেশ্বরের দহ। অতীত দেখ শুকায়নি। সন্তান হীনাদের কোল আলো করে বাবার কৃপায় সন্তান আসে বলে ভক্তরা আজ‌ও বিশ্বাস করে মানত করে ফল পেয়ে থাকেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে হত্যে দিলে যাতে হাতে হাতে ফল মেলে। এটি ধ্রুব সত্য বলে সবাই বিশ্বাস করে থাকেন। এটিকেই বলা হয় বাবার নিত্যটান বা বিশেষ আকর্ষন। বাবার একটি বিখ্যাত গান গান হচ্ছে...

"যজ্ঞেশ্বরের চরণের সেবা লাগে

তোমার সেবক তোমার ডাকে

মহাদেব মহাদেব"।

যগেশ্বর মহারুদ্র শিবের গাজন উপলক্ষে প্রচলিত বিশাল বড় মেলার প্রচলন নাই। কেবলমাত্র মহামেল উপলক্ষ্যে এক দিবসীয় মেলা ও রাত্রিতে কবিগানের আসর বসে। মাঝে মধ্যে যাত্রা, বাউল, লোকগান অথবা বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়েজন হয়।

যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্র শিবের নিষ্কর সম্পত্তি শিবোত্তরের নামে সেবাইত গণের মধ্যে বিলি বণ্টন করা আছে। সেই চাষাবাদ এবং সামান্য কিছু ভক্তদের দ্বারা সেই সংগৃহীত অর্থে পূজা ও সেবা কার্য চলে আসছে। মন্দির চত্ত্বরটি রক্ষণাবেক্ষণ সহ আকর্ষনীয় পরিবেশ সৃষ্টি হলে ভবিষ্যতে একটি স্থানীয় গ্রাম্য ভ্রমন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। 

তথ্য ঋণ :-

বর্তমান সেবাইতগনের পক্ষে -

সুশান্ত চক্রবর্তী 

সুনীল চক্রবর্ত্তী

অশোক চক্রবর্তী

সুশীল চক্রবর্তী 

অলোক চক্রবর্তী

এবং অন্যান্যরা

চিত্র ঋণ : সুব্রত পাত্র ও নিজস্ব চিত্র



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪






Tuesday, 24 March 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৩

 


দেউলতলার গাজন

সায়ন সামন্ত 

History is always written by the winners। ইতিহাস নিয়ন্ত্রিত হয় বিজয়ীদের হাতের ইঙ্গিতে। অথচ যারা নিম্নবর্গীয়, যারা অন্ত্যজ তাদের ইতিহাস লেখার জন্য বারংবার রনজিৎ গুহরা এই পৃথিবীতে আসেননা। তাঁদের লোক কথা, লোক শিল্প, লোক উৎসবের কাহিনী শুধুমাত্র লোক মুখেই প্রচলিত হতে থাকে। বাংলায় এমনই কিছু লোক উৎসবের উল্লেখ শাস্ত্রে থাকলেও এমন বেশ কিছু লোক উৎসব রয়েছে যেগুলির উল্লেখ শাস্ত্র গ্রন্থে মিলবে না। যেমন 'অম্বুবাচী' কিংবা 'নবান্ন' শাস্ত্রে উল্লিখিত হয়েছে, কিন্তু আশ্চর্যের, একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর জীমূতবাহনের 'কালবিবেক', পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচিত বৃহস্পতি রায়মুকুটের 'স্মৃতি রত্নহার',  ষোড়শ শতাব্দীর গোবিন্দানন্দ কবিকঙ্কণাচার্যের 'বর্ষক্রিয়া কৌমুদী' কিংবা ষোড়শ শতাব্দীর রঘুনন্দনের 'তিথিতত্ত্বে' 'চড়ক' বা 'গাজনের' নাম উল্লিখিত হয়নি। এই লোক উৎসবগুলির মধ্যে গাজন অথবা চড়কের দিকে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি তবে দেখতে পাবো শুধুমাত্র বাংলায় বা এই দেশ ভারতবর্ষে গাজনের শিকড় সীমাবদ্ধ নয়।  গ্রিস দেশে Bachchu দেবকে বলা হত Dionysus। এই দেবতার গাজন অনুষ্ঠিত হতো। মিশরে লিঙ্গদেব আসীরসকে গাজন উপলক্ষে ৩৮০ কলসি দুধে স্নান করানো হত। প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তরে হেব্রিদিস দ্বীপপুঞ্জে Bunlap নামে যে দ্বীপের অবস্থিতি, সেখানে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির ১৫ থেকে ১৮ এই চারদিন ৭০ ফুট উচ্চ মঞ্চ থেকে যে ঝাঁপ দেওয়ার রীতি, তার সাথে আমাদের গাজনের সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। তাই এই উৎসবের ব্যাপকতা ও পরিধি একে একটি বহুমাত্রিক উৎসবে পরিণত করেছে। 

গাজন শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানান মতভেদ রয়েছে। গাজন যাঁদের মতে শিবের বিবাহোৎসব তাঁদের মতে ভক্ত্যারা হল শিবের বিবাহের বরযাত্রী। তাদের সমবেত গর্জন থেকেই নাকি 'গাজন' শব্দটির উদ্ভব। আবার কেউ বা বললেন গাঁ জনের উৎসব বলেই 'গাজন'। গাজন শিবের বিবাহোৎসব, কারো মতে এটি একটি কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব যে উৎসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাদুক্রিয়া এবং Fertility cult। কারো মতে তথাকথিত অন্ত্যজদের উৎসব, 'দরিদ্রের মহোৎসব', কারো মতে বর্ষশেষে সৌরচক্রের সমাপ্তির দ্যোতক। নানা বিষয়ে মতভেদ থাকলেও দুটি বিষয়ে ঐকমত্য পরিলক্ষিত হয়-তা হল চড়ক কিংবা গাজন, গম্ভীরা কিংবা বোলান যাই হোক না কেন, তা শিবকেন্দ্রিক। এসব লোকোৎসবের কেন্দ্রে রয়েছেন শিব। দ্বিতীয়ত চড়ক অথবা গাজন যাই বলি না কেন মূলত এই উৎসবের অংশগ্রহণকারীরা হল তথাকথিত অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ। আজও গ্রাম বাংলা থেকে শহরতলী মহা সমারোহে গাজন উদযাপিত হয়। তবে এলাকাভেদে, স্থানভেদে এই গাজন উদযাপনের নিয়মের কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বাংলায় মেদিনীপুরের কেশপুর এলাকার চিত্রটিও খানিক এমন। জেলার বিখ্যাত কিছু গাজন অনুষ্ঠিত হয় এই এলাকায় এবং তার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট বর্তমান আনন্দপুর থানার কানাশোল গ্রামের ঝাড়েশ্বর মন্দিরের গাজন। 

মেদিনীপুরের আনন্দপুর থানার কানাশোলে ঝাড়েশ্বর শিবের প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের প্রাচীন মন্দির রয়েছে। প্রাচীন টেরাকোটার মন্দিরটি ভীষণ দৃষ্টিনন্দন। নাড়াজোল এর রাজা অযোধ্যারাম খানের দেওয়ান রামনারায়ন জানা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। লোকশ্রুতি আছে- মন্দির প্রতিষ্ঠার পূর্বে এইখানের জঙ্গলে এক কৃষ্ণ গাভী বটগাছের নিচে এক জায়গায় রোজ দুধ দিত। এক রাখাল বালক সেটি দেখতে পায়। ঠিক ওই দিন রাত্রে ব্রাহ্মণভূমের রাজা আলাল দেব, ওই গাভীর মালিক এবং আড়িয়াদহের শীতলানন্দ মিশ্র তিনজনই স্বপ্নাদেশ পান! ওই বটগাছের নিচে রয়েছে অনাদি লিঙ্গ। সেই লিঙ্গ কে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নাদেশ পেয়ে বট গাছের নিচ থেকে লিঙ্গ খনন করা হয় এবং ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দের ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তে এই প্রাচীন  ঝাড়েশ্বরের মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। মূল মন্দিরের পাশে মহাকাল ভৈরবের থান, ভোগ মন্ডপ, নাটমন্দির অবস্থিত। প্রাচীন বটের ছায়ায় প্রাকৃতিক পরিবেশে বাবা ঝাড়েশ্বর অধিষ্ঠান করছেন। মন্দিরের পেছনেই রয়েছে ১৪ একরের এক  বিশাল দিঘী যেটি রাজা আলাল দেব খনন করেন। রাজা আলালনাথ দেবের নাম অনুসারে এই বৃহৎ দিঘীটি “আলাল দিঘী” নামে পরিচিত। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই নদীয়াল দেব দাদার স্মৃতিতে ওই জলাশয় এর মধ্যে এক মাকডা পাথরের জলহরি মন্দির তৈরি করেন যা বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত। অনাদি লিঙ্গের পেছনের পূর্বপাশে দেওয়ালে অষ্টাদশভূজা মা দুর্গার মূর্তি খোদিত আছে। নাড়াজোল রাজবংশের কুলদেবী ইনি। এটি ৬৭ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি বাঁকানো কার্নিশযুক্ত পঞ্চরত্ন মন্দির। মন্দিরগাত্রে রয়েছে অসংখ্য পোড়ামাটির কাজ। পোড়ামাটির মূর্তিগুলির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, রাধাকৃষ্ণের লীলা, রামায়ণের কাহিনী, দশাবতার, মিথুনদৃশ্য সহ বিভিন্ন পৌরানিক কাহিনী। রোগনিরাময়ের দেবতা বাবা ঝাড়েশ্বর। রোগমুক্তিতে বহু ভক্ত বাবার মন্দিরে তিনদিন নির্জলা উপবাস পালন করে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন এবং কথিত আছে এভাবেই বহু ভক্তের রোগমুক্তি ঘটিয়েছেন বাবা ঝাড়েশ্বর। তবে গাজন শুরুর নিয়মকানুন খানিক আলাদা বাবার মন্দিরে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায় দশ থেকে বারো লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় এখানে। প্রায় ১৫ দিন ধরে চলতে থাকে গাজনের অনুষ্ঠান। 

চৈত্র মাসের ১৫ তারিখের পর প্রথম শনি অথবা মঙ্গলবারে সূচনা হয় এই উৎসবের। গাজন শুরুর দিনে আয়োজিত হয় একটি সার্বজনীন ভোজ অনুষ্ঠানের। যেখানে কানাশোল গ্রামবাসী প্রায় ২০ হাজার মানুষকে সজনে ডাটার ব্যঞ্জন , মুগ-মুসুর মিশ্রিত ডাল, এবং আলাল পুকুর থেকে সংগৃহিত মাছ সহযোগে ভোজ খাইয়ে থাকেন। ওইদিন রাত্রি ২টোর মধ্যে সমস্ত ভোজন ক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। ভোজন সম্পন্ন হলে ওইদিনই গাজনের ঘট প্রতিষ্ঠা হয় এবং সূচনা হয় গাজনের। গাজনের যেই ঘট প্রতিষ্ঠিত হলো তার নাম ‘শিবকামিন্ন্যা’ অর্থাৎ শিবকে কামনা করে প্রতিষ্ঠিত ঘট। প্রতিষ্ঠিত ঘটের সামনে দুজন মূল সন্যাসী একজন কে বলা হয় ধর্মাধিকারী এবং অপরজন পাট ভক্ত্যা - “আত্ম গোত্র পরিত্যজ্য: শিব গোত্রে প্রবেশিত:” এই মন্ত্র তিনবার বলে নিজ গোত্র পরিত্যাগ করে শিব গোত্রে দীক্ষা নেন। পরদিন সকালে শুরু হয় ‘গাছডাক’ প্রক্রিয়া। মূলত গাজন উৎসবটি এসেছে ধর্মঠাকুরের গাজনকে প্রতিস্থাপিত করে। আগে যা ধর্মের গাজন নামে পরিচিত ছিল এখন সেখানে পালিত হয় শিবের গাজন। এই গাছডাক ধর্মের গাজনের সঙ্গে সম্পর্কিত এর অপর নাম ‘ধর্মের ডাক’। এই প্রক্রিয়ায় হিন্দোলা তলায় বাবা ঝাড়েশ্বর, শিবকামিন্ন্যা ঘট, ধর্মাধিকারী (ধর্ম ঠাকুরের প্রধান সন্ন্যাসী), কাউল লাউসেন (ধর্মমঙ্গল কাব্যের প্রধান নায়ক ও বীরপুরুষ), এবং সত্য, দাপর, ক্রেতা, কলি এই চারযুগের ভক্তবৃদদের কাহিনী ৮৩ কলি ছড়ার মাধ্যমে গেয়ে প্রণাম জানিয়ে তাদের আহ্বান করা হয়। গাছডাক প্রক্রিয়া শেষের পর শুরু হয় হিন্দোলা এবং  দন্ডখেলা (ধুনিচি বা লোহার দণ্ডে আগুন নিয়ে এক বিশেষ প্রকারের নাচ)। এইদিন শুধুমাত্র পাট ভক্ত্যা হিন্দোলাতে অংশ নেন। দন্ডখেলা শেষ হলে শুরু হয় ভোগ নিবেদন। ১২ - ১৫ টি ভোগ অর্থাৎ পরপর ১২ - ১৫ দিন মাটির পাত্রে খুন্তির ব্যবহার ছাড়া আতপ চাল এবং গুড় সহযোগে পরমান্ন রন্ধন করে সেই ভোগ অর্পণ করা হয় বাবা ঝাড়েশ্বরকে যা ‘ভোগডাক’ নামে পরিচিত। ভোগ অর্পণের সময় একই প্রকারে ১২ কলির ছড়া গেয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। নিবেদিত ভোগ পাট ভক্ত্যা আলাল পুকুরে বিসর্জন দিয়ে আসে। 

পরবর্তী দিনগুলিতে একই রীতিতে চলতে থাকে ভোগ নিবেদন। গাজনের ঘট ডোবানোর আগে প্রতিষ্ঠিত হয় আলাম দন্ড। আলাম প্রকৃতপক্ষে কাপড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন ফুলের নকশাসম্পন্ন এক বস্ত্রখণ্ডবিশেষ। রাঙামাটিতে চাকমা সম্প্রদায়ের লোকেরা বয়ন কর্মে এটি ব্যবহার করে। গাজনে একটি উঁচু বাঁশের মাথায় এই কাপড়খন্ড বেঁধে পবিত্র মন্ত্রচ্চারণে তৈরি হয় এই আলাম দন্ড যা মন্দিরের চুঁড়া লক্ষ্য করে রাখা হয়। পরবর্তী পাঁচদিন ব্যাপী চলতে থাকে ‘গাজনভাঁটা’। অর্থাৎ সন্ন্যাসীরা দল বেঁধে গৃহস্থদের বাড়ি বাড়ি যায় বাদ্য সহকারে। সেখানে গৃহস্থের দেওয়া আল্পনায় পিঁড়ি ও হলুদ জলের উপর রাখে ঘাটে পূজিত বাঁশের পতাকা। যথাসাধ্য মান্য দিয়ে থাকে গৃহস্থ। সেরে ফেলেন নিমন্ত্রণের পালা। তারপর ঠাকুর যাবেন অন্য বাড়ি। ঠিক পাঁচদিন চলবে এই গাজনভাঁটা। 

অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হয় ২৬ চৈত্র। এইদিন শুরু হবে বেতভাঙা পর্ব। গাজন উৎসবে বাবা ঝাড়েশ্বরের উপাসনায় যারা যুক্ত হবে তাদের দীক্ষা লাভ হয় এই পর্বে। হবু সন্ন্যাসীকে একদিন নিরামিষ আহার গ্রহণ করে মন্দিরে এসে আলাল পুকুরে স্নান সেরে নতুন বস্ত্র পরে মন্দিরের চারদিকে তিনবার দণ্ডী কেটে আবার স্নান করে মন্দিরের পুরোহিতের থেকে উপবীত ধারণ করেন। উপবীত  হলো সাদা সুতোয় কাশ ঘাস বেঁধে বানানো এক বিশেষ মালা। এই মালা গলায় পরে হাতে বেত নিয়ে শিব গোত্রে দীক্ষা নিতে হয়। প্রায় ১৭০০০ সন্ন্যাসী এই পর্বে দীক্ষা গ্রহণ করে প্রতিবছর। সারাদিন নির্জলা উপবাসের পর স্নান সেরে বাবার চরণে অঞ্জলী দিয়ে ফলাহার করেন এরা। এবং শেষ রাতে গ্রহণ করে হবিষ্যি। সবার অলক্ষ্যে মাটির পাত্রে তালপাতা বা পাটকাঠির জ্বালানিতে আতপচাল ফুটিয়ে দুধ এবং গুড় সহকারে খাওয়ায় প্রথা রয়েছে এখানে। সেইদিন থেকে সন্ন্যাসীর পরিবারের অসৌচ থাকলেও সন্ন্যাসীর অসৌচ থাকে না।

২৮ চৈত্র অনুষ্ঠিত হয় ‘কলাকাটা’, ‘কাঁটাঝাপ’। বাবার ভক্তরা চিরদিনই ছন্নছাড়া, জাগতিক নিয়ম তারা মানেন না, সেই অনুসারেই কলার কাঁদি, কাঁঠাল, সজনে ডাটা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার ফল ও সবজি সহযোগে এক প্রকার নাচ চলতে থাকে যাকে বলা হয় কলাকাটা। তার সঙ্গেই অনুষ্ঠিত হয় কাঁটাঝাপ। বাবলা ও কন্টিকারি জাতীয় কাঁটা গাছ পিঠে মারতে শুরু করে সন্ন্যাসীরা। এও এক প্রকার কৃচ্ছ্রসাধন।   

২৯ চৈত্র অনুষ্ঠিত হয় নীল পূজা। কয়েক লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় এই দিন। কুমারী মেয়েরা উপযুক্ত স্বামী লাভের আশায় এবং বিবাহিত মহিলারা স্বামী, সন্তান এবং পরিবারের মঙ্গল কামনায় শিবের মাথায় দুধ, জল, মধু, ঘি ইত্যাদি ঢেলে থাকে। দুপুর ১ টায় মন্দিরে শুরু হয় ধ্বজা বাঁধার আয়োজন। যে সমস্ত ভক্তদের ধ্বজা মানসিক থাকে তাদের নামে সংকল্প করে মন্দিরের চূঁড়ায় পুজো দেওয়া হয় এবং তারপরে মন্দিরের চূঁড়ায় ধ্বজা বেঁধে মন্দিরের সামনের বটগাছে সেই ধ্বজা ছুঁয়ে তা  মন্দিরে ভেতরে প্রবেশ করে বাবার মাথায় বাঁধা হয়। এরপর পুনরায় চলতে থাকে জলঢালা এবং পূজো। ওইদিন সন্ধ্যায় আয়োজিত হয় শিবের বিয়ে। শিবায়ন গানের আসর বসে মন্দির প্রাঙ্গণে। 

বিবাহ সম্পন্ন হলে আগুন সন্ন্যাসের প্রস্তুতি শুরু হয়। এখানে পালন হয় একটি বিশেষ উপাচার। মন্দিরের ভেতরে মন্দিরের সেবাইত আবির দিয়ে অঙ্কন করেন ‘মেল ঘর’। যে সমস্ত নারীর বিবাহের আট - দশ বছর পরেও সন্তান লাভ হয়নি তারা এই মেল আঁকার দৃশ্য দেখার জন্য মন্দিরে ভিড় করেন। কথিত আছে এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলে নারীরা বাবা ঝাড়েশ্বরের কৃপায় সন্তানলাভ করে। এই ক্ষণে সন্ন্যাসীরা শ্মশান থেকে সংগৃহীত মৃতদেহ পোড়া কাঠ, ফুলঘর, মৃত মানুষের হাড়, খড়, মৃতদেহ পোড়ানোর বাঁশ ইত্যাদি হাতে নিয়ে প্রবল নৃত্য করতে করতে মন্দির সংলগ্ন একটি ফাঁকা জায়গায় গিয়ে উপস্থিত হয় এবং কাঠে আগুন ধরিয়ে উদযাপন হয় আগুন সন্ন্যাস। সন্ন্যাসীদের মধ্যে যদি ওইদিন কেউ মারা যায় তবে তাকেও ওই জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হয়। সন্ন্যাসীদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ একজনকে নতুন শাড়ি, সোলার গয়না পরিয়ে সতী সাজানো হয়। তার হাতে দেওয়া হয় কলসী ভরা  ধুনো এবং আম শাখা। তাকে কাঁধে তুলে সন্ন্যাসীরা আগুন সন্ন্যাসের জন্য রওনা হয়। জ্বলন্ত আগুনে সতী হাতে ধরা ধুনোর কলসি নিক্ষেপ করে। প্রাচীনকালে সতীদাহ প্রথার একটি প্রতীকী উদাহরণ এই ধুনো নিক্ষেপ। অপরদিকে এই আগুন সন্ন্যাস চলাকালীন ধর্মাধিকারী ও পাট ভক্ত্যা স্নান করে বাবার মন্দিরে গিয়ে মেলঘরে আঁকা বাবার রূপ প্রথম প্রত্যক্ষ করেন এবং পরমুহুর্তেই সেটি হাত দিয়ে মুছে দেন। আগুন সন্ন্যাস থেকে ফিরে এসে অপর সন্ন্যাসীরা মন্দিরের ওই মুছে যাওয়া মেল ঘর দেখতে পান।

পরের দিন ৩০ চৈত্র, সংক্রান্তির দিন সকালে সন্ন্যাসীরা তেল হলুদ মেখে স্নান সেরে মন্দিরে দণ্ডী কাটার পর নিজদের গলার উপবীত খুলে  ঘাটে বিসর্জন দেয়। কিছু বছর আগে পর্যন্ত এই স্থানে চড়ক হতো, কিন্তু বর্তমানে প্রশাসনিক অনুমতি না মেলায় সেটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে।  মেলের দিন থেকেই শুরু হয় গাজনের মেলা, মেলা চলে প্রায় বৈশাখ মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত। ওইদিন বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় শেষ লোকাচার ‘পাটরাকাঠ'। দুটি ইউক্যালিপটাস গাছের দন্ড নিয়ে মাঝে কলাগাছের কান্ডের সাহায্যে খাটিয়া তৈরি করা হয়। খাটিয়ায় কলাগাছের ওপরে ছুরি সদৃশ কিছু শলাকা বসানো থাকে। ওই কলাগাছের ওপর পাট ভক্ত্যা শুয়ে থাকেন এবং ধর্মাধিকারী সঙ্গমের অবস্থানে বসে একটি মিলন দৃশ্য রচনা করেন। শিবকে চিরকাল কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের মানুষেরা কৃষি এবং যৌনতার দেবতা হিসেবে পুজো করে এসেছেন। কিন্তু বাবা ঝাড়েশ্বরের গাজন শুধুমাত্র শিবের গাজন নয় এটি শিব এবং ধর্মরাজের গাজনের সম্মিলিত রূপ। মন্দিরের দেওয়ালে আজও মূর্তিরূপে খোদিত আছে সঙ্গমদৃশ। এখানে শিব হয়ে উঠেছেন স্বয়ং  Fertility cult।  সেই সূত্রেই ঐতিহ্যের এই ধারাকে আজও বয়ে নিয়ে চলেছেন কানাশোল গ্রামবাসীবৃন্দ। গ্রামবাসীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অনুষ্ঠিত হয় গাজন, শিবরাত্রি, শ্রাবণ মাসে জলদানের জন্য আজও মন্দিরে ছুটে আসেন লক্ষ লক্ষ ভক্তবৃন্দ। 

কানাশোল ঝাড়েশ্বর মন্দির থেকে 10 মাইল পূর্বে কেশপুরের  নেড়াদেউল গ্রামে অবস্থিত কামেশ্বর মন্দির।  ঝাড়েশ্বর মন্দিরের সঙ্গে কামেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের ব্যাপক মিল রয়েছে। ষোল শতকের শেষের দিকে রাজা উমাপতি রায় ভট্টদেব এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। উমাপতি কামেশ্বর শিব লিঙ্গের সন্ধান পেয়েছিলেন স্বপ্নে। তখন ব্রাহ্মণভূম পরগনার এই অঞ্চলে লাটা জঙ্গল ছিল। অদ্ভুতভাবে কানাশোলের মতো এই স্থানেও মন্দির প্রতিষ্ঠার পূর্বে  জঙ্গলে এক কৃষ্ণ গাভী  এক শিলাখণ্ডে রোজ দুধ দিত। এক রাখাল বালক সেটি দেখতে পায়। এবং সেইদিনই রাজা উমাপতি স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নাদেশ পেয়ে উমাপতি জঙ্গল পরিষ্কার করে শিলাখণ্ড আবিষ্কার করেন এবং গড়ে তোলেন মন্দির।

কামেশ্বর বাবা এখানে স্বয়ং প্রভু জগন্নাথ হিসেবে মন্দিরে বিরাজ করেন। এই দেবমন্দির এক রাত্রির মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল। মন্দিরে নির্মাণের ভার অর্পণ করা হয়েছিল স্বয়ং বিশ্বকর্মার ওপর। কিন্তু সম্পূর্ণ রাত্রি কাজ করার পরেও মন্দিরের চুঁড়া নির্মাণ কিছুটা বাকি থেকে যায়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্দির অসম্পূর্ণ রেখেই ওই স্থান পরিত্যাগ করেন বিশ্বকর্মা। ন্যাড়া ছাদের নিচেই অধিষ্ঠান করেন কামেশ্বর বাবা। সেই থেকেই এই স্থা  নের নামকরণ করা হয় নেড়াদেউল। বাবা কামেশ্বর উমাপতিকে জগন্নাথ রূপে দেখা দেন এবং আদেশ করেন মন্দিরের পূজা পরিচালনার জন্য উৎকল থেকে দুইজন ব্রাহ্মণ আনা আবশ্যক। বাবার আদেশে উমাপতি উৎকল থেকে দুজন পন্ডা ও দুইজন ত্রিপাঠী পুরোহিতকে নিয়ে এসে মন্দিরের নিত্য পূজার ভার অর্পণ করেন। বর্ধমানরাজ তেজচন্দ্র বাহাদুরকে বাবা কামেশ্বর মন্দিরের ভেতরেই জগন্নাথ দর্শন করান। মুগ্ধ হয়ে বর্ধমানরাজ একশো বিঘা বাস্তু, পুকুর এবং দুইশত বিঘা কৃষি জমি প্রদান করেন। তখন থেকেই আজ পর্যন্ত কামেশ্বর মন্দিরে প্রতিদিন জগন্নাথ ভোগ নিবেদন হয়। নিত্য ভোগের পাকাপাকি বন্দোবস্ত করার জন্য মন্দিরের নামে ৩৬৫ বিঘা কৃষিজমি রয়েছে।  এক বিঘা জমি থেকে প্রাপ্ত বার্ষিক আয়ে একদিন মন্দিরের ভোগের বন্দোবস্ত করা হয়। উৎকলের শিল্প রীতিতেই তৈরি এই মন্দির। বাবা কামেশ্বরের দর্শনে শ্রীক্ষেত্র দর্শনের ফল হবে, তিনিই বিশ্বনাথ তিনিই জগন্নাথ, মানুষের এই বিশ্বাস। নানান রোগ ব্যাধি থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে আজও বাবার স্মরণাপন্ন হন বহু বহু মানুষ। কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে এই মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। পৌষ সংক্রান্তিতে বিরাট মেলা বসে এই মন্দিরে। মহা সমারোহে পালিত হয় গাজন উৎসব। 

তবে বর্তমানে কামেশ্বর বাবা মন্দিরে গাজন শুরু হয় চৈত্রের শেষের দিকে। এখানে গাজনের শুরুতে নয় গাজনের শেষে হয় মহাভোজের আয়োজন। গাজনের শুরুতে এখানে দীক্ষা নেন পাট ভক্ত্যা, তারপর কোটাল ভক্ত্যা এবং শেষের চারদিন বাকি সন্ন্যাসীরা দীক্ষা নিয়ে থাকেন। পাট ভক্ত্যা দীক্ষা নেওয়ার পর ক্রমানুযায়ী চলতে থাকে একের পর এক গাছডাক, হিন্দোলা, ভোগডাক প্রভৃতি আচার অনুষ্ঠান। তবে কামেশ্বর বাবার মন্দিরের ভোগ মাটির পাত্রে রান্না হয়না। ২৬ চৈত্র থেকে পালিত হয় বেতভাঙা, কাঁটাভাঙার মতো আচার। ২৯ চৈত্র অর্থাৎ মেলের দিন বাবার মাথায় জলঢালা শুরু হয়। দুপুরে ধ্বজা বাঁধার রীতিও চলতে থাকে তবে বাবার মন্দিরে শুধুমাত্র সাদা ধ্বজা বাঁধা হয়। সন্ধ্যার শিবের বিয়ে সম্পন্ন হলে আগুন সন্যাসের আয়োজন হয়। সংক্রান্তির দিন বাণ ফোঁড়া ও চড়ক। ‘বাণ ফোঁড়া’ নিয়ে এক বিশেষ প্রবাদ রয়েছে। হরিবংশের বাণ রাজা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধে ঘোরতর আহত হন। রাজা বাণবিদ্ধ অবস্থায় শোণিতাপ্লুত দেহ নিয়ে  শিব সন্নিকটে নৃত্য করেছিলেন। তাতে শিব খুশি হয়ে বাণকে অমরত্বের বর প্রদান করেছিলেন। এবং তিনি আরও বলেছিলেন - ‘সত্যপরায়ণ ও সরলতা সম্পন্ন আমার যে ভক্ত নিরাহার থাকিয়া এইরূপ নৃত্য করিবে, সে আমার পুত্রত্ব লাভ করিবে'। এই কারণে চৈত্রোৎসবে ভক্ত্যারা বাণবিদ্ধ শোণিতাপ্লুত কলেবরে শিবসকাশে তাণ্ডব পৈশাচিক নৃত্য করে থাকে। এতে পরমায়ু, ধন, মান ও জীবনান্তে অমরত্ব  লাভ হবে এই বিশ্বাস। বাণরাজা এর পথ প্রদর্শক বলে এই উৎসবের নাম 'বাণফোঁড়া' হয়েছে। বাণ ব্যবহারের আগে বাণ-কে বালির সাহায্যে ঘষে মেজে নেওয়া হয় ও ঘি লাগানো হয়। বাণের পূজা হয়। এরপর কামার স্নান সেরে দেবতার ফুল নিয়ে বাণফোঁড়ার কাজে ব্রতী হয়। বাণ খোলার পর ঘি ব্যবহার করা হয়। কেউ কেউ আবার তিল গুঁড়ো ঘি-র সঙ্গে মিশিয়ে ক্ষত স্থানে লাগায়। কেউ কেউ আবার পদ্মফুল কুঁড়ি চিবিয়ে নেয়। কেউ আবার মন্দিরের গায়ে বা চড়ককাঠে পিঠ ঘষে নেয়। দেহের একই স্থানে দু'বার বাণ ফোঁড়া নিষিদ্ধ। বাণ ফোঁড়ার পর ভক্ত্যারা পিশাচ, ডাকিনীর বেশে সেজে নৃত্য করতে করতে নেড়াদেউল বাজার ও মন্দির প্রদক্ষিণ করে। বিভিন্ন মন্দিরে চড়ক উল্টে দুর্ঘটনার কথা প্রতি বছরই আমরা শুনতে পাই, এর স্থায়ী সমাধান হিসেবে কামেশ্বর বাবার মন্দিরে চড়ক কাঠটি স্থায়ীভাবে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ১লা বৈশাখ সমাপ্ত হয় গাজন। বিসর্জন দেওয়া হয় গাজনের ঘট। 

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কোনো না কোনো সময়ে গাজন অনুষ্ঠিত হয়। ধর্মনিরপেক্ষ এই অনুষ্ঠানে সকলের মঙ্গল কামনায় সঙ্গে সঙ্গে বাংলার মানুষ তাদের সাংস্কৃতিক কুশলতা এবং শিল্পচর্চার নিদর্শনকে মেলে ধরে। গাজন শুধুমাত্র একটি লৌকিক অনুষ্ঠান নয়, এটি ত্যাগ, সংযম, ভক্তি, কৃচ্ছ্রসাধনের এক মেলবন্ধন। সকলের চাষাবাদ ভালো হোক, সকলে সুখে থাকুক, হাসি-খুশিতে থাকুক এবং প্রাণবন্ত থাকুক এটাই বোধহয় গাজন উৎসবের মূল প্রার্থনা।

যে পাথর ঘষে মানুষ একদিন আগুন জ্বালাতে শিখেছে, হাতিয়ার হিসেবে যে পাথর একদিন হাতে তুলে নিয়েছে, যে পাথরে তারা একদিন ফুল ফুটিয়েছে, সেই পাথরকে মানুষই মাটি থেকে তুলে এনে দেবত্ব প্রদান করেছে। তাকে বিশ্বাস করেছে, তাকে দেখে দুহাত মাথায় ঠেকিয়েছে, ভেবে এসেছে যুগে যুগে এই দেবতা রক্ষা করেছে মানব জাতির অস্তিত্ব, তবে সিন্ধু সভ্যতার পশুপতি হোক বা মিশরীয় সভ্যতার ওসিরিস, কিংবা মেসোপটেমিয়ার এলনিন হোক বা রোমান সভ্যতার জুপিটার থেকে আজকের মহেশ্বর সবার ওপরে ‘মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই।’



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

Friday, 20 March 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ২

 


ঘাটাল ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদের গাজন ও গাজন মেলা

মহাশ্বেতা দাস

   

নিত্যদিনের টানাপোড়েনের দিনলিপির নদীটা ডিঙিয়ে আমরা সবাই একটা পাহাড়ের খোঁজ করি…. যে পাহাড়টা খুশীর পাথর দিয়ে তৈরী! সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আছে এক মস্ত আনন্দের বাগান! সেই বাগান থেকে দু একটা ফুল নিত্য দিনের মন খারাপের আঙিনায় টুপটাপ করে ঝরে পড়ে, বাগানের লতাপাতা ব্যস্ত জীবনের নিত্য দিনের টানাপোড়েনের ফাঁক ফোকর দিয়ে উঁকি দেয় মাঝে মাঝে…. ছুঁয়ে যায় মন। 

আমাদের ছোটবেলাটা বিলাস বহুল ছিল না মোটেই। ইচ্ছে করলেই গাড়ী নিয়ে এদিক ওদিক মেলা দেখতে চলে যাওয়া সম্ভব হতো না। খুব দামী খেলনাও পাইনি আমরা সেদিন। কিন্তু অনেক না পাওয়ার মধ্যেও যেটা ছিল….. সেই “রাজার বাড়ীর” মতোই আমাদের একটা মস্ত হাসিখুশীর পাহাড় … যে পাহাড়ে ছিল আমাদের  অবাধ বিচরণ, অনায়াস যাতায়াত আর ছোট ছোট আনন্দ নিয়ে ভরা। সেকথাই লিখে রাখবো একটু একটু করে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে।

আজ লিখতে বসেছি ঘাটাল ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদের গাজন ও গাজন মেলা সম্বন্ধে।  লিখতে বসে ভাবছি কোনদিক থেকে শুরু করবো!! এমনটি ভাবার কারণ আমাদের বসত বাড়ীর ভৌগোলিক অবস্থান। সীমানা ভাগ করলে আমরা ঘাটালের  আড়গোড়া গ্রামের বাসিন্দা। কিন্তু বাড়ির একটু দূর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি পার হলেই যে আলামগঞ্জ…. রথতলা…. বানেশ্বর শিব মন্দির!! আর সেই কবেকার ইস্কুল বেলা থেকে ঐ পথেই যে নিত্যদিনের যাওয়া আসা। নিজের গ্রামে খুব কাছাকাছি দুটো শিব মন্দির একটির প্রচলিত নাম বুড়া শিব মন্দির এবং অন্যটি বিশ্বেশ্বর শিব মন্দির। তারও খানিক দূরে আরও কয়েকটি শিব মন্দির আছে ঠিকই। তবে ওদিকটিতে যাওয়া আসা হয় অবরে সবরে। তাই পাশের গ্রাম আলামগঞ্জ…… ঘাটাল পৌরসভা পেরিয়ে রথতলার দিকে হাঁটা দিলে মিনিট পাঁচেক পরেই দেখা মেলে শ্রী শ্রী বানেশ্বর জিউ শিব মন্দিরের। ছোট বেলায় ঠাকুমার হাত ধরে এখানেই গাজন দেখতে আসা। হিন্দলা হতো এখানে। অবাক বিস্ময়ে শৈশব কৈশোরের কৌতূহলী চোখ অভিভূত হয়ে যেত এসব কান্ড দেখে। কথিত আছে বর্ধমানের রাজা রাজচন্দ্র চক্রবর্ত্তী কর্ত্তৃক ১২০৯ বঙ্গাব্দে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। বাবা বানেশ্বর পূজিত হতেন তৎকালীন সেবাইত আশালতা দেবী (চক্রবর্ত্তী) দ্বারা। আশালতা দেবীর কোন পুত্র সন্তান ছিল না। তাই তাঁর পরবর্তী সময়ে হুগলী জেলার রাজহাটি নিবাসী জামাতা শম্ভুনাথ চক্রবর্ত্তী এই মন্দিরে পৌরোহিত্যের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। শম্ভুনাথ চক্রবর্ত্তীর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর দুই পুত্র গোপাল চক্রবর্ত্তী ও নেপাল চক্রবর্ত্তী মন্দিরে পৌরহিত্যের দায়িত্ব পালন করছেন। এই মন্দিরে শিবরাত্রি, গাজন ইত্যাদি অনুষ্ঠান খুবই সাড়ম্বরে পালিত হয়। পাশাপাশি গ্রাম থেকে বহু মানুষ আসেন এখানে ব্রত পালন করতে, শিবের আরাধনা করতে। চৈত্র মাসের শেষে গাজন উপলক্ষে প্রায় তিন দিন ধরে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। 

   সেদিন বিকেলে সৎসঙ্গ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে ঢালাই রাস্তা বরাবর হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম আমাদের গ্রামের শ্রী শ্রী শীতলানন্দ জিউ শিব মন্দিরে। যদিও ছোটবেলা থেকে বুড়া শিবের মন্দির বলেই আমরা জানি। মন্দিরের উঠোনেই দেখা হয়ে গেল মন্দিরের সেবাইত অরুণা দেবীর সাথে। উনি যোগেন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্রবধূ। প্রায় চার পুরুষ ধরে এঁদের পরিবার এই মন্দিরের সেবাইতের কাজে যুক্ত আছেন। তাই এমন সুযোগ আর হাতছাড়া করতে মন চাইলো না। দেখতে দেখতে গ্রামের আরও কয়েকজন এসে জুটে গেল উঠোনে। সবে মিলে বিকেলের গল্পটা জমে উঠলো দারুণ। আরে হ্যাঁ সেই গল্পটাই তো বলবো।

     এই গ্রামের গৌর মাঝি ছিলেন প্রচুর জমির মালিক।  আজ যেখানে বুড়ো শিবের মন্দির, গৌর মাঝির এই তেরো কাঠা জমিতে তুঁত চাষ হতো। একদিন চাষীর কোদালে ঠেকলো এক লম্বা আকৃতির পাথর। চাষীরা সেটিকে তুলে ফেলে রেখে এলো ধানের খামারে। বাড়ির মেয়েরা দেখলো… বাঃ বেশ সুন্দর একটি চকচকে মসৃণ পাথর! তুলে নিয়ে গিয়ে মশলা বাটার কাজে লাগিয়ে দিল। কিন্তু এ তো যে সে পাথর নয়!! তাই তাঁর গা জ্বালা জ্বালা করতে লাগলো। সহ্য করতে না পেরে পাথরটি  নেমে গেল পাশের পুকুরে। রাজেন্দ্র বেরা  প্রাতঃক্রিয়া সারতে এসে ঘাটে নেমে দেখলেন একটি বাচ্চা ছেলে শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। তুলে নিয়ে গেলেন নিজের ঘরে। ক্রমে ক্রমে বুঝতে পারলেন এ ছেলে কোন সাধারণ ছেলে নয়। রাতে স্বপ্নে জানতে পারলেন ইনি বাবা তারকেশ্বরের ছোট ভাই শীতলানন্দ। রাজেন্দ্র বেরা তাঁর উপলব্ধির কথা জানালেন পাশাপাশি গ্রামের বাসিন্দাদের। আড়গোড়া, শুকচন্দ্রপুর, রঘুনাথচক, শ্যামপুর ও গম্ভীরনগর এই পাঁচটি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সভা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো এখানে বাবা শীতলানন্দের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে নারায়ণ চন্দ্র মন্ডল এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের পূজারী হিসেবে নিযুক্ত করা হয় যোগেন্দ্র চক্রবর্তীকে। ক্রমে ব্রতীদের আনাগোনায় এবং নারায়ণ চন্দ্র মন্ডলের তত্ত্বাবধান ও যোগেন্দ্র চক্রবর্তীর নিষ্ঠা সহকারে পূজার্চনায় মন্দিরটি ধীরে ধীরে একটি জনপ্রিয় মন্দিরের রূপ নিল। যোগেন্দ্র চক্রবর্তীর অবর্তমানে মন্দিরের পূজারী হিসেবে নিযুক্ত হন তাঁর পুত্র ফকির চন্দ্র চক্রবর্তী এবং তাঁর পরবর্তী সময়ে ফকির চন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র দীপক চন্দ্র চক্রবর্তী। নিত্য পূজার্চনা তো ছিলই…. এছাড়াও মকর সংক্রান্তি, গাজন, চড়ক, শিবরাত্রির মতো দিনগুলিতে মন্দির প্রাঙ্গণ উৎসবের আমেজ বিরাজ করে এগিয়ে চললো। কিন্তু এতদিনের পুরানো মন্দিরের চারদিক দিয়ে গাছ উঠে দেওয়ালে ফাটল ধরলো….. ছাদ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো…. একসময় মন্দিরটির বেহাল দশা!! ১৪০৫ বঙ্গাব্দে এই গ্রামের ভূমিপুত্র প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব একাধারে সাহিত্যিক ও অধ্যাপক গুণময় মান্না মহাশয় এবং ওনার সহধর্মিনী অধ্যাপিকা উমা দেবী এই মন্দিরটি নবনির্মাণ করে সংস্কার সাধন করেন। বর্তমানে দীপক চন্দ্র চক্রবর্তীর স্ত্রী অরুণা দেবী এবং তাঁর দুই পুত্র রাজীব কুমার চক্রবর্তী ও গৌতম চক্রবর্তী এই মন্দিরে সেবাইতের কাজ করে চলেছেন। মকর সংক্রান্তি ও শিবরাত্রি পালন তো আছেই। এছাড়াও চৈত্রের শেষে প্রায় এক সপ্তাহ জুড়ে চড়ক, গাজন, ধুনোপোড়া, হিঁদলা কে কেন্দ্র করে মেলা বসে। 

       এছাড়াও আগেই যে পাঁচ গ্রামের কথা বলেছি তার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র শিব মন্দির। এই তো একটু দূরে মাঝি পুকুরের পাড়ে রয়েছে বাবা বিশ্বেশ্বর শিব মন্দির। আজ এই পর্যন্তই থাক। বাকি মন্দির গুলির সমন্ধে না হয় পরবর্তী পর্বে বলা যাবে।


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

প্রচ্ছদ - বিশ্বজিৎ ভৌমিক

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৫

  গাজনের গর্জনে ভুবনেশ্বর : এক প্রাচীন উৎসবের আখ্যান বিশ্বজিৎ ভৌমিক  বাংলার লোকসংস্কৃতির মানচিত্রে রাঢ় অঞ্চল এক আদিম ও অকৃত্রিম জনপদ, যেখানে...