Wednesday, 15 April 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৯



ঘাটাল মহকুমায় গাজনের সেসময় এবং এসময়

আশিস করণ

১.

ভারতের যে সকল প্রাগৈতিহাসিক দেবতা পরবর্তীকালে হিন্দু সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠা স্থাপন করতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে শিব সর্বপ্রধান এবং সবার আগে পূজিত। এটা থেকে স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যায় যে,ভূভারতে প্রাকবৈদিক সমাজেও শৈব ধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল।এমনকি মহেঞ্জোদারোর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকেও এই বিষয়টির একটা প্রামাণ্য সমর্থন পাওয়া যায়।

আদতে ব্রাহ্মণ্যধর্ম বঙ্গদেশ থেকে বহুদূরবর্তী অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছিল।কালের স্রোতে তা বঙ্গদেশে বিস্তৃত হওয়ার আগেই তাকে প্রাগার্য শৈবধর্মের সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল। সুতরাং বঙ্গদেশে প্রথম থেকেই যে শৈবধর্মের প্রভাব শুরু হয়েছিল তার সাথে আর্যেতর সমাজের উপাদান আগে থেকেই মিশে ছিল। শুধু তাই না অনার্য দেবতা হিসেবে সেই ইতিপূর্বে আর্যসমাজে একটি বিশিষ্ট স্থানলাভ করে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। 

বৈদিক রুদ্র দেবতার মধ্যেই অনার্য উপকরণ স্পষ্টভাবে অনুকরণ করা যায়।অতএব দেখা যায়, বৈদিক দেবসমাজের মধ্যেই এই অনার্য দেবতা নিজ জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পরবর্তী পৌরাণিক সাহিত্যে রুদ্র দেবতার এই বৈদিক পরিকল্পনার সাথে ধ্যানী বুদ্ধের অনুকরণে এক শান্ত সমাহিত শিবমূর্তি পরিকল্পনা করা হয়েছিল।তবে মহেঞ্জোদারোর আবিষ্কৃত সিলমোহরগুলির মধ্যে শিবের মতো যোগাসন রুপী এক দেবমূর্তির পরিচয় থেকে মনে করা হয় যে যোগীন্দ্র রুপী শিবের ভাবনা প্রাগার্য সমাজেই ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হলো। বলা চলে কালক্রমে সেটাও পৌরাণিক কল্পনার মধ্যে এসে মিলিত হলো।মূলত পৌরাণিক সাহিত্যের মাধ্যমে আর্য ধর্ম বঙ্গদেশে প্রচারিত ও প্রসারিত হলো বলে শিবের চরিত্রগত ভিন্নরুপী সত্তা বঙ্গদেশে প্রচার পেল বলে গবেষকদের মত।কোথাও মঙ্গলময় দেবতা,আবার কোথাও ভয়ানক রুদ্ররূপী বিনাশকারী।বলা চলে এই দুই প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপরেই বাংলার লৌকিক শৈবধর্মের ভিত্তি রচিত হলো।

 বঙ্গসমাজে বাইরের থেকে আসা শৈবধর্ম সমাজের উচ্চস্তরেই সর্বপ্রথম প্রচারিত হয়েছিল এবং ক্রমে তা সেখান থেকেই নিম্নতর সমাজে প্রসারলাভ করেছিল।অতঃপর নিম্নতর সমাজে শৈব ধর্মের পুরাণ আদর্শ বিসর্জন হলো বাধ্যতামবশত।

২.

বঙ্গদেশে আর্যসভ্যতা বিস্তৃতির ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে,উত্তর বিহার বা মগধের সংলগ্ন অঞ্চল উত্তরবঙ্গে প্রথম আর্য সভ্যতা বিস্তৃতি লাভ করল এবং ধীরে ধীরে উত্তরবঙ্গে উচ্চতর সমাজ থেকে তা তখনকার নিম্নতর সমাজের মধ্যেও প্রচারিত হলো। শৈবধর্ম বঙ্গদেশে বিস্তৃতি লাভের আগে উত্তরবঙ্গে সাধারণ জনসমাজে একটি স্থানীয় রূপ লাভ করল।এই পরিকল্পনা অনুসারে শিব ছিলেন ঘরের কৃষক। বলাবাহুল্য উত্তরবঙ্গের সাধারণ কৃষক সমাজের মধ্যে শিবের এই অভিনব পরিকল্পনা সম্ভব হয়। কিন্তু কৃষক হলেও প্রত্যক্ষ কৃষিকাজে তাঁর ছিল অসীম অনাশক্তি।কৃষিকাজে উদাসীনতার জন্য নিত্য সাংসারিক অভাব অনটনের যন্ত্রণা ভোগ করেন।ফলে কৃষিকাজে মনোযোগী না হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করলেন।এভাবে বাংলার কৃষকসমাজ একদিকে যেমন কৃষিকাজকে দেববৃত্তি বলে নির্দেশ করে গৌরব দান করেন,আবার তেমনই ভিক্ষা করাকেও দেববৃত্তি বলে উল্লেখ করে নিষ্ক্রিয় জীবনের মহিমা কীর্তন করেন।

উল্লেখযোগ্য বঙ্গদেশে আর্যসভ্যতা বিস্তারের আগে উত্তরবঙ্গে *'কোচ'* জাতির বসবাস ছিল।যাদের প্রধান বৃত্তি ছিল কৃষিকাজ।প্রসঙ্গত যে সকল জাতির মধ্যে কৃষিকাজ প্রচলিত,তাঁদের কৃষিকাজের জন্য এক দেবতার পরিকল্পনা হয়ে থাকে।গবেষকদের মত, এখনও উত্তরবঙ্গে বিশেষ করে দিনাজপুরে কৃষকদের মধ্যে *'মহারাজা'* বলে এক দেবতার পূজা হয়। অগ্রহায়ণ মাসে স্থানীয় কৃষকগণ নবান্নের সময় চাঁদা তুলে বারোয়ারি এই দেবতার পূজা করেন। তাঁদের বিশ্বাস, মহারাজা দেবতার আশীর্বাদে কৃষিতে সুফল হয়। যিনি ব্যাপকভাবে শিব বলে পরিচিত।একারণে প্রাচীনবাংলার কবিগণ শিবকেই কৃষিকাজে সহায়ক বলে বর্ণনা করেন।উত্তরবঙ্গে মহারাজা ঠাকুর এবং পশ্চিমবঙ্গের শিব ঠাকুরের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নেই কোনও।সুতরাং কোচ কৃষক সমাজেই বাংলার লৌকিক শৈবধর্মের  প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর হয়েছিল বলে গবেষকদের ধারণা। যদিও কৃষকের কল্যাণকর দেবতা হিসেবে উত্তরবঙ্গে কোচ সমাজে যে শিবের পরিচয় পাওয়া যায়, বঙ্গদেশের পশ্চিম সীমান্তে অর্থাৎ রাঢ় অঞ্চলে শিবের চরিত্রে ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়।অবশ্য এর মূল কারণ দুই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে মৌলিক জাতিগত পার্থক্য।শিব চরিত্রের এই অভিনব পরিচয় এবং পার্থক্য বঙ্গদেশের বাইরে অন্য কোনও অঞ্চলে নজরে আসে না।যাইহোক এ তো আলোচিত হলো বঙ্গদেশের শিবপ্রসঙ্গ।

৩.

গাজন নিয়ে আলোচনার আগে বঙ্গদেশের শিবপ্রসঙ্গ এতক্ষণ বললাম,কারণ শিবকে কেন্দ্র করে গাজন বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অঙ্গ।এবার আসা যাক,'গাজন' কথায়।বঙ্গদেশের 'গাজন' উৎসবের কেন্দ্র কিন্ত শিব।যিনি মূলত অনার্যদের দেবতা এবং তথাকথিত শস্য দেবতা।সুতরাং একটা প্রাগৈতিহাসিক লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান কালক্রমে এদেশের কোনও কোনও অঞ্চলে শৈবধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছিল যাকে 'গাজন' বলা চলে এবং এটি অনার্য উৎসব অবশ্যই।জনশ্রুতি, বাংলায় 'গাজন' শব্দটির উদ্ভব সংস্কৃত 'গর্জন' শব্দ থেকে কমবেশি সবাই জানেন এবং এটাও উল্লেখ,শিবের অনুচর  গাজনের মূল উপাসক ভক্তা বা সন্ন্যাসীরা বাদ্যযন্ত্র সহযোগে যখন উৎসবে যোগ দেন তখনই গর্জন হয়।আর তাই আমার আপনার 'গাজন'।গর্জন (সংস্কৃত)>গজ্জন(প্রাকৃত)>গাজন (বাংলা)।এই শব্দটির উদ্ভব হিসেবে,

'গাজন'-'গা' বা 'গাঁ' হল গ্রাম এবং জন বলতে জনসাধারণ।বলা চলে,গ্রামের জনগণের উৎসব। অন্যদিকে কৃষিকাজ ছাড়াও শিবের আরেকটি গুণ ছিল-ভাঙ বা গাঁজার প্রতি আসক্তি।এই গাঁজা বা গাঁজন হলো অনুজীবের সাহায্যে জৈব যৌগের একপ্রকার রাসায়নিক পরিবর্তন।যা নেশাজাতীয় খাদ্য বা পানীয় তৈরিতে ব্যবহার হয়।এখান থেকেও গাজন শব্দটি উদ্ভব হতে পারে।কিন্ত উৎসব হিসেবে গাজন শিবের ভক্তিভিত্তিক পূজা।তবে, এপ্রসঙ্গে জানা দরকার, গাজন শুধু শিবের হয় এটি অধিকাংশ বঙ্গবাসীর বিশ্বাস।কিন্তু গাজন অনেক ধর্মের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়।যেমন শৈবধর্ম প্রভাবিত অঞ্চলে 'শিবের গাজন'যেমন হয়, আবার ধর্মঠাকুর প্রভাবিত অঞ্চলে 'ধর্মের গাজন' আবার বৌদ্ধ ধর্ম প্রভাবিত অঞ্চলে যে গাজন দেখতে পাওয়া যায় তাকে অনেকে 'আদ্যের গাজন' বলেন।গাজন উৎসবের মূল কেন্দ্র শিবের সাথে হরকালির বিবাহ হয় এইদিন এবং সন্ন্যাসীরা যারা ব্রত পালন করেন,তাঁরা বিয়ের বরযাত্রী হিসেবে যোগ দেন।কোথাও এটি 'নীলের গাজন' নামে পরিচিত।আবার যেখানে ধর্মগাজন,সেখানে ধর্ম ঠাকুরের সাথে দেবী মুক্তির বিয়ের জনশ্রুতি পাওয়া যায়।

৪.

আলোচনার প্রসঙ্গ যেহেতু ঘাটাল মহকুমার গাজনের সেসময় এবং বর্তমান সময়।সেখানে বলা চলে,সময় যত বদলেছে পরম্পরাগত এই লোকউৎসবের আদল পাল্টেছে।শহুরে বনেদি পরিবারগুলিতে এই লোকউৎসবে ভাটা পড়লেও গ্রামের মানুষের কাছে গাজন উৎসবের রেশ দিনে দিনে বর্ধিত হচ্ছে।বিশেষ করে উৎসবমুখর ঘাটালে গাজন কয়েক শত বছরের ইতিহাস বহন করে চলেছে একাধিক শিবালয়।ঘাটাল মহকুমার উল্লেখযোগ্য গাজন উৎসব শিবালয়গুলির মধ্যে বেশিরভাগই দাসপুর ঘিরে।যেমন-সোনাখালির শ্রী পঞ্চাননশিব,গোপালনগরের ঝাগড়েশ্বর মন্দির,চককিশোরের গগনেশ্বর মন্দির, চাঁইপাট হাটতলার শিবমন্দির, খেপুতের শিব মন্দির থেকে খেপুতের আমতলা শিবমন্দিরের রাখাল গাজন,দাসপুরের ভুবনেশ্বর জিউ, আবার ঘাটালের শ্রী বানেশ্বর জিউ শিবমন্দির বা আড়গোড়ার শীতলানন্দের মন্দির থেকে চন্দ্রকোণার মল্লেশ্বরপুর উজাননাথ শিবমন্দিরের মতো বহু প্রাচীন শিবমন্দির গাজনের প্রাচীন ইতিহাসের কথা বলে।কিন্ত ঘাটালে এই উৎসব একাল এবং সেকালের দিকে গভীর পর্যবেক্ষণ করলে গাজনের বেশ কিছু রীতির সংযোজন বিয়োজন ঘটেছে বলা চলে।অতঃপর আমরা একটু সেই বিষয়গুলি বৈশিষ্ট্যের সাথে তুলে ধরবো।

নিষ্ঠা ও কঠোর ভক্তি

গাজন উৎসবের কোথাও একমাস বা কোথাও পনেরো দিন  আগে থেকে সন্ন্যাসীরা বাণ বা সন্ন্যাস গ্রহণ করে কঠোর নিয়ম পালন করতেন।নিয়ম হিসেবে একবেলা হবিষ্যান্ন বা ব্রহ্মচর্য পালন করে কৃচ্ছ্রসাধন করতেন।তবে সময়ের সাথে কঠোর নিষ্ঠা,রীতি সন্ন্যাসীদের সেই সংখ্যা পরিবর্তন করেছে বলে অনুমান অনেকের।সোনাখালি পঞ্চাননশিবের মন্দির প্রায় ৩৫০ বছরের পুরানো।এই শিবালয়ের গাজন  চৈত্র মাসের।প্রসঙ্গত, এখানে গাজন উপলক্ষ্যে ১৫ ভোগের মাড়ো হয়।তারকেশ্বরের পর যা বৃহত্তর ভোগের মাড়ো।কিন্ত আধুনিকতার চাকচিক্য প্রথাগত নিষ্ঠা,আচার থেকে অনেকখানি সরিয়ে আনছে মানুষজনকে।প্রসিদ্ধ এই শিবালয়ে গাজনকে কেন্দ্র করে নানা জনশ্রুতি শোনা যায়।উল্লেখ্য গাজনের জন্য একসময় যেখানে পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে সন্ন্যাসী বা ভক্তা নিষ্ঠার সাথে নিয়ম পালন করতেন,সময়ের সাথে সাথে ভক্তাদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে এখানে ভক্তার  সংখ্যা এখন তিরিশে নেমে এসেছে বলে জানান মন্দিরের সেবাইত অবনী শঙ্কর চক্রবর্তী,অরূপ শঙ্কর চক্রবর্তীরা।এ প্রসঙ্গে অবনী শঙ্কর চক্রবর্তীর মত,'পনেরো দিন ধরে এই কৃচ্ছ্রসাধন আজকাল আর সবাই পেরে ওঠেন না।ফলে সন্ন্যাসীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে।' আবার কোথাও সময়ের সাথে সাথে মহিলা ভক্তার দেখা মেলে বর্তমানে।দাসপুরের ভুবনেশ্বর জিউ শিবমন্দিরের গাজনের সন্ন্যাসীদের মধ্যে অনেক মহিলা সন্ন্যাসীর দেখা মেলে।


আচারের পরিবর্তন

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি গাজন হলো শিবের বিয়ে কেন্দ্র করে উৎসব।যাকে ঘিরে মানুষের উন্মাদনা তুঙ্গে।কিন্ত এই গাজনের আরেকটি মূল আকর্ষণ হল চড়ক।জিভ ফোঁড়,পিঠ ফোঁড়,কাঁটাঝাপ ইত্যাদির মতো নানা খেলা একসময়ে গাজনের জৌলুস বাড়ালেও,বর্তমানে ঘাটালের বেশিরভাগই চড়কে জিভফোঁড়,জিভে কাঁটা ফোঁড়, হিঁদলা, ধুনুচি নাচ হলেও কাঁটাঝাপ, পিঠফোঁড়ের মতো দুঃসাহসিক খেলাগুলি বর্তমানে আর নেই। এর পেছনে অবশ্যই বেশ কিছু দুর্ঘটনা মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মন্দির কর্তৃপক্ষ। দাসপুরের ভুবনেশ্বর শিব মন্দির, গোবিন্দনগরের গাড়া শিবমন্দির, সোনাখালির পঞ্চাননশিব বা চাঁইপাট হাটতলার শিবমন্দিরে চড়কে এমন অনেক চড়কের আচার পরিবর্তন হয়েছে।এমনকি সোনাখালির গাজন উৎসবের একসময় প্রসিদ্ধ ছিল সংযাত্রার অনুষ্ঠান। এখন শুধুমাত্র চড়কের দিনেই এই সংযাত্রার দেখা মেলে।আবার এই সঙ আগে ছিল দেবদেবী,ভূত প্রেত সাজার ধুম।বর্তমানে তা বিজ্ঞানসম্মত হয়ে পড়েছে যা আধুনিকতার বিষয় চোখে পড়ে।

লোকসংস্কৃতির অভাব

গাজন উৎসব যেখানে অনার্যদের অনুষ্ঠান, সেখানে কৃষি কে কেন্দ্র করে এই উৎসবে লোকসংস্কৃতির যে গন্ধ পাওয়া যেত একসময়, বর্তমানে সেই লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যের অভাববোধ হয়। বেশিরভাগ গাজনের মেলাতে কুমারের তৈরি মাটির বাসন বা কামারের তৈরি লোহার সরঞ্জামের সাথে মাটির পুতুল বা বাঁশের তৈরি জিনিসের দেখা মিলত একসময়।বর্তমানে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র অর্থাৎ আধুনিকতা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে প্রাচীন লোক-সভ্যতাকে। দাসপুরের গোপালনগরের ঝাগড়েশ্বর মন্দির বা ভুবনেশ্বরের শিবমন্দিরের লোক উৎসবের ঐতিহ্য কালের স্রোতে হারাতে বসেছে।গাজন এবং তার মেলা উপলক্ষ্যে মানুষের উন্মাদনা বাড়লেও লোক-ধারা আজকাল আর নেই বললেই চলে।

 ধর্মীয় আবেগ

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গাজন যেহেতু অনার্যদের উৎসব, তাই ব্রাহ্মণ্য,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য, শূদ্র সবার এই উৎসবে থাকার অধিকার থাকলেও ঘাটাল মহকুমার অনেক গাজনেই ধর্মীয় আবেগ কাজ করে। যা বৈচিত্র্যময়। দাসপুরের ভুবনেশ্বর শিব মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ হিন্দুদের সাথে মুসলিমরাও এখানকার চড়কের মেলাতে যোগ দেন।ফলে তৈরি হয়েছে সম্প্রীতির মেলবন্ধন। অন্যদিকে ঘাটালের রামজীবনপুর পার্বতীনাথ মন্দির প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন মন্দির। কিন্ত এই মন্দিরের নিয়ম ছিল বৈচিত্র্যময়। অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না এই মন্দিরে।এই রীতি নিয়ে বিতর্কও কম ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে ২০০৯ সাল থেকে স্থানীয় মন্দির কমিটি গাজন উৎসবে  সবার জন্যই শিবের মাথায় জল ঢালা থেকে শুরু করে অন্ত্যজদের মন্দিরে প্রবেশ করার অনুমতি দিয়েছেন।এর ফলে একদিকে স্থানীয় অন্ত্যজদের যেমন আনন্দের ছাপ দেখা মেলে অন্যদিকে তেমনই স্থানীয় মন্দির কমিটির মধ্যেও তৃপ্তির যে স্বাদ,তার ছোঁয়া মেলে।

বিনোদনধর্মী এবং বাণিজ্যিক রূপ

কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের এই চড়ক বা গাজন উৎসব ধীরে ধীরে প্রদর্শনী বা মেলায় রূপ নিয়েছে। এমনকি এই চড়ক মেলা এখন স্থানীয় অর্থনীতির একটা বড় অংশ হয়ে উঠেছে। যেখানে হরেক রকমের রকমারি দোকান,সার্কাস বা নাগরদোলার ভিড় জমে।তার পাশাপাশি  আড়ম্বর সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন রক্ষণশীল মানুষের কাছে। এখনকার গাজনে আলোকসজ্জা,মাইক এবং ডিজে সাউন্ড সিস্টেমের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে লোকসংস্কৃতির মাত্রা ধীরে ধীরে হারাতে বসেছে।তার সাথে বেশিরভাগ মেলার শান্ত এবং গ্রামীণ রূপ ক্ষয় পেয়েছে। সাথে বলা চলে পুরাতনী খাদ্যাভ্যাস ছেড়ে গ্রামের মানুষ মেলাতে ফাস্ট ফুড খাবারের দিকে ঝুঁকছেন।একসাথে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে ড্যান্স ট্রুপ, অর্কেষ্ট্রার প্রতি ঝোঁক কোথাও এককালীন পুতুলনাচ বা যাত্রার মতো বিষয়গুলিকে থামিয়ে দিচ্ছে।

নতুন ধারায় গাজন তথা রাখাল গাজন

দাসপুরের একাধিক ঐতিহ্যের গাজনের পাশাপাশি 

শতাধিক বছরের বেশি পুরোনো এই গাজন খেপুতের রাখাল গাজন বেশ উল্লেখযোগ্য গাজন।স্থানীয়দের মতে,  প্রধানত খেপুত দক্ষিণবাড় নিবাসী -

প্রয়াত নিশি জানা

প্রয়াত রতন জানা 

প্রয়াত সুধন পোড়ে 

 তাঁদের ছোটবেলায় একটি জায়গায় পড়ে থাকা একটা শিবলিঙ্গ নিয়ে এসে তালপাতার ঘর করে প্রতিস্থাপন করে গাজন শুরু করেছিলিন। নিজেরা বাচ্চা বয়স থাকার কারণে বালক সন্ন্যাসীদের  নিয়েই এটার শুরু শতাধিক বছর আগে।এরপর স্থানীয়দের দেওয়া মন্দিরের নাম হয় আমতলা শিব মন্দির এবং রাখাল গাজন।সেই থেকে এখনও চলছে এই গাজন। প্রতি বছর বেশ ঘটা করে পালিত হয় এই গাজন উৎসব। প্রতি বছর প্রায় ৫০ এরও বেশি বাচ্চা এখানে সন্ন্যাসী হয়। ১২-১৩ বৎসর বয়স অবধি পর্যন্ত যে কেউ এখানে সন্ন্যাসী হতে পারে। পরবর্তী তে খেপুতেরই আরেক বাসিন্দা অষ্টপদ বেরা'র উদ্যোগে এই মন্দির এর পুনর্নির্মাণ হয়।যা অনেকেরই অজানা বিষয়।

৫.

পরিশেষে বলা যায়,কৃষিকেন্দ্রিক ঘাটালের আর্থসামাজিক ছবি দেখতে গেলে বিভিন্ন গ্রাম্য উৎসবের অবদানসমূহের সাথে গাজন উৎসবের অবদান কম না। তবে,সময়ের স্রোতে এবং মানুষের রুচির পরিবর্তনে  ঘাটালের গাজন মেলাগুলির বিকিকিনি থেকে শুরু করে নিজ চরিত্র পালটালেও, ভাবের পরিবর্তন হয়নি একথা বলা চলে। আধুনিকতার পাশাপাশি ঐতিহ্যকে সাথে নিয়ে, নতুন পুরাতনীর মেলবন্ধনে আজও ঘাটালের গাজন মেলাগুলি লোকায়ত ইতিহাসের কথা বলে। বহু যুগ ধরে লোকউৎসবের যে পরম্পরা চলে আসছে ঘাটালের মানুষজন তাকেই লালন পালন করে করে চলেছেন। যে লোকউৎসব লোকজীবনের সামগ্রিক রূপ প্রকাশ করে।একটা জনজাতির সর্বজনীন রূপকে ফুটিয়ে তোলে।

  


 ঋণ -

১. অবনী শঙ্কর চক্রবর্তী; সোনাখালি।

২. অরূপ শঙ্কর চক্রবর্তী; সোনাখালি।

৩. উমাশংকর নিয়োগী; চাঁদপুর।

৪. তাপস পাল; খেপুত।

৫. সৌমেন চট্টোপাধ্যায়; খেপুত।

৬. নিমাই রূইদাস; রামজীবনপুর। 

৭. অশোক গোস্বামী; দাসপুর।

তথ্যসূত্র -

১. বাংলার লৌকিক দেবতা: গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু,দে'জ পাবলিশিং।

২. গাজন : মনোজিত অধিকারী,দে'জ পাবলিশিং।

৩. বাংলা মঙ্গলকাব্য:দীপঙ্কর মল্লিক,দিয়া পাবলিকেশন।



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪






Friday, 10 April 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৮

 


চন্দ্রকোণার গাজন উৎসব 

বিলাস ঘোষ


"আমরা দুটি ভাই শিবের গাজন গাই

ঠাকুমা গেছেন গয়া কাশি ডুগডুগি বাজাই।৷"

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। বারো মাসের বিভিন্ন পার্বণের মাধ্যে গাজন উৎসব অন্যতম৷ গাজন শব্দটি শুনলে শিবের গাজনের কথা মনে ভাসে৷ যদিও গাজন বাঙালি হিন্দুদের একটি লোকউৎসব। পশ্চিমবঙ্গে মা মনসা, ধর্মঠাকুর, শিবঠাকুরের পূজাকেন্দ্রিক উৎসবকে গাজন হিসেবে পালন করা হয়৷ এখানে গাজন বলতে মূলত দেবাদিদেব মহাদেব বা শিবঠাকুরের গাজন উৎসবকে প্রাধান্য দেওয়া হয়৷ চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে চৈত্র সংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখ চড়ক পূজার মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। অনেকের মতে গাজন শব্দটি গর্জন শব্দ থেকে এসেছে৷ অনেকে আবার মনে করেন গাজন অর্থাৎ গ্রামীণ জনসাধারণের উৎসব৷ পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রতিটি গ্রামের শিব মন্দিরকে কেন্দ্র করে গাজন উৎসব পালিত হয়৷ 


পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঘাটাল মহকুমার চন্দ্রকোণা জনপদটি হিন্দু সংস্কৃতির অন্যতম স্থান হিসাবে ধরা হয়৷ কথিত আছে, চন্দ্রকোণার বাহান্ন বাজার ও তিপান্ন গলির কথা৷ আজও সেই বাজার ও গলিগুলি বিদ্যমান। বর্তমান সময়ের সাথে তাদের ভোল পাল্টেছে মাত্র৷ রাজা চন্দ্রকেতু চন্দ্রকোণা প্রতিষ্ঠা করেন বলে মনে করা হয়। বিষ্ণুপুরের মত চন্দ্রকোণাতেও প্রচুর মন্দির ছিল৷ বর্তমান সময়েও তার নিদর্শন পাওয়া যায়৷ চন্দ্রকোণার প্রাচীন শিবমন্দির গুলির মধ্যে মল্লেশ্বরপুরে উজাননাথ শিবমন্দির অন্যতম। চৈত্র মাসে প্রায় সব শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করে গাজন উৎসব পালিত হয়৷ কোথাও কোথাও বৈশাখ মাসের শেষে আপাল গাজন বা অকাল গাজন পালন করা হয়। যেমন - পুরুষোত্তমপুরের শান্তিনাথ শিবমন্দির৷ 

চন্দ্রকোণার বেশিরভাগ শিবমন্দির গুলিতে গাজন উৎসবের আচার প্রায় এক। যেমন - কাঁটা গড়ানো, হিন্দোল, গড়ান সেবা, আগুন সন্ন্যাস, দুধ সন্ন্যাস, ঝাঁপ ভাঙা, ধূণুচি নাচ ইত্যাদি। কোথাও কোথাও মাথাচালা, বেতচালা, ডানা নাচের মত অদ্ভূত ধরণের রীতির প্রচলন আছে৷ কোন কোন শিবমন্দিরে চড়ক পূজা ও জিভ ফোঁড় সহ বিভিন্ন ধরনের ফোঁড় প্রথা লক্ষ্য করা যায়৷ তারমধ্যে মেঠানি স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র গাজন উৎসবে ফোঁড় প্রথা, শালেভর, জোড়া গাছ হিন্দোল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। চন্দ্রকোণার রাধাবল্লভপুরের ফোঁড় প্রথা বেশ জনপ্রিয়৷ সাধারণত যেসব শিবমন্দিরে চড়ক পূজার প্রচলন আছে তা পয়লা বৈশাখ চড়ক পূজা সেরে মহাদেবের ভক্তরা আঁশপান্না অনুষ্ঠান বা সাধারণ জীবনে ফিরে আসার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন৷ তবে হীরাধরপুরে উজাননাথের ফোঁড় প্রথা একটু অন্যরকম। বেশিরভাগ জায়গাতে পয়লা বৈশাখ চড়ক পূজা হয়, কিন্তু এখানে পয়লা বৈশাখ ফোঁড় প্রথার প্রচলন আছে। আবার বেশকিছু জায়গায় চৈত্র সংক্রান্তি দিনই ফোঁড় প্রথা ও চড়ক পূজা হতে দেখা যায়৷ যেমন - চন্দ্রকোণা ২নং ব্লকের শীলাবতীর তীরে অবস্থিত ভুবনেশ্বর শিবমন্দির।

চন্দ্রকোণার বেশকিছু স্থানে গাজন উৎসবকে ঘিরে মেলা বসে৷ উৎসব মুখরিত পরিবেশে শিবঠাকুরের সন্ন্যাসীরা বিভিন্ন ধর্মীয় আচার আচরণে ব্যস্ত থাকেন, অন্যদিকে দোকানদানি বিকিকিনি জনসমাগম৷ এমন একটি গাজন উৎসব হল চন্দ্রকোণার মেঠানি গ্রামে অবস্থিত স্বয়ম্ভূনাথের গাজন মেলা। স্বয়ম্ভূনাথ মন্দিরে এক সহস্রাধিক ভক্ত সন্ন্যাসী থাকেন৷ স্বয়ম্ভূনাথকে ঘিরে একটি লোককাহিনী প্রচলিত আছে৷ অনেক অনেকদিন আগে আজ যেখানে স্বয়ম্ভূনাথ মন্দির জায়গাটিতে অগভীর জঙ্গল ছিল। মেঠানি গ্রামের মণ্ডলমশাই রাখাল বালকদের (বাগাল) ঐ জঙ্গলে গরু চরাতে পাঠাতেন৷ মণ্ডলমশাই প্রায় লক্ষ করতেন, পাল থেকে ফিরে এসে গাভিগুলি আর দুগ্ধ দেয় না৷ তিনি রাখালদের দোষারোপ করতেন৷ রাখালরা পরেরদিন আবার গরুর পাল নিয়ে জঙ্গলে চলে যেত। তারা সেখানে পাথরের উপর তালের আঁঠি কেটে খেত। একদিন তারা দেখল যে পাথরটির উপর তালের আঁঠি কাটত সেটির উপর গাভি দুগ্ধ দান করছে৷ এই ঘটনাটি মণ্ডলমশাইকে জানায়৷ তিনি পরেরদিন গাছের আঁড়াল থেকে সেই অলৌকিক স্বর্গীয় দৃশ্যটি চাক্ষুস করেন এবং অবাক হন৷ অন্যদিকে মেঠানি গ্রামের পাশের নদী (বর্তমানে তার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না) দিয়ে কোন এক সদাগর বানিজ্য করতে যাচ্ছিলেন। তিনি ভয়ানক তুফানের কবলে পড়েন৷ তার সপ্ততরী নদীর জলে নিমজ্জিত হয়৷ তিনি বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে ভগবান শংকরকে স্মরণ করেন। গভীর রাতে নিদ্রামগ্ন সদাগরকে স্বয়ম্ভূনাথ স্বপ্নে দেখা দেন৷ তিনি পরেরদিন সকালে মণ্ডলমশাইকে সব বলেন এবং বনের সেই পাথরটি অন্যত্র স্থাপনের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন৷ সেদিন রাতে স্বয়ম্ভূনাথ পুনরায় সদাগরের স্বপ্নে আসেন এবং তিনি জানান পাথরটি স্থানান্তর করা যাবে না, সেটি কাশির বিশ্বেশ্বর শিবের সঙ্গে যুক্ত আছে। স্বয়ম্ভূনাথের স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেখানেই স্থাপিত হয় মন্দির এবং দীর্ঘ্যগ্রামের হরিপদ চট্টোপাধ্যায়কে পূজারী হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। সেই থেকে মেঠানি গ্রামে স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র নিত্য পূজা ও চৈত্রমাসে গাজন উৎসব পালিত হয়৷ (উপরোক্ত লোককাহিনী আজও স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র নাটমন্দিরে রংতুলিতে ছবির মাধ্যমে আঁকা আছে)। নীল পূজার দিন অগনিত ভক্ত স্বয়ম্ভূনাথকে জল অর্পণ করতে আসেন৷ গাজন ক'দিন নহবতখানায় সানাই ও ঢোলের মঙ্গলসুর ধ্বনিত হয়। চৈত্র সংক্রান্তির বিকেলে কাঁটা ও বান সহযোগে জিভফোঁড়, সরু নাইলনের দড়ি দিয়ে দুই বাহুতে ফোঁড়, সন্ন্যাসীদের দ্বারা শালেভর, গাছ হিন্দোল ইত্যাদি দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে মুখরিত হয় রাস্তার দু'ধার৷ মেঠানি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে চাঁদা নামক গ্রামে স্বয়ম্ভূনাথের গাজন পুকুর থেকে ফোঁড়গুলি শুরু হয়, শেষ হয় বাবার মন্দিরে এসে৷ শুধু ফোঁড় নয় অনেক সন্ন্যাসী প্রণামসেবা দিয়ে এই দূরত্ব অতিক্রম করেন৷ অনেক মহিলা ভক্ত স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র সন্ন্যাসী ব্রত পালন করেন। বর্তমানে অবশ্য চন্দ্রকোণার অনেক শিবমন্দিরে মহিলারাও সন্ন্যাসী থাকেন৷ ঐদিন সবশেষে আসে রাতগাজন৷ পাঠসস্ন্যাসী ও দেউল সন্ন্যাসী সহ আরও কয়েকজন সন্ন্যাসী দুই বাহুতে ধারালো সূঁচ দিয়ে ফোঁড় করেন, যা কালকা ফোঁড় নামে পরিচিত৷ সাথে থাকে মশালের আলো৷ কালকা ফোঁড় স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র মন্দিরে আসার আগে কালীমাতার মন্দিরে ভাঙ্গর ভোলার গান ও তরজা গান গাওয়া হয়৷ পরেরদিন বিকালে অনুষ্ঠিত হয় চড়কপূজা৷ সারাবছর চড়ককাঠ ডোবানো থাকে স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র শিবপুকুরে৷ সন্ন্যাসীরা সেই কাঠ কাঁধে তুলে ভোলেবাবার নাম করতে করতে নিয়ে যায় মেঠানি গ্রামের পূর্বপ্রান্তে চড়ক মাঠে৷ সেখানেও প্রচুর মানুষের সমাগম হয়৷ চড়ক সুসম্পন্ন হলে সন্ন্যাসীরা পুনরায় সেই চড়ককাঠটি নিয়ে এসে শিবপুকুরে ডুবিয়ে রাখেন। সবশেষে সন্ন্যাসীরা পুরহিতের অনুমতিতে উত্তরি খুলে আঁশপান্না অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন এবং সাধারণ জীবনে ফিরে আসেন।

চন্দ্রকোণার রঘুনাথপুরে পার্বতীনাথ শিবের রাতগাজন বেশ উল্লেখযোগ্য। রাতগাজনে সন্ন্যাসীরা বাদ্য বাজনা সহ শিবকে (প্রতীকী) নিয়ে গোটা গ্রাম প্রদক্ষিণ করেন৷ যাত্রাপথে ঠাকুরবাড়ি বাজারে সঙ্ প্রদর্শন হয়৷ হাজার হাজার উৎসাহী জনতার ভিড়ে মুখরিত হয় এসময়৷ যে সকল গাজন উৎসবে চড়ক পূজার প্রচলন আছে সেখানে সঙ্ দেখতে পাওয়া যায়৷ এছাড়া চন্দ্রকোণার উল্লেখযোগ্য গাজন উৎসবগুলির মধ্যে রামগঞ্জের বুড়াশিব, গোপসাই গোপেশ্বর, লালসাগর ভুবনেশ্বর, গোঁসাইবাজার ও দক্ষিণবাজার শান্তিনাথ, মানিককুণ্ডুর খেয়ালনাথ, জাড়ার বাঁকারায়, বওড়ার কালুরায়, হিরাধরপুরে উজাননাথ, ভগবন্তপুরের বাসি গাজন, কমরপুরে কুমোরেশ্বর, রামজীবনপুরের পার্বতীনাথ ও বুড়ো শিবের গাজান। আগে মহামেল বা নীলপূজায় সাধারণত মহিলারা শিবলিঙ্গে জল অর্পণ করতেন ও ব্রত রাখতেন। বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়েই এই ব্রত করেন।

চন্দ্রকোণার বেশকিছু শিবমন্দিরে শিবঠাকুরের নামের সাথে মিল আছে। যেমন - নুতনহাট, বৈদ্যনাথপুর, বাঁকা সুলতানপুর, জগন্নাথপুর (রাতগাজনে তরজা গানের প্রথা চালু আছে), ভবানীপুর, কালাপাট শিবমন্দিরে শিবের নাম শীতলানন্দ। নয়গঞ্জ, মিত্রসেনপুর, ইলামবাজার, গোসাঁইবাজার, দক্ষিণবাজার, পুরুষোত্তমপুর শিবমন্দিরে শিবের নাম শান্তি নাথ। মাল্লেশ্বরপুর, হীরাধরপুরে শিবের নাম উজাননাথ। রঘুনাথপুর, রামজীবনপুরে শিবের নাম পার্বতীনাথ ইত্যাদি। বর্তমানে এখানকার প্রায় সব গ্রামেই গাজন কেবলমাত্র একটি প্রথা নয় এটি গ্রামভিত্তিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

Tuesday, 7 April 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৭

 


খামারবাড়ির গাজন ও গাজনমেলা

দোলন পাত্র

গাজন পশ্চিমবঙ্গের এক প্রাচীন ও বহুমাত্রিক লোকউৎসব, যা মূলত গ্রামীণ হিন্দু সমাজে প্রচলিত হলেও এর শিকড় নিহিত রয়েছে রাঢ় বাংলার আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে। যেমন লোধা, বাগদী, ভূমিজ প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মধ্যে। এই উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের জীবনসংগ্রাম, বিশ্বাস এবং উচ্ছ্বাসের এক সম্মিলিত প্রকাশ। এই প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন লিখতেই হয়—

"..... আজকের এই গ্রাম্য সন্ততির প্রপিতামহের দল হেসে খেলে ভালোবেসে - অন্ধকারে জমিদারদের চিরস্থায়ী ব্যবস্থাকে চড়কের গাছে তুলে ঘুমায় গিয়েছে।

ওরা খুব বেশি ভালো ছিল না; তবুও

আজকের মন্বন্তর দাঙ্গা দুঃখ নিরক্ষরতায়

অন্ধ শতচ্ছিন্ন গ্রাম্য প্রাণীদের চেয়ে

পৃথক আর-এক স্পষ্ট জগতের অধিবাসী ছিল।" - (কবিতা ১৯৪৬ - ৪৭) - জীবনানন্দ দাশ। শিবের আরাধনার মাধ্যমে জীবনের দুঃখ-কষ্ট ও প্রতিকূলতাকে জয় করার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষাই গাজনের মূল সুর। গাজনের অন্তিম পর্বে অনুষ্ঠিত চড়ক পূজা এই উৎসবকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। চড়ক আমাদের জীবনের গতিময়তা হাসি কান্নার উত্থান পতনের এক লৌকিক প্রতীক।

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনীর অদূরে অবস্থিত খামারবাড় গ্রাম এই গাজন উৎসবের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। শালবনী বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রত্যন্ত গ্রাম প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরপুর। কাজুবাদাম, শাল ও মহুলের সুবাসে ভরা পথ, সবুজে ঘেরা পরিবেশ এবং ছোটো নদী তমালের শান্ত প্রবাহ এই গ্রামকে এক অনন্য আবহ প্রদান করেছে। নদীর উপর নির্মিত সেতু সংযুক্ত করেছে খামারবাড় ও আমচুড়া গ্রামকে, যা এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতীক।

খামারবাড়ির গাজন উৎসব প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন, যা আট পুরুষ ধরে ধারাবাহিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, নিমাইচাঁদ দন্ডপাট মহাশয়ের সময় থেকেই এই উৎসবের সূচনা। তখন এই অঞ্চল ছিল ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত। শীতলনাথ দন্ডপাটের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় শিবমন্দির, এবং তাঁর নামানুসারেই শিবঠাকুর ‘শীতলনাথ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। একটি উল্লেখযোগ্য কাহিনি অনুসারে, দন্ডপাট পরিবারের একটি গরু প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট স্থানে দুধ দিত, যা লক্ষ্য করে গ্রামবাসীরা সেখানে শিবলিঙ্গের আবিষ্কার করেন। এই অলৌকিক ঘটনাই মন্দির প্রতিষ্ঠা ও গাজন উৎসবের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গাজন উৎসব চৈত্র মাসের অন্তিম পর্বে শুরু হয়। চৈত্র মাসের ২২ তারিখের পূর্বে শীতলা মাতার মন্দিরে পূজার মাধ্যমে উৎসবের সূচনা ঘটে। পরদিন ভোরে ‘ক্যামলা ওঠা’ বা গাজনের ঘাট তোলার মধ্য দিয়ে মূল আচার শুরু হয়। এদিন থেকেই ভক্তরা উপবাস ও কঠোর কৃচ্ছসাধনে ব্রতী হন। প্রায় ৫০০ জন ভক্ত এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। এই ভক্তদের মধ্যে প্রধান ভক্তকে বলা হয় ‘পাট ভক্তা’, দ্বিতীয় ভক্ত ‘কোটাল ভক্তা’ এবং যিনি সমগ্র আয়োজনের তত্ত্বাবধান করেন তিনি ‘ধর্মকর্ণী’ নামে পরিচিত। আট দিনব্যাপী চলা এই উৎসবের প্রধান দিন হলো চৈত্র সংক্রান্তি। এই দিনে অনুষ্ঠিত হয় ‘আগুন সন্ন্যাস’ ও ‘হিন্দোলা’। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, গ্রামের প্রয়াত ব্যক্তিদের চিতার কাঠ দিয়েই আগুন জ্বালানো হয়। সেই আগুনের উপর ভক্তদের নৃত্য এবং হিন্দোলায় দোল খাওয়া একদিকে যেমন ভক্তির চরম প্রকাশ, তেমনি অন্যদিকে তা জীবন-মৃত্যুর দার্শনিক উপলব্ধির প্রতীক।

গাজন উৎসবকে কেন্দ্র করে খামারবাড়িতে আট দিনব্যাপী এক বৃহৎ মেলার আয়োজন করা হয়। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম—যেমন যাত্রা বিস্টুপুর, ভাদুতলা, চাঁদাবিলা, জগন্নাথপুর, মন্ডল কুপি, তিলাখুল্যা, বরাকুলি প্রভৃতি এলাকা থেকে মানুষ এই মেলায় অংশগ্রহণ করেন। ভক্তরা শিবঠাকুরের মাথায় জল ঢেলে মানত করেন এবং বিশ্বাস করেন যে, তাঁদের মনস্কামনা পূর্ণ হয়। মেলা প্রাঙ্গণে বিভিন্ন পণ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সমাহার এই উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

১লা বৈশাখে একটি বিশেষ রীতি পালিত হয়, যেখানে গ্রামবাসীরা গান গেয়ে ভক্তদের পথরোধ করেন—

"কোথায় চলেছ তোমরা যতেক সন্ন্যাসী

পথ মাঝে দাঁড়ায়েছে বিরাট রাক্ষসী"

এই গানের মধ্যে থাকে হাস্যরস ও কৌতুক, যা ভক্তদের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও ক্লান্তি কিছুটা লাঘব করে।

এই মন্দিরের পূজার দায়িত্ব পালাক্রমে ১২ জন চক্রবর্তী পরিবারের সদস্য পালন করেন। তাঁদের প্রত্যেকে একেক বছরে গাজন উৎসবের সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা একটি সুসংগঠিত ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির নিদর্শন।

প্রথমদিকে মন্দিরটি ছিল মাটির ও খড়ের তৈরি। পরবর্তীকালে তরুণনাথ দন্ডপাট মহাশয়ের উদ্যোগে বর্তমান পাকা মন্দির নির্মিত হয়, যা আজও গ্রামবাসীদের ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

খামারবাড়ির গাজন উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি গ্রামীণ জীবনের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের এক অমূল্য সম্পদ। স্বয়ং আবির্ভূত শিবলিঙ্গ ও শতাব্দীপ্রাচীন এই ঐতিহ্য শালবনী অঞ্চলের এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। তবে এত সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও এই মন্দির ও উৎসব এখনও যথাযথ সরকারি স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত। প্রয়োজন যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে এবং এর মহিমা আরও বিস্তৃতভাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

Saturday, 4 April 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৬

 


লোকসংস্কৃতির দর্পণে ডেবরা : মাড়োতলা শ্রী শ্রী ঁসত্যেশ্বর মহাদেব জিউর গাজন ও গাজন মেলা

বিশ্বজিৎ ভৌমিক 


পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা ব্লকের সত্যপুর তথা মাড়তলা গ্রামে অবস্থিত সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দিরের গাজন উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং অটুট বিশ্বাসের এক মিলনমেলা। রাজা মুকুট নারায়ণের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হওয়া এই উৎসবের মূল ভিত্তি হলো 'সত্যের জয়গান', যা আজও এই জনপদের আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। তীব্র বৈশাখের তপ্ত দুপুরে যখন ঢাকের গুরুগম্ভীর আওয়াজে মাড়তলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের সমাগম প্রমাণ করে এই উৎসবের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিরন্তন রূপ। একদিকে গাজন সন্ন্যাসীদের কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ও ত্যাগের মহিমা, আর অন্যদিকে গ্রাম্য মেলার রঙিন পসরা—সব মিলিয়ে সত্যেশ্বরের এই বৈশাখী গাজন মেদিনীপুরের লোকায়ত সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল, যা যুগ যুগ ধরে ভক্ত হৃদয়ে ভক্তি ও ঐতিহ্যের সেতুবন্ধন রচনা করে চলেছে। বাংলার গ্রাম্য জনপদে শিব উপাসনা এক অতি প্রাচীন প্রথা, যেখানে দেবতাকে কেবল মন্দিরে নয়, বরং সমাজের রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখা হয়। সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দির এমনই এক আধ্যাত্মিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। জনশ্রুতি আছে যে, এই মন্দিরের মহিমা ও 'সত্যের' শক্তির কারণেই এই জনপদটি 'সত্যপুর' নামে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রাচীন 'মাড়তলা' প্রাঙ্গণে অবস্থিত এই মন্দিরটি আজও মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্য এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার স্মৃতি বহন করে চলেছে।

সত্যেশ্বর মহাদেব মন্দিরের ইতিহাস মূলত স্থানীয় জনশ্রুতি এবং অলৌকিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বলা হয়, এই শিবলিঙ্গটি কোনো মানুষের দ্বারা নির্মিত নয়, বরং এটি একটি 'স্বয়ম্ভু' লিঙ্গ (যা মাটি ফুঁড়ে নিজে থেকেই আবির্ভূত হয়েছে)।

লোককথা অনুযায়ী, বহু বছর আগে এই অঞ্চলটি যখন ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল, তখন এক মেষপালক বা গোয়ালা লক্ষ্য করেন যে তার একটি গাভী প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট ঝোপের মধ্যে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুধ দিচ্ছে। কৌতূহলী হয়ে গ্রামবাসীরা ওই স্থানটি খনন করলে এই অলৌকিক শিবলিঙ্গটি খুঁজে পান।

গড়কিল্লা রাজা মুকুট নারায়ণ ছিলেন এই অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী এবং প্রজাবৎসল শাসক। তাঁর শাসনকালেই ষোড়শ শতাব্দীতে সত্যেশ্বর মহাদেবের মন্দিরটি একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। লোকগাথা অনুযায়ী, রাজা স্বপ্নদেশ পেয়ে বা অলৌকিক কোনো ঘটনার সাক্ষী হয়ে এই 'স্বয়ম্ভু' লিঙ্গটির ওপর মন্দির নির্মাণ করেন। অর্থাৎ প্রায় ৬০০ বৎসরের প্রাচীন এই শিব মন্দির নবরত্ন আকৃতির। 

সত্যপুরের সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দিরের গাজন উৎসবের রীতিনীতি হলো ভক্তি, কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন এবং প্রাচীন লোকচারের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এই মন্দির ন'য় ভোগের মন্দির। প্রতিবৎসর এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন স্থান থেকে আগত শতাধিক ভক্ত যাঁরা 'সন্ন্যাসী' বা 'ভক্ত্যা' নামে পরিচিত, তাঁরা সাদা বস্ত্র পরিধান করে এবং গলায় উত্তরীয় ধারণ করে এক পবিত্র ব্রত পালন করেন। উৎসবের দিনগুলিতে তাঁরা সম্পূর্ণ নিরামিষ আহার বা হবিষ্যান্ন গ্রহণ করেন এবং খালি পায়ে হেঁটে ও মাটিতে শয়ন করে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করেন। প্রতিদিন ভোরে স্থানীয় জলাশয়ে উত্তরমুখী হয়ে স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে মন্দিরের গর্ভগৃহ পর্যন্ত 'দণ্ডী কাটা' বা সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানানো এই উৎসবের এক আবশ্যিক রীতি। বৈশাখী গাজনের বিশেষ আকর্ষণ হলো 'ফল গাজন', 'নীল পুজো' এবং রোমাঞ্চকর 'চড়ক উৎসব' (বর্তমানে এই চড়ক উৎসব আর হয়না)। গাজন উৎসবের সূচনা হতো পুকুরে ঘট ডুবিয়ে দুর্গাপূজা করে একটি মাগুর মাছ বলি দিয়ে।  গাজনের শেষ দিন‌ও মাগুর মাছ বলি করা হতো। এছাড়া উৎসবের রাতে 'মাড়তলা' প্রাঙ্গণে ঢাকের বাদ্যি ও ধূপের ধোঁয়ায় উন্মত্ত হয়ে সন্ন্যাসীরা শিব-পার্বতীর মহিমা গেয়ে 'বোলান' নৃত্য পরিবেশন করেন। অনেক ক্ষেত্রে 'আগুন ঝাঁপ' বা 'কাঁটা ঝাঁপ'-এর মতো অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমে ভক্তরা তাঁদের অটল বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক শক্তির পরিচয় দেন, যা আজও সত্যপুরের এই গাজনকে মেদিনীপুরের লোকসংস্কৃতির এক শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়ে রেখেছে।

তৎকালীন সময়ে সত্যেশ্বর মহাদেবকে 'জাগ্রত বিচারক' মনে করা হয়। কথিত আছে, প্রাচীনকালে গ্রামে কোনো চুরি বা বিবাদ হলে অভিযুক্তকে মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে সত্য বলতে হতো। কেউ যদি মিথ্যা বলত, তবে সে তৎক্ষণাৎ রক্তবমন করত বা কোনো দৈব দুর্ঘটনার শিকার হতো। এই ভয়েই চোর-ডাকাতরা সত্যপুর গ্রামে ঢুকতে সাহস পেত না।

একটি পুরনো কাহিনী অনুযায়ী, এক সময় মন্দিরের সেবাইতরা পুজোর জন্য একটি বিশেষ তামার ঘড়া ব্যবহার করতেন। জনশ্রুতি আছে, মহাদেবের কৃপায় সেই ঘড়ার জল কখনো শেষ হতো না, যত মানুষই চরণামৃত গ্রহণ করুক না কেন।

বৈশাখী গাজনের সময় যখন সন্ন্যাসীরা 'আগুন ঝাঁপ' বা 'কাঁটা ঝাঁপ' দেন, তখন অনেকেরই বিশ্বাস যে মহাদেবের আশীর্বাদে তাদের শরীরে কোনো ক্ষত বা পোড়া দাগ সৃষ্টি হয় না। এমনকি তপ্ত বৈশাখের দুপুরে খালি পায়ে জ্বলন্ত পিচের রাস্তায় হাঁটলেও ভক্তরা কোনো কষ্ট অনুভব করেন না বলে দাবি করেন।

সত্যেশ্বর মাড়োতলার গাজন উৎসবটি সাধারণত বৈশাখ মাসের ২১ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত অত্যন্ত ধুমধাম করে পালিত হয়। শেষ দিনে জলঢাকা উৎসব পালন হয়। এছাড়াও চৈত্র মাসের নির্ধারিত নীলপূজার দিন‌ও জলঢালা উৎসবটি পালন করা হয়। এই দুই দিন ছাড়া অন্য কোন দিন ভক্তরা সরাসরি শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালতে পারেন না। বাকি দিনগুলোতে ঢল ঢালার প্রয়োজন হলে পুরোহিতদের হাত দিয়েই বাবার মাথায় জল ঢালতে হয়। 

জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ শুরু হওয়ার আগে মহাদেবের কৃপা প্রার্থনা এবং বৃষ্টির কামনায় এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। রাজা মুকুট নারায়ণের সময়কাল থেকেই এই নির্দিষ্ট সময়ে উৎসব পালনের রীতি চলে আসছে বলে মনে করা হয়। এখানকার পাটভক্ত্যা গড়কিল্লার মাইতি পরিবারের, দেউল ভোক্ত্যা সত্যপুরের পন্ডিত পরিবারের ও কোটাল ভোক্ত্যা সী পরিবার থেকে হন প্রতিবছর।

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা ব্লকের অন্তর্গত সত্যপুরের সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দিরের 'মাড়তলা'র মেলাটি কেবল একটি ধর্মীয় সমাবেশ নয়, এটি কয়েক শতাব্দীর বিবর্তনশীল ইতিহাসের এক জীবন্ত মহাকাব্য। এই মেলার প্রাচীন ইতিহাসের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে রাজা মুকুট নারায়ণের রাজকীয় ঐতিহ্য; লোকশ্রুতি অনুযায়ী, মধ্যযুগের শেষভাগে রাজা যখন এই 'স্বয়ম্ভু' শিবলিঙ্গটি উদ্ধার করে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, তখন থেকেই বৈশাখী গাজন উপলক্ষে এই মেলার সূচনা হয়। প্রাচীনকালে এই মেলাটি ছিল মূলত একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক মিলনস্থল, যেখানে ওড়িশা ও বাঁকুড়ার সীমান্ত থেকেও বণিকরা আসতেন। সেই সময় মেলার মূল আকর্ষণ ছিল বিনিময় প্রথা, মাটির তৈরি পুতুল, এবং বাঁশ ও বেতের নিপুণ হস্তশিল্প। রাজা মুকুট নারায়ণের উপস্থিতিতে মেলার সূচনা হতো এবং চড়ক গাছের ঘূর্ণনের সাথে সাথে ভক্তদের অলৌকিক কৃচ্ছ্রসাধন দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাতেন। গভীর রাতে হ্যারিকেনের আলোয় বসত কবিগান, বোলান গান এবং পৌরাণিক পালাগান, যা গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল।

সময়ের সাথে সাথে মেলার সেই প্রাচীন রূপ বর্তমানে এক বিশাল আধুনিক ও বাণিজ্যিক উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে এটি কেবল ডেবরা নয়, বরং সমগ্র পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অন্যতম বৃহৎ মেলায় পরিণত হয়েছে। মেলার পরিসর এখন অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর ব্যাপ্তি ৩০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। আধুনিক যুগে মেলার অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে; এখন আর কেবল মাটির হাঁড়ি-কুড়ি নয়, বরং আসবাবপত্র, আধুনিক গৃহস্থালি পণ্য, ইলেকট্রনিক্স এবং কৃষি যন্ত্রপাতির এক বিশাল বাজার এখানে বসে। বিনোদনের সংজ্ঞাও বদলেছে; এখনকার মেলায় বিশালাকার নাগরদোলা, সার্কাস, এবং বিচিত্রানুষ্ঠানের পাশাপাশি আধুনিক যাত্রা ও লোকসংগীতের আসর বসে। তবে এত পরিবর্তনের মাঝেও মেলার মূল আত্মিক সুরটি আজও অপরিবর্তিত।

এই মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো মচমচে গরম জিলিপি, বড় বড় সাদা কদমা ও চিনির রসালো বাতাসা, যা ভক্তরা পরম ভক্তিতে মহাদেবের প্রসাদ হিসেবে বাড়ি নিয়ে যান। তীব্র বৈশাখের দুপুরে মেলায় আসা মানুষের প্রাণ জুড়াতে একদিকে যেমন থাকে আখের রস, ডাব ও তরমুজের শরবত, অন্যদিকে থাকে মুচমুচে বিশাল পাঁপড় ভাজা, আলু চপ, বেগুনি ও ঘুগনি-মুড়ির জিভে জল আনা স্বাদ।  পেটাই পরটা এছাড়া প্রাচীন আমল থেকে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী খাজা, গজা এবং মুড়ির মোয়ার পাশাপাশি বর্তমানের মেলায় বিরিয়ানী,পকোড়া, মোমো, চাউমিন ও এগরোলের মতো আধুনিক খাবারের সমাহারও ভীষনভাবে চোখে পড়ে। ঐতিহ্যের এই স্বাদ ও গন্ধই সত্যপুরের মেলাটিকে ভোজনরসিকদের কাছে এক অনন্য উৎসবে পরিণত করেছে। 'মাড়তলা'র সেই প্রাচীন পুকুরপাড়ে আজও হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হন, যা রাজা মুকুট নারায়ণের আমল থেকে চলে আসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের এই অপূর্ব মেলবন্ধনে সত্যপুরের মেলাটি আজও মেদিনীপুরের লোকসংস্কৃতিকে সগৌরবে বহন করে চলেছে।

বর্তমানে সত্যপুরের সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দিরের বৈশাখী গাজন ও মারো তলার মেলা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এই সেবাইতগনের  শ্রী শ্রী সত্যেশ্বর মহাদেব জিউ দেবত্ব শিবপূজা কমিটি এছাড়াও বর্তমানে এই বৃহত্তর মেলা পরিচালনায় সুসংগঠিত মেলা পরিচালনা কমিটি, যা স্থানীয় গ্রামবাসী, পঞ্চায়েত প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত। রাজা মুকুট নারায়ণের আমল থেকে চলে আসা এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে আধুনিক যুগে সুশৃঙ্খলভাবে টিকিয়ে রাখতে এই কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কমিটির প্রধান কাজ হলো বৈশাখী গাজনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলি শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে সম্পন্ন করা এবং সন্ন্যাসীদের নিরাপত্তা ও সেবার সুব্যবস্থা করা। মেলার সময় হাজার হাজার মানুষের সমাগম সামাল দিতে কমিটি স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় পানীয় জল, আলোকসজ্জা, এবং শৌচাগারের ব্যবস্থা করে। এছাড়া, মাড়তলা প্রাঙ্গণে মেলার দোকানদারদের স্থান বণ্টন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা যাত্রাপালার আয়োজন এবং শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিয়োগও এই কমিটির অধীনে থাকে। রাজা মুকুট নারায়ণের সেই অসাম্প্রদায়িক আদর্শকে পাথেয় করে কমিটি আজও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে এই বৃহৎ মিলনমেলা পরিচালনা করে আসছে, যা ডেবরা অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। কমিটির বর্তমান সভাপতি ধুর্যটিপ্রসাদ চক্রবর্তী, সম্পাদক অজিত কুমার চক্রবর্তী এবং কোষাধ্যক্ষ মৃনালকান্তি চক্রবর্তী।

বর্তমানে সত্যেশ্বর মহাদেব মন্দিরটি তার সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে আজও সগৌরবে দণ্ডায়মান। যদিও শতবর্ষের ঝোড়ো হাওয়া এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মূল কাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, দেবত্ব ট্রাস্টের তহবিল ও কমিটির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মন্দিরটির আমূল সংস্কার করা হয়েছে।  প্রাচীন 'আটচালা' স্থাপত্যরীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে মন্দিরের দেওয়ালে নতুন করে পলেস্তারা এবং রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে, যা দূর থেকে ভক্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মেঝেতে মার্বেল পাথর দেওয়া হয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে সেই ঐতিহাসিক 'স্বয়ম্ভু' শিবলিঙ্গটি আজও অত্যন্ত ভক্তিভরে নিত্যপূজিত হন।

রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে সত্যেশ্বর মহাদেব মেলা পরিচালনা কমিটি এবং স্থানীয় সেবাইত পরিবার একযোগে কাজ করে। মন্দিরের প্রাত্যহিক ভোগ-রাগ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং আলোকসজ্জার দায়িত্ব তাঁরাই পালন করেন। বিশেষ করে বৈশাখী গাজনের আগে 'মাঢড়তলা' প্রাঙ্গণ এবং মন্দিরের চারপাশ বিশেষভাবে সজ্জিত করা হয়।  মন্দিরের সামনের চাতাল এবং দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জায়গাটি আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংগঠিত হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, সত্যপুরের সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দির কেবল একটি মন্দির বা স্থাপত্য নয়, বরং এটি মেদিনীপুরের মাটি ও মানুষের প্রাণের স্পন্দন। রাজা মুকুট নারায়ণের হাত ধরে যে ঐতিহ্যের সূচনা হয়েছিল, তা শত শত বছরের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও সামাজিক পরিবর্তনের ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আজও স্বমহিমায় ভাস্বর। 'মাড়তলা'র সেই ধুলিকণায় মিশে আছে গাজন সন্ন্যাসীদের কঠোর ত্যাগ, ভক্তের অটল বিশ্বাস এবং গ্রাম্য মেলার চিরায়ত আনন্দধারা। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই মন্দির ও মেলাটি একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক শান্তির নীড়, অন্যদিকে তেমনই এক প্রাচীন লোকসংস্কৃতির জীবন্ত পাঠশালা। আধুনিকতার প্রবল জোয়ারেও সত্যপুরের মানুষ যেভাবে তাঁদের এই শিকড়কে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন, তা সত্যই প্রশংসনীয়। সত্যেশ্বর মহাদেবের এই 'সত্যের জয়গান' আগামী দিনেও ডেবরা অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক গৌরবকে অক্ষুণ্ণ রাখবে—এটাই আমাদের একান্ত কামনা।

সবশেষে ধ্বনিত হোক গাজন উৎসবে সন্ন্যাসীদের সেই মন্দির কাঁপানো ধ্বনি : "বাবা সত্যেস্বরের চরণে সেবা লাগে - মহাদেব, মহাদেব"।


তথ্যসূত্র

 শ্রী কমল চক্রবর্ত্তী - সেবাইত

শ্রী মৃনালকান্তি চক্রবর্ত্তী - সেবাইত

এছাড়াও মাড়তলা এলাকায় দোকানদার ও ব্যবসায়ীগণ

চিত্র : নিজস্ব চিত্র

                      লেখক - বিশ্বজিৎ ভৌমিক 


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৯

ঘাটাল মহকুমায় গাজনের সেসময় এবং এসময় আশিস করণ ১. ভারতের যে সকল প্রাগৈতিহাসিক দেবতা পরবর্তীকালে হিন্দু সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠা স্থাপন করতে ...