Tuesday, 24 March 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৩

 


দেউলতলার গাজন

সায়ন সামন্ত 

History is always written by the winners। ইতিহাস নিয়ন্ত্রিত হয় বিজয়ীদের হাতের ইঙ্গিতে। অথচ যারা নিম্নবর্গীয়, যারা অন্ত্যজ তাদের ইতিহাস লেখার জন্য বারংবার রনজিৎ গুহরা এই পৃথিবীতে আসেননা। তাঁদের লোক কথা, লোক শিল্প, লোক উৎসবের কাহিনী শুধুমাত্র লোক মুখেই প্রচলিত হতে থাকে। বাংলায় এমনই কিছু লোক উৎসবের উল্লেখ শাস্ত্রে থাকলেও এমন বেশ কিছু লোক উৎসব রয়েছে যেগুলির উল্লেখ শাস্ত্র গ্রন্থে মিলবে না। যেমন 'অম্বুবাচী' কিংবা 'নবান্ন' শাস্ত্রে উল্লিখিত হয়েছে, কিন্তু আশ্চর্যের, একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর জীমূতবাহনের 'কালবিবেক', পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচিত বৃহস্পতি রায়মুকুটের 'স্মৃতি রত্নহার',  ষোড়শ শতাব্দীর গোবিন্দানন্দ কবিকঙ্কণাচার্যের 'বর্ষক্রিয়া কৌমুদী' কিংবা ষোড়শ শতাব্দীর রঘুনন্দনের 'তিথিতত্ত্বে' 'চড়ক' বা 'গাজনের' নাম উল্লিখিত হয়নি। এই লোক উৎসবগুলির মধ্যে গাজন অথবা চড়কের দিকে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি তবে দেখতে পাবো শুধুমাত্র বাংলায় বা এই দেশ ভারতবর্ষে গাজনের শিকড় সীমাবদ্ধ নয়।  গ্রিস দেশে Bachchu দেবকে বলা হত Dionysus। এই দেবতার গাজন অনুষ্ঠিত হতো। মিশরে লিঙ্গদেব আসীরসকে গাজন উপলক্ষে ৩৮০ কলসি দুধে স্নান করানো হত। প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তরে হেব্রিদিস দ্বীপপুঞ্জে Bunlap নামে যে দ্বীপের অবস্থিতি, সেখানে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির ১৫ থেকে ১৮ এই চারদিন ৭০ ফুট উচ্চ মঞ্চ থেকে যে ঝাঁপ দেওয়ার রীতি, তার সাথে আমাদের গাজনের সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। তাই এই উৎসবের ব্যাপকতা ও পরিধি একে একটি বহুমাত্রিক উৎসবে পরিণত করেছে। 

গাজন শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানান মতভেদ রয়েছে। গাজন যাঁদের মতে শিবের বিবাহোৎসব তাঁদের মতে ভক্ত্যারা হল শিবের বিবাহের বরযাত্রী। তাদের সমবেত গর্জন থেকেই নাকি 'গাজন' শব্দটির উদ্ভব। আবার কেউ বা বললেন গাঁ জনের উৎসব বলেই 'গাজন'। গাজন শিবের বিবাহোৎসব, কারো মতে এটি একটি কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব যে উৎসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাদুক্রিয়া এবং Fertility cult। কারো মতে তথাকথিত অন্ত্যজদের উৎসব, 'দরিদ্রের মহোৎসব', কারো মতে বর্ষশেষে সৌরচক্রের সমাপ্তির দ্যোতক। নানা বিষয়ে মতভেদ থাকলেও দুটি বিষয়ে ঐকমত্য পরিলক্ষিত হয়-তা হল চড়ক কিংবা গাজন, গম্ভীরা কিংবা বোলান যাই হোক না কেন, তা শিবকেন্দ্রিক। এসব লোকোৎসবের কেন্দ্রে রয়েছেন শিব। দ্বিতীয়ত চড়ক অথবা গাজন যাই বলি না কেন মূলত এই উৎসবের অংশগ্রহণকারীরা হল তথাকথিত অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ। আজও গ্রাম বাংলা থেকে শহরতলী মহা সমারোহে গাজন উদযাপিত হয়। তবে এলাকাভেদে, স্থানভেদে এই গাজন উদযাপনের নিয়মের কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বাংলায় মেদিনীপুরের কেশপুর এলাকার চিত্রটিও খানিক এমন। জেলার বিখ্যাত কিছু গাজন অনুষ্ঠিত হয় এই এলাকায় এবং তার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট বর্তমান আনন্দপুর থানার কানাশোল গ্রামের ঝাড়েশ্বর মন্দিরের গাজন। 

মেদিনীপুরের আনন্দপুর থানার কানাশোলে ঝাড়েশ্বর শিবের প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের প্রাচীন মন্দির রয়েছে। প্রাচীন টেরাকোটার মন্দিরটি ভীষণ দৃষ্টিনন্দন। নাড়াজোল এর রাজা অযোধ্যারাম খানের দেওয়ান রামনারায়ন জানা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। লোকশ্রুতি আছে- মন্দির প্রতিষ্ঠার পূর্বে এইখানের জঙ্গলে এক কৃষ্ণ গাভী বটগাছের নিচে এক জায়গায় রোজ দুধ দিত। এক রাখাল বালক সেটি দেখতে পায়। ঠিক ওই দিন রাত্রে ব্রাহ্মণভূমের রাজা আলাল দেব, ওই গাভীর মালিক এবং আড়িয়াদহের শীতলানন্দ মিশ্র তিনজনই স্বপ্নাদেশ পান! ওই বটগাছের নিচে রয়েছে অনাদি লিঙ্গ। সেই লিঙ্গ কে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নাদেশ পেয়ে বট গাছের নিচ থেকে লিঙ্গ খনন করা হয় এবং ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দের ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তে এই প্রাচীন  ঝাড়েশ্বরের মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। মূল মন্দিরের পাশে মহাকাল ভৈরবের থান, ভোগ মন্ডপ, নাটমন্দির অবস্থিত। প্রাচীন বটের ছায়ায় প্রাকৃতিক পরিবেশে বাবা ঝাড়েশ্বর অধিষ্ঠান করছেন। মন্দিরের পেছনেই রয়েছে ১৪ একরের এক  বিশাল দিঘী যেটি রাজা আলাল দেব খনন করেন। রাজা আলালনাথ দেবের নাম অনুসারে এই বৃহৎ দিঘীটি “আলাল দিঘী” নামে পরিচিত। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই নদীয়াল দেব দাদার স্মৃতিতে ওই জলাশয় এর মধ্যে এক মাকডা পাথরের জলহরি মন্দির তৈরি করেন যা বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত। অনাদি লিঙ্গের পেছনের পূর্বপাশে দেওয়ালে অষ্টাদশভূজা মা দুর্গার মূর্তি খোদিত আছে। নাড়াজোল রাজবংশের কুলদেবী ইনি। এটি ৬৭ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি বাঁকানো কার্নিশযুক্ত পঞ্চরত্ন মন্দির। মন্দিরগাত্রে রয়েছে অসংখ্য পোড়ামাটির কাজ। পোড়ামাটির মূর্তিগুলির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, রাধাকৃষ্ণের লীলা, রামায়ণের কাহিনী, দশাবতার, মিথুনদৃশ্য সহ বিভিন্ন পৌরানিক কাহিনী। রোগনিরাময়ের দেবতা বাবা ঝাড়েশ্বর। রোগমুক্তিতে বহু ভক্ত বাবার মন্দিরে তিনদিন নির্জলা উপবাস পালন করে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন এবং কথিত আছে এভাবেই বহু ভক্তের রোগমুক্তি ঘটিয়েছেন বাবা ঝাড়েশ্বর। তবে গাজন শুরুর নিয়মকানুন খানিক আলাদা বাবার মন্দিরে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায় দশ থেকে বারো লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় এখানে। প্রায় ১৫ দিন ধরে চলতে থাকে গাজনের অনুষ্ঠান। 

চৈত্র মাসের ১৫ তারিখের পর প্রথম শনি অথবা মঙ্গলবারে সূচনা হয় এই উৎসবের। গাজন শুরুর দিনে আয়োজিত হয় একটি সার্বজনীন ভোজ অনুষ্ঠানের। যেখানে কানাশোল গ্রামবাসী প্রায় ২০ হাজার মানুষকে সজনে ডাটার ব্যঞ্জন , মুগ-মুসুর মিশ্রিত ডাল, এবং আলাল পুকুর থেকে সংগৃহিত মাছ সহযোগে ভোজ খাইয়ে থাকেন। ওইদিন রাত্রি ২টোর মধ্যে সমস্ত ভোজন ক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। ভোজন সম্পন্ন হলে ওইদিনই গাজনের ঘট প্রতিষ্ঠা হয় এবং সূচনা হয় গাজনের। গাজনের যেই ঘট প্রতিষ্ঠিত হলো তার নাম ‘শিবকামিন্ন্যা’ অর্থাৎ শিবকে কামনা করে প্রতিষ্ঠিত ঘট। প্রতিষ্ঠিত ঘটের সামনে দুজন মূল সন্যাসী একজন কে বলা হয় ধর্মাধিকারী এবং অপরজন পাট ভক্ত্যা - “আত্ম গোত্র পরিত্যজ্য: শিব গোত্রে প্রবেশিত:” এই মন্ত্র তিনবার বলে নিজ গোত্র পরিত্যাগ করে শিব গোত্রে দীক্ষা নেন। পরদিন সকালে শুরু হয় ‘গাছডাক’ প্রক্রিয়া। মূলত গাজন উৎসবটি এসেছে ধর্মঠাকুরের গাজনকে প্রতিস্থাপিত করে। আগে যা ধর্মের গাজন নামে পরিচিত ছিল এখন সেখানে পালিত হয় শিবের গাজন। এই গাছডাক ধর্মের গাজনের সঙ্গে সম্পর্কিত এর অপর নাম ‘ধর্মের ডাক’। এই প্রক্রিয়ায় হিন্দোলা তলায় বাবা ঝাড়েশ্বর, শিবকামিন্ন্যা ঘট, ধর্মাধিকারী (ধর্ম ঠাকুরের প্রধান সন্ন্যাসী), কাউল লাউসেন (ধর্মমঙ্গল কাব্যের প্রধান নায়ক ও বীরপুরুষ), এবং সত্য, দাপর, ক্রেতা, কলি এই চারযুগের ভক্তবৃদদের কাহিনী ৮৩ কলি ছড়ার মাধ্যমে গেয়ে প্রণাম জানিয়ে তাদের আহ্বান করা হয়। গাছডাক প্রক্রিয়া শেষের পর শুরু হয় হিন্দোলা এবং  দন্ডখেলা (ধুনিচি বা লোহার দণ্ডে আগুন নিয়ে এক বিশেষ প্রকারের নাচ)। এইদিন শুধুমাত্র পাট ভক্ত্যা হিন্দোলাতে অংশ নেন। দন্ডখেলা শেষ হলে শুরু হয় ভোগ নিবেদন। ১২ - ১৫ টি ভোগ অর্থাৎ পরপর ১২ - ১৫ দিন মাটির পাত্রে খুন্তির ব্যবহার ছাড়া আতপ চাল এবং গুড় সহযোগে পরমান্ন রন্ধন করে সেই ভোগ অর্পণ করা হয় বাবা ঝাড়েশ্বরকে যা ‘ভোগডাক’ নামে পরিচিত। ভোগ অর্পণের সময় একই প্রকারে ১২ কলির ছড়া গেয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। নিবেদিত ভোগ পাট ভক্ত্যা আলাল পুকুরে বিসর্জন দিয়ে আসে। 

পরবর্তী দিনগুলিতে একই রীতিতে চলতে থাকে ভোগ নিবেদন। গাজনের ঘট ডোবানোর আগে প্রতিষ্ঠিত হয় আলাম দন্ড। আলাম প্রকৃতপক্ষে কাপড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন ফুলের নকশাসম্পন্ন এক বস্ত্রখণ্ডবিশেষ। রাঙামাটিতে চাকমা সম্প্রদায়ের লোকেরা বয়ন কর্মে এটি ব্যবহার করে। গাজনে একটি উঁচু বাঁশের মাথায় এই কাপড়খন্ড বেঁধে পবিত্র মন্ত্রচ্চারণে তৈরি হয় এই আলাম দন্ড যা মন্দিরের চুঁড়া লক্ষ্য করে রাখা হয়। পরবর্তী পাঁচদিন ব্যাপী চলতে থাকে ‘গাজনভাঁটা’। অর্থাৎ সন্ন্যাসীরা দল বেঁধে গৃহস্থদের বাড়ি বাড়ি যায় বাদ্য সহকারে। সেখানে গৃহস্থের দেওয়া আল্পনায় পিঁড়ি ও হলুদ জলের উপর রাখে ঘাটে পূজিত বাঁশের পতাকা। যথাসাধ্য মান্য দিয়ে থাকে গৃহস্থ। সেরে ফেলেন নিমন্ত্রণের পালা। তারপর ঠাকুর যাবেন অন্য বাড়ি। ঠিক পাঁচদিন চলবে এই গাজনভাঁটা। 

অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হয় ২৬ চৈত্র। এইদিন শুরু হবে বেতভাঙা পর্ব। গাজন উৎসবে বাবা ঝাড়েশ্বরের উপাসনায় যারা যুক্ত হবে তাদের দীক্ষা লাভ হয় এই পর্বে। হবু সন্ন্যাসীকে একদিন নিরামিষ আহার গ্রহণ করে মন্দিরে এসে আলাল পুকুরে স্নান সেরে নতুন বস্ত্র পরে মন্দিরের চারদিকে তিনবার দণ্ডী কেটে আবার স্নান করে মন্দিরের পুরোহিতের থেকে উপবীত ধারণ করেন। উপবীত  হলো সাদা সুতোয় কাশ ঘাস বেঁধে বানানো এক বিশেষ মালা। এই মালা গলায় পরে হাতে বেত নিয়ে শিব গোত্রে দীক্ষা নিতে হয়। প্রায় ১৭০০০ সন্ন্যাসী এই পর্বে দীক্ষা গ্রহণ করে প্রতিবছর। সারাদিন নির্জলা উপবাসের পর স্নান সেরে বাবার চরণে অঞ্জলী দিয়ে ফলাহার করেন এরা। এবং শেষ রাতে গ্রহণ করে হবিষ্যি। সবার অলক্ষ্যে মাটির পাত্রে তালপাতা বা পাটকাঠির জ্বালানিতে আতপচাল ফুটিয়ে দুধ এবং গুড় সহকারে খাওয়ায় প্রথা রয়েছে এখানে। সেইদিন থেকে সন্ন্যাসীর পরিবারের অসৌচ থাকলেও সন্ন্যাসীর অসৌচ থাকে না।

২৮ চৈত্র অনুষ্ঠিত হয় ‘কলাকাটা’, ‘কাঁটাঝাপ’। বাবার ভক্তরা চিরদিনই ছন্নছাড়া, জাগতিক নিয়ম তারা মানেন না, সেই অনুসারেই কলার কাঁদি, কাঁঠাল, সজনে ডাটা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার ফল ও সবজি সহযোগে এক প্রকার নাচ চলতে থাকে যাকে বলা হয় কলাকাটা। তার সঙ্গেই অনুষ্ঠিত হয় কাঁটাঝাপ। বাবলা ও কন্টিকারি জাতীয় কাঁটা গাছ পিঠে মারতে শুরু করে সন্ন্যাসীরা। এও এক প্রকার কৃচ্ছ্রসাধন।   

২৯ চৈত্র অনুষ্ঠিত হয় নীল পূজা। কয়েক লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় এই দিন। কুমারী মেয়েরা উপযুক্ত স্বামী লাভের আশায় এবং বিবাহিত মহিলারা স্বামী, সন্তান এবং পরিবারের মঙ্গল কামনায় শিবের মাথায় দুধ, জল, মধু, ঘি ইত্যাদি ঢেলে থাকে। দুপুর ১ টায় মন্দিরে শুরু হয় ধ্বজা বাঁধার আয়োজন। যে সমস্ত ভক্তদের ধ্বজা মানসিক থাকে তাদের নামে সংকল্প করে মন্দিরের চূঁড়ায় পুজো দেওয়া হয় এবং তারপরে মন্দিরের চূঁড়ায় ধ্বজা বেঁধে মন্দিরের সামনের বটগাছে সেই ধ্বজা ছুঁয়ে তা  মন্দিরে ভেতরে প্রবেশ করে বাবার মাথায় বাঁধা হয়। এরপর পুনরায় চলতে থাকে জলঢালা এবং পূজো। ওইদিন সন্ধ্যায় আয়োজিত হয় শিবের বিয়ে। শিবায়ন গানের আসর বসে মন্দির প্রাঙ্গণে। 

বিবাহ সম্পন্ন হলে আগুন সন্ন্যাসের প্রস্তুতি শুরু হয়। এখানে পালন হয় একটি বিশেষ উপাচার। মন্দিরের ভেতরে মন্দিরের সেবাইত আবির দিয়ে অঙ্কন করেন ‘মেল ঘর’। যে সমস্ত নারীর বিবাহের আট - দশ বছর পরেও সন্তান লাভ হয়নি তারা এই মেল আঁকার দৃশ্য দেখার জন্য মন্দিরে ভিড় করেন। কথিত আছে এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলে নারীরা বাবা ঝাড়েশ্বরের কৃপায় সন্তানলাভ করে। এই ক্ষণে সন্ন্যাসীরা শ্মশান থেকে সংগৃহীত মৃতদেহ পোড়া কাঠ, ফুলঘর, মৃত মানুষের হাড়, খড়, মৃতদেহ পোড়ানোর বাঁশ ইত্যাদি হাতে নিয়ে প্রবল নৃত্য করতে করতে মন্দির সংলগ্ন একটি ফাঁকা জায়গায় গিয়ে উপস্থিত হয় এবং কাঠে আগুন ধরিয়ে উদযাপন হয় আগুন সন্ন্যাস। সন্ন্যাসীদের মধ্যে যদি ওইদিন কেউ মারা যায় তবে তাকেও ওই জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হয়। সন্ন্যাসীদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ একজনকে নতুন শাড়ি, সোলার গয়না পরিয়ে সতী সাজানো হয়। তার হাতে দেওয়া হয় কলসী ভরা  ধুনো এবং আম শাখা। তাকে কাঁধে তুলে সন্ন্যাসীরা আগুন সন্ন্যাসের জন্য রওনা হয়। জ্বলন্ত আগুনে সতী হাতে ধরা ধুনোর কলসি নিক্ষেপ করে। প্রাচীনকালে সতীদাহ প্রথার একটি প্রতীকী উদাহরণ এই ধুনো নিক্ষেপ। অপরদিকে এই আগুন সন্ন্যাস চলাকালীন ধর্মাধিকারী ও পাট ভক্ত্যা স্নান করে বাবার মন্দিরে গিয়ে মেলঘরে আঁকা বাবার রূপ প্রথম প্রত্যক্ষ করেন এবং পরমুহুর্তেই সেটি হাত দিয়ে মুছে দেন। আগুন সন্ন্যাস থেকে ফিরে এসে অপর সন্ন্যাসীরা মন্দিরের ওই মুছে যাওয়া মেল ঘর দেখতে পান।

পরের দিন ৩০ চৈত্র, সংক্রান্তির দিন সকালে সন্ন্যাসীরা তেল হলুদ মেখে স্নান সেরে মন্দিরে দণ্ডী কাটার পর নিজদের গলার উপবীত খুলে  ঘাটে বিসর্জন দেয়। কিছু বছর আগে পর্যন্ত এই স্থানে চড়ক হতো, কিন্তু বর্তমানে প্রশাসনিক অনুমতি না মেলায় সেটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে।  মেলের দিন থেকেই শুরু হয় গাজনের মেলা, মেলা চলে প্রায় বৈশাখ মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত। ওইদিন বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় শেষ লোকাচার ‘পাটরাকাঠ'। দুটি ইউক্যালিপটাস গাছের দন্ড নিয়ে মাঝে কলাগাছের কান্ডের সাহায্যে খাটিয়া তৈরি করা হয়। খাটিয়ায় কলাগাছের ওপরে ছুরি সদৃশ কিছু শলাকা বসানো থাকে। ওই কলাগাছের ওপর পাট ভক্ত্যা শুয়ে থাকেন এবং ধর্মাধিকারী সঙ্গমের অবস্থানে বসে একটি মিলন দৃশ্য রচনা করেন। শিবকে চিরকাল কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের মানুষেরা কৃষি এবং যৌনতার দেবতা হিসেবে পুজো করে এসেছেন। কিন্তু বাবা ঝাড়েশ্বরের গাজন শুধুমাত্র শিবের গাজন নয় এটি শিব এবং ধর্মরাজের গাজনের সম্মিলিত রূপ। মন্দিরের দেওয়ালে আজও মূর্তিরূপে খোদিত আছে সঙ্গমদৃশ। এখানে শিব হয়ে উঠেছেন স্বয়ং  Fertility cult।  সেই সূত্রেই ঐতিহ্যের এই ধারাকে আজও বয়ে নিয়ে চলেছেন কানাশোল গ্রামবাসীবৃন্দ। গ্রামবাসীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অনুষ্ঠিত হয় গাজন, শিবরাত্রি, শ্রাবণ মাসে জলদানের জন্য আজও মন্দিরে ছুটে আসেন লক্ষ লক্ষ ভক্তবৃন্দ। 

কানাশোল ঝাড়েশ্বর মন্দির থেকে 10 মাইল পূর্বে কেশপুরের  নেড়াদেউল গ্রামে অবস্থিত কামেশ্বর মন্দির।  ঝাড়েশ্বর মন্দিরের সঙ্গে কামেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের ব্যাপক মিল রয়েছে। ষোল শতকের শেষের দিকে রাজা উমাপতি রায় ভট্টদেব এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। উমাপতি কামেশ্বর শিব লিঙ্গের সন্ধান পেয়েছিলেন স্বপ্নে। তখন ব্রাহ্মণভূম পরগনার এই অঞ্চলে লাটা জঙ্গল ছিল। অদ্ভুতভাবে কানাশোলের মতো এই স্থানেও মন্দির প্রতিষ্ঠার পূর্বে  জঙ্গলে এক কৃষ্ণ গাভী  এক শিলাখণ্ডে রোজ দুধ দিত। এক রাখাল বালক সেটি দেখতে পায়। এবং সেইদিনই রাজা উমাপতি স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নাদেশ পেয়ে উমাপতি জঙ্গল পরিষ্কার করে শিলাখণ্ড আবিষ্কার করেন এবং গড়ে তোলেন মন্দির।

কামেশ্বর বাবা এখানে স্বয়ং প্রভু জগন্নাথ হিসেবে মন্দিরে বিরাজ করেন। এই দেবমন্দির এক রাত্রির মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল। মন্দিরে নির্মাণের ভার অর্পণ করা হয়েছিল স্বয়ং বিশ্বকর্মার ওপর। কিন্তু সম্পূর্ণ রাত্রি কাজ করার পরেও মন্দিরের চুঁড়া নির্মাণ কিছুটা বাকি থেকে যায়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্দির অসম্পূর্ণ রেখেই ওই স্থান পরিত্যাগ করেন বিশ্বকর্মা। ন্যাড়া ছাদের নিচেই অধিষ্ঠান করেন কামেশ্বর বাবা। সেই থেকেই এই স্থা  নের নামকরণ করা হয় নেড়াদেউল। বাবা কামেশ্বর উমাপতিকে জগন্নাথ রূপে দেখা দেন এবং আদেশ করেন মন্দিরের পূজা পরিচালনার জন্য উৎকল থেকে দুইজন ব্রাহ্মণ আনা আবশ্যক। বাবার আদেশে উমাপতি উৎকল থেকে দুজন পন্ডা ও দুইজন ত্রিপাঠী পুরোহিতকে নিয়ে এসে মন্দিরের নিত্য পূজার ভার অর্পণ করেন। বর্ধমানরাজ তেজচন্দ্র বাহাদুরকে বাবা কামেশ্বর মন্দিরের ভেতরেই জগন্নাথ দর্শন করান। মুগ্ধ হয়ে বর্ধমানরাজ একশো বিঘা বাস্তু, পুকুর এবং দুইশত বিঘা কৃষি জমি প্রদান করেন। তখন থেকেই আজ পর্যন্ত কামেশ্বর মন্দিরে প্রতিদিন জগন্নাথ ভোগ নিবেদন হয়। নিত্য ভোগের পাকাপাকি বন্দোবস্ত করার জন্য মন্দিরের নামে ৩৬৫ বিঘা কৃষিজমি রয়েছে।  এক বিঘা জমি থেকে প্রাপ্ত বার্ষিক আয়ে একদিন মন্দিরের ভোগের বন্দোবস্ত করা হয়। উৎকলের শিল্প রীতিতেই তৈরি এই মন্দির। বাবা কামেশ্বরের দর্শনে শ্রীক্ষেত্র দর্শনের ফল হবে, তিনিই বিশ্বনাথ তিনিই জগন্নাথ, মানুষের এই বিশ্বাস। নানান রোগ ব্যাধি থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে আজও বাবার স্মরণাপন্ন হন বহু বহু মানুষ। কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে এই মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। পৌষ সংক্রান্তিতে বিরাট মেলা বসে এই মন্দিরে। মহা সমারোহে পালিত হয় গাজন উৎসব। 

তবে বর্তমানে কামেশ্বর বাবা মন্দিরে গাজন শুরু হয় চৈত্রের শেষের দিকে। এখানে গাজনের শুরুতে নয় গাজনের শেষে হয় মহাভোজের আয়োজন। গাজনের শুরুতে এখানে দীক্ষা নেন পাট ভক্ত্যা, তারপর কোটাল ভক্ত্যা এবং শেষের চারদিন বাকি সন্ন্যাসীরা দীক্ষা নিয়ে থাকেন। পাট ভক্ত্যা দীক্ষা নেওয়ার পর ক্রমানুযায়ী চলতে থাকে একের পর এক গাছডাক, হিন্দোলা, ভোগডাক প্রভৃতি আচার অনুষ্ঠান। তবে কামেশ্বর বাবার মন্দিরের ভোগ মাটির পাত্রে রান্না হয়না। ২৬ চৈত্র থেকে পালিত হয় বেতভাঙা, কাঁটাভাঙার মতো আচার। ২৯ চৈত্র অর্থাৎ মেলের দিন বাবার মাথায় জলঢালা শুরু হয়। দুপুরে ধ্বজা বাঁধার রীতিও চলতে থাকে তবে বাবার মন্দিরে শুধুমাত্র সাদা ধ্বজা বাঁধা হয়। সন্ধ্যার শিবের বিয়ে সম্পন্ন হলে আগুন সন্যাসের আয়োজন হয়। সংক্রান্তির দিন বাণ ফোঁড়া ও চড়ক। ‘বাণ ফোঁড়া’ নিয়ে এক বিশেষ প্রবাদ রয়েছে। হরিবংশের বাণ রাজা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধে ঘোরতর আহত হন। রাজা বাণবিদ্ধ অবস্থায় শোণিতাপ্লুত দেহ নিয়ে  শিব সন্নিকটে নৃত্য করেছিলেন। তাতে শিব খুশি হয়ে বাণকে অমরত্বের বর প্রদান করেছিলেন। এবং তিনি আরও বলেছিলেন - ‘সত্যপরায়ণ ও সরলতা সম্পন্ন আমার যে ভক্ত নিরাহার থাকিয়া এইরূপ নৃত্য করিবে, সে আমার পুত্রত্ব লাভ করিবে'। এই কারণে চৈত্রোৎসবে ভক্ত্যারা বাণবিদ্ধ শোণিতাপ্লুত কলেবরে শিবসকাশে তাণ্ডব পৈশাচিক নৃত্য করে থাকে। এতে পরমায়ু, ধন, মান ও জীবনান্তে অমরত্ব  লাভ হবে এই বিশ্বাস। বাণরাজা এর পথ প্রদর্শক বলে এই উৎসবের নাম 'বাণফোঁড়া' হয়েছে। বাণ ব্যবহারের আগে বাণ-কে বালির সাহায্যে ঘষে মেজে নেওয়া হয় ও ঘি লাগানো হয়। বাণের পূজা হয়। এরপর কামার স্নান সেরে দেবতার ফুল নিয়ে বাণফোঁড়ার কাজে ব্রতী হয়। বাণ খোলার পর ঘি ব্যবহার করা হয়। কেউ কেউ আবার তিল গুঁড়ো ঘি-র সঙ্গে মিশিয়ে ক্ষত স্থানে লাগায়। কেউ কেউ আবার পদ্মফুল কুঁড়ি চিবিয়ে নেয়। কেউ আবার মন্দিরের গায়ে বা চড়ককাঠে পিঠ ঘষে নেয়। দেহের একই স্থানে দু'বার বাণ ফোঁড়া নিষিদ্ধ। বাণ ফোঁড়ার পর ভক্ত্যারা পিশাচ, ডাকিনীর বেশে সেজে নৃত্য করতে করতে নেড়াদেউল বাজার ও মন্দির প্রদক্ষিণ করে। বিভিন্ন মন্দিরে চড়ক উল্টে দুর্ঘটনার কথা প্রতি বছরই আমরা শুনতে পাই, এর স্থায়ী সমাধান হিসেবে কামেশ্বর বাবার মন্দিরে চড়ক কাঠটি স্থায়ীভাবে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ১লা বৈশাখ সমাপ্ত হয় গাজন। বিসর্জন দেওয়া হয় গাজনের ঘট। 

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কোনো না কোনো সময়ে গাজন অনুষ্ঠিত হয়। ধর্মনিরপেক্ষ এই অনুষ্ঠানে সকলের মঙ্গল কামনায় সঙ্গে সঙ্গে বাংলার মানুষ তাদের সাংস্কৃতিক কুশলতা এবং শিল্পচর্চার নিদর্শনকে মেলে ধরে। গাজন শুধুমাত্র একটি লৌকিক অনুষ্ঠান নয়, এটি ত্যাগ, সংযম, ভক্তি, কৃচ্ছ্রসাধনের এক মেলবন্ধন। সকলের চাষাবাদ ভালো হোক, সকলে সুখে থাকুক, হাসি-খুশিতে থাকুক এবং প্রাণবন্ত থাকুক এটাই বোধহয় গাজন উৎসবের মূল প্রার্থনা।

যে পাথর ঘষে মানুষ একদিন আগুন জ্বালাতে শিখেছে, হাতিয়ার হিসেবে যে পাথর একদিন হাতে তুলে নিয়েছে, যে পাথরে তারা একদিন ফুল ফুটিয়েছে, সেই পাথরকে মানুষই মাটি থেকে তুলে এনে দেবত্ব প্রদান করেছে। তাকে বিশ্বাস করেছে, তাকে দেখে দুহাত মাথায় ঠেকিয়েছে, ভেবে এসেছে যুগে যুগে এই দেবতা রক্ষা করেছে মানব জাতির অস্তিত্ব, তবে সিন্ধু সভ্যতার পশুপতি হোক বা মিশরীয় সভ্যতার ওসিরিস, কিংবা মেসোপটেমিয়ার এলনিন হোক বা রোমান সভ্যতার জুপিটার থেকে আজকের মহেশ্বর সবার ওপরে ‘মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই।’



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

Friday, 20 March 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ২

 


ঘাটাল ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদের গাজন ও গাজন মেলা

মহাশ্বেতা দাস

   

নিত্যদিনের টানাপোড়েনের দিনলিপির নদীটা ডিঙিয়ে আমরা সবাই একটা পাহাড়ের খোঁজ করি…. যে পাহাড়টা খুশীর পাথর দিয়ে তৈরী! সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আছে এক মস্ত আনন্দের বাগান! সেই বাগান থেকে দু একটা ফুল নিত্য দিনের মন খারাপের আঙিনায় টুপটাপ করে ঝরে পড়ে, বাগানের লতাপাতা ব্যস্ত জীবনের নিত্য দিনের টানাপোড়েনের ফাঁক ফোকর দিয়ে উঁকি দেয় মাঝে মাঝে…. ছুঁয়ে যায় মন। 

আমাদের ছোটবেলাটা বিলাস বহুল ছিল না মোটেই। ইচ্ছে করলেই গাড়ী নিয়ে এদিক ওদিক মেলা দেখতে চলে যাওয়া সম্ভব হতো না। খুব দামী খেলনাও পাইনি আমরা সেদিন। কিন্তু অনেক না পাওয়ার মধ্যেও যেটা ছিল….. সেই “রাজার বাড়ীর” মতোই আমাদের একটা মস্ত হাসিখুশীর পাহাড় … যে পাহাড়ে ছিল আমাদের  অবাধ বিচরণ, অনায়াস যাতায়াত আর ছোট ছোট আনন্দ নিয়ে ভরা। সেকথাই লিখে রাখবো একটু একটু করে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে।

আজ লিখতে বসেছি ঘাটাল ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদের গাজন ও গাজন মেলা সম্বন্ধে।  লিখতে বসে ভাবছি কোনদিক থেকে শুরু করবো!! এমনটি ভাবার কারণ আমাদের বসত বাড়ীর ভৌগোলিক অবস্থান। সীমানা ভাগ করলে আমরা ঘাটালের  আড়গোড়া গ্রামের বাসিন্দা। কিন্তু বাড়ির একটু দূর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি পার হলেই যে আলামগঞ্জ…. রথতলা…. বানেশ্বর শিব মন্দির!! আর সেই কবেকার ইস্কুল বেলা থেকে ঐ পথেই যে নিত্যদিনের যাওয়া আসা। নিজের গ্রামে খুব কাছাকাছি দুটো শিব মন্দির একটির প্রচলিত নাম বুড়া শিব মন্দির এবং অন্যটি বিশ্বেশ্বর শিব মন্দির। তারও খানিক দূরে আরও কয়েকটি শিব মন্দির আছে ঠিকই। তবে ওদিকটিতে যাওয়া আসা হয় অবরে সবরে। তাই পাশের গ্রাম আলামগঞ্জ…… ঘাটাল পৌরসভা পেরিয়ে রথতলার দিকে হাঁটা দিলে মিনিট পাঁচেক পরেই দেখা মেলে শ্রী শ্রী বানেশ্বর জিউ শিব মন্দিরের। ছোট বেলায় ঠাকুমার হাত ধরে এখানেই গাজন দেখতে আসা। হিন্দলা হতো এখানে। অবাক বিস্ময়ে শৈশব কৈশোরের কৌতূহলী চোখ অভিভূত হয়ে যেত এসব কান্ড দেখে। কথিত আছে বর্ধমানের রাজা রাজচন্দ্র চক্রবর্ত্তী কর্ত্তৃক ১২০৯ বঙ্গাব্দে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। বাবা বানেশ্বর পূজিত হতেন তৎকালীন সেবাইত আশালতা দেবী (চক্রবর্ত্তী) দ্বারা। আশালতা দেবীর কোন পুত্র সন্তান ছিল না। তাই তাঁর পরবর্তী সময়ে হুগলী জেলার রাজহাটি নিবাসী জামাতা শম্ভুনাথ চক্রবর্ত্তী এই মন্দিরে পৌরোহিত্যের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। শম্ভুনাথ চক্রবর্ত্তীর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর দুই পুত্র গোপাল চক্রবর্ত্তী ও নেপাল চক্রবর্ত্তী মন্দিরে পৌরহিত্যের দায়িত্ব পালন করছেন। এই মন্দিরে শিবরাত্রি, গাজন ইত্যাদি অনুষ্ঠান খুবই সাড়ম্বরে পালিত হয়। পাশাপাশি গ্রাম থেকে বহু মানুষ আসেন এখানে ব্রত পালন করতে, শিবের আরাধনা করতে। চৈত্র মাসের শেষে গাজন উপলক্ষে প্রায় তিন দিন ধরে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। 

   সেদিন বিকেলে সৎসঙ্গ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে ঢালাই রাস্তা বরাবর হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম আমাদের গ্রামের শ্রী শ্রী শীতলানন্দ জিউ শিব মন্দিরে। যদিও ছোটবেলা থেকে বুড়া শিবের মন্দির বলেই আমরা জানি। মন্দিরের উঠোনেই দেখা হয়ে গেল মন্দিরের সেবাইত অরুণা দেবীর সাথে। উনি যোগেন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্রবধূ। প্রায় চার পুরুষ ধরে এঁদের পরিবার এই মন্দিরের সেবাইতের কাজে যুক্ত আছেন। তাই এমন সুযোগ আর হাতছাড়া করতে মন চাইলো না। দেখতে দেখতে গ্রামের আরও কয়েকজন এসে জুটে গেল উঠোনে। সবে মিলে বিকেলের গল্পটা জমে উঠলো দারুণ। আরে হ্যাঁ সেই গল্পটাই তো বলবো।

     এই গ্রামের গৌর মাঝি ছিলেন প্রচুর জমির মালিক।  আজ যেখানে বুড়ো শিবের মন্দির, গৌর মাঝির এই তেরো কাঠা জমিতে তুঁত চাষ হতো। একদিন চাষীর কোদালে ঠেকলো এক লম্বা আকৃতির পাথর। চাষীরা সেটিকে তুলে ফেলে রেখে এলো ধানের খামারে। বাড়ির মেয়েরা দেখলো… বাঃ বেশ সুন্দর একটি চকচকে মসৃণ পাথর! তুলে নিয়ে গিয়ে মশলা বাটার কাজে লাগিয়ে দিল। কিন্তু এ তো যে সে পাথর নয়!! তাই তাঁর গা জ্বালা জ্বালা করতে লাগলো। সহ্য করতে না পেরে পাথরটি  নেমে গেল পাশের পুকুরে। রাজেন্দ্র বেরা  প্রাতঃক্রিয়া সারতে এসে ঘাটে নেমে দেখলেন একটি বাচ্চা ছেলে শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। তুলে নিয়ে গেলেন নিজের ঘরে। ক্রমে ক্রমে বুঝতে পারলেন এ ছেলে কোন সাধারণ ছেলে নয়। রাতে স্বপ্নে জানতে পারলেন ইনি বাবা তারকেশ্বরের ছোট ভাই শীতলানন্দ। রাজেন্দ্র বেরা তাঁর উপলব্ধির কথা জানালেন পাশাপাশি গ্রামের বাসিন্দাদের। আড়গোড়া, শুকচন্দ্রপুর, রঘুনাথচক, শ্যামপুর ও গম্ভীরনগর এই পাঁচটি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সভা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো এখানে বাবা শীতলানন্দের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে নারায়ণ চন্দ্র মন্ডল এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের পূজারী হিসেবে নিযুক্ত করা হয় যোগেন্দ্র চক্রবর্তীকে। ক্রমে ব্রতীদের আনাগোনায় এবং নারায়ণ চন্দ্র মন্ডলের তত্ত্বাবধান ও যোগেন্দ্র চক্রবর্তীর নিষ্ঠা সহকারে পূজার্চনায় মন্দিরটি ধীরে ধীরে একটি জনপ্রিয় মন্দিরের রূপ নিল। যোগেন্দ্র চক্রবর্তীর অবর্তমানে মন্দিরের পূজারী হিসেবে নিযুক্ত হন তাঁর পুত্র ফকির চন্দ্র চক্রবর্তী এবং তাঁর পরবর্তী সময়ে ফকির চন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র দীপক চন্দ্র চক্রবর্তী। নিত্য পূজার্চনা তো ছিলই…. এছাড়াও মকর সংক্রান্তি, গাজন, চড়ক, শিবরাত্রির মতো দিনগুলিতে মন্দির প্রাঙ্গণ উৎসবের আমেজ বিরাজ করে এগিয়ে চললো। কিন্তু এতদিনের পুরানো মন্দিরের চারদিক দিয়ে গাছ উঠে দেওয়ালে ফাটল ধরলো….. ছাদ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো…. একসময় মন্দিরটির বেহাল দশা!! ১৪০৫ বঙ্গাব্দে এই গ্রামের ভূমিপুত্র প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব একাধারে সাহিত্যিক ও অধ্যাপক গুণময় মান্না মহাশয় এবং ওনার সহধর্মিনী অধ্যাপিকা উমা দেবী এই মন্দিরটি নবনির্মাণ করে সংস্কার সাধন করেন। বর্তমানে দীপক চন্দ্র চক্রবর্তীর স্ত্রী অরুণা দেবী এবং তাঁর দুই পুত্র রাজীব কুমার চক্রবর্তী ও গৌতম চক্রবর্তী এই মন্দিরে সেবাইতের কাজ করে চলেছেন। মকর সংক্রান্তি ও শিবরাত্রি পালন তো আছেই। এছাড়াও চৈত্রের শেষে প্রায় এক সপ্তাহ জুড়ে চড়ক, গাজন, ধুনোপোড়া, হিঁদলা কে কেন্দ্র করে মেলা বসে। 

       এছাড়াও আগেই যে পাঁচ গ্রামের কথা বলেছি তার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র শিব মন্দির। এই তো একটু দূরে মাঝি পুকুরের পাড়ে রয়েছে বাবা বিশ্বেশ্বর শিব মন্দির। আজ এই পর্যন্তই থাক। বাকি মন্দির গুলির সমন্ধে না হয় পরবর্তী পর্বে বলা যাবে।


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

প্রচ্ছদ - বিশ্বজিৎ ভৌমিক

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

Tuesday, 17 March 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ১

 


রসকুণ্ডুকে মহিমান্বিত করেছে বাবা বসন্ত রায় জীউ ও তার গাজন মেলা

মঙ্গলপ্রসাদ মাইতি


   রাঢ় বাংলার অন্যতম তীর্থ জনপদ হল রসকুণ্ডু। বর্ধিষ্ণু এই গ্রামটি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা–৩ ব্লকের মধ্যে অবস্থিত। এই গ্রামটি বর্তমানে সর্বজনবিদিত যে কারণে তা হল এখানে বাবা বসন্ত রায় জীউ-এর মন্দির আছে। এই মন্দিরে দেবাদিদেব মহেশ্বর বা শিব ‘বাবা বসন্ত রায় জীউ’ নামে বিরাজ করেন এবং পূজিত হন। বাবা বসন্ত রায় জীউ-এর  অপার কৃপা ও করুণাধারায় নিত্যদিন সিক্ত হচ্ছে রসকুণ্ডুর পবিত্র মাটি। প্রেম ও ভক্তিরসে পরিপূর্ণ  হয়ে বাবা বসন্ত রায়ের লীলাক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এই অঞ্চল। বহুকাল ধরে হাজার হাজার মানুষ এখানে অধিষ্ঠিত জাগ্রত দেবতা এই শিব অর্থাত্‍ মহেশ্বরের চরণে নিজেদের নিবেদন করে সুখ-ও শান্তি অনুভব করে আসছেন। বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ এই দেবতাকে একেবারে কাছের জন বলে মনে করেন। প্রতিদিন শ’য়ে শ’য়ে পুণ্যার্থী এখানে আসেন এবং ভক্তিভরে পুজো দিয়ে বাবার কৃপা লাভ করেন। ‘টেরাকোটা’ পত্রিকার সম্পাদক তুলসীদাস মাইতি বাবা বসন্ত রায়ের চরণাশ্রিতা ভক্তিমতী কাঞ্চন পাল-এর “গীতি অর্ঘ্য : নম: বাবা বসন্ত রায়’ গ্রন্থের প্রাক-কথন লিখতে গিয়ে বলেছেন – “শিব বাঙালির খুব কাছের জন। ঘরের মেয়ে উমা, মেনকার জামাতা। একই সঙ্গে আদরের আবার গঞ্জনারও পাত্র, একাধারে ভোলানাথ আশুতোষ  আবার প্রলয়ঙ্করী রুদ্র, শ্মশানচারী ভূতনাথ আবার শিবসুন্দর মহাদেব সর্বমঙ্গলময় দেবাদিদেব। তাঁর পূজায় খুব বেশি নিয়মকানুন, মন্ত্র-তন্ত্র না করলেও চলে। সেজন্য সহজ-সরল-অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত আপামর  স্ত্রী-পুরুষের কাছে বিশেষ প্রিয় তিনি। তাঁর মন্দির সকলের জন্যই অবারিত। প্রকৃত প্রস্তাবে রসকুণ্ডুতে অধিষ্ঠিত দেবাদিদেব বসন্ত রায় মানুষের কাছের দেবতা হিসেবেই প্রকাশিত। পৌরাণিক ও লৌকিক নানান কাহিনি ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এই ক্ষেত্রটি এক চলমান ইতিহাসের ধারার মতো বয়ে চলেছে।”

   শিব মন্দির থাকবে আর সেখানে অনুষ্ঠান-মেলা-পার্বণ হবে না তা তো নয়। সারা বছর ধরে এই রসকুণ্ডুর বাবা বসন্ত রায়ের মন্দির স্থলে বিভিন্ন পূজার্চনা ও ক্রিয়ানুষ্ঠান চলে। বিশেষ করে শ্রাবণমাসে ভক্তদের জলঢালা দেখার মতো। শিব চতুর্দশীতেও বিরাট মেলা বসে। তবে সব অনুষ্ঠানকে ছাপিয়ে বিশেষ করে জায়গা করে নিয়েছে এখানকার গাজন মেলা। বাবা বসন্ত রায় জীউকে কেন্দ্র এখানে যে গাজন মেলা বসে তা অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। গড়বেতা-১, গড়বেতা-২ এবং গড়বেতা-৩ ব্লক নিয়ে গড়বেতা। এই তিনটি ব্লকের মধ্যে যত যেখানে শিবের গাজন ও মেলা অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ রসকুণ্ডুর এই গাজন মেলা। ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ এবং ওপার বাংলার বাংলাদেশে যে গাজনমেলাগুলি ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে এবং বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে তার মধ্যে এই রসকুণ্ডুর গাজন মেলাও একটি। এখানকার এই মেলাকে কেন্দ্র করে হাজার ছাড়িয়ে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম ঘটে। শুধু গলায় উত্তরীয় নিয়ে বাবার সন্ন্যাস বা ভক্তের সংখ্যাই হয় পনেরো থেকে কুড়ি হাজার। আর বছর বছর এই ভক্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। গাজন মেলার ক’দিন হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাগমে রসকুণ্ডু ও আশেপাশের গ্রামগুলির আকাশবাতাস সরগরম হয়ে উঠে। মন্দির এবং মন্দির চত্বর বিভিন্ন রঙ, ফুল ও আলোকমালায় সুসজ্জিত হয়ে উঠে।   

গাজন মেলা হল গ্রাম্য লৌকিক উত্‍সব। গা অর্থাত্‍ গাঁ(গ্রাম) এবং জন অর্থাত্‍ জনগণ। গ্রামের জনগণের মিলন মেলা হল গাজন। প্রচলিত এই ধারণার সম্যক রূপটি ধরা পড়ে রসকুণ্ডুর বাবা বসন্ত রায় জীউ-এর গাজন মেলায়। পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর এই দুই মেদিনীপুরের গড়বেতা, চন্দ্রকোনা, রামজীবনপুর, শালবনী, কেশপুর, ঘাটাল সহ হুগলি, বাঁকুড়া জেলার জয়পুর, আরামবাগ, গোঘাট, কোতুলপুর, ময়নাপুর  ইত্যাদি ব্লকের অসংখ্য গ্রামের মানুষের মধ্যে এই বাবা বসন্ত রায়ের গাজন মেলাকে কেন্দ্র করে যে বিপুল উত্‍সাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দ লক্ষ্য করা যায় তা এককথায় অনবদ্য। গড়বেতা ও চন্দ্রকোনা শহরের মধ্যর্বতী অঞ্চল হল এই রসকুণ্ডু। গাজন মেলার সময়ের চার পাঁচদিন এলাকার  রাস্তাঘাটগুলিতে  বাবার ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের ঢল নামতে দেখা যায়। রসকুণ্ডু মন্দিরের চারপাশ জুড়ে তিন-চার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত সার সার মোটর সাইকেল, সাইকেল, মারুতি, ভ্যানরিক্সা, অটো, টোটো, ট্যাক্সিতে ছয়লাপ হয়ে যায় যে মেলাতে প্রবেশ করাই দু:সাধ্য হয়ে পড়ে। বাবা বসন্ত রায়ের একটুখানি কৃপা ও দয়া পেতে কাতারে কাতারে মানুষ এই বসন্ত রায়ের গাজন মেলাতে ছুটে আসেন। এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের এমন কোনো বাড়ি নেই যে সেই  বাড়ির সদস্য একবারও ভক্ত বা সন্ন্যাসী হয়নি। অনেকে আবার বছর বছর সন্ন্যাস বা ভক্ত হয়ে থাকেন। এ এক আশ্চর্য মহিমা বাবা বসন্ত রায়ের। 

   বাবা বসন্ত রায জীউ-এর র গাজন মেলা অনুষ্ঠিত হয় চৈত্র সংক্রান্তিতে। আর পাঁচটা চৈত্র সংক্রান্তির গাজন মেলার মতোই। বাংলা চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হয় এবং চৈত্র সংক্রান্তিতে শেষ হয়। রেশ থেকে যায় ১লা বৈশাখ পর্যন্ত। মূলত শিবের পুজোকে ঘিরেই বাবা বসন্ত রায়ের গাজন মেলা। গলায় উত্তরীয় নিয়ে শিবের ভক্ত সাজে বা সন্ন্যাসী হয় হাজার হাজার। শুধু পুরুষ ভক্ত নয় অসংখ্য মহিলাও শিবের ভক্ত হয়। বছর বছর মহিলা ভক্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তাই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে কেউ এখানে সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনী হতে পারে।  দীর্ঘদিন ধরে রসকুণ্ডুর এই গাজন মেলায় পূজার্চনার কাজ করে আসছেন এখানকার বিখ্যাত পলসাঁই বংশধরগণ। কথিত এই পলসাঁই বংশেরই কোনও একজন স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে বহুকাল আগে প্রথম পুজো শুরু করেন। জনশ্রুতি ও বিভিন্ন লোক কাহিনি থেকে জানা যায় এই রসকুণ্ডু অঞ্চলটি একসময় জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। মানুষজনের তেমন যাতায়াত ছিল না। রাখাল বালকেরা এই জঙ্গলে গরু চরাতে আসত। তারই একজনের একটি দুধেল গাভীর কাছ থেকে বেশ কিছুদিন ধরে দুধ মিলছিল না। বলা যেতে পারে দুধ চুরি হয়ে যাচ্ছিল। গাভীর কাছ দুধ না মেলায় সেই রাখালের মালিক রাখালকে খুব বকাঝকা করতে থাকে। রাখাল কোনো সদুত্তর দিতে পারে না। এরপর গাভীর দুধ কোথায় যাচ্ছে গোপনে তা দেখার জন্য কয়েকজন গাভীর পিছু নেয়। তারা দেখতে পায় ওই গাভীটি গভীর জঙ্গলে গিয়ে লতাপাতায় ঢাকা একটি কালো শিবলিঙ্গের কাছে দাঁড়িয়েছে এবং গাভীটির বাঁট থেকে অঝোরে দুধ ঝরে যাচ্ছে। এরপর পলসাঁই বংশের একজন এই শিবলিঙ্গকে স্বপ্ন দেখেন। অনুমান করা হচ্ছে সম্ভবত তিনিই স্বপ্নাদেশ পেয়ে এখানে শিবের পুজো শুরু করেন। বাঁশ-কাঠ, খড় আর মাটি দিয়ে প্রথম মন্দির নির্মিত হয়। ইনিই হলেন বাবা বসন্ত রায় জীউ। এই সুত্র ধরে আরও জানা যায় একসময় এই মন্দির ছিল পুরোপুরি পলসাঁই বংশেরই। পরে রসকুণ্ডু গ্রামবাসীদের অধীনে আসে। কিন্তু পুজোর দায়িত্ব পান ঐ পলসাঁই বংশ। পুজোর দায়িত্ব ছাড়াও এখনো মন্দিরের একটা অংশ পলসাঁইদের অধীনে আছে। গাজন মেলার মূল দায়িত্ব পালন করেন যখন যিনি বাবা বসন্তরায়ের নিত্য পূজার দায়িত্বে থাকেন। বর্তমানে বাবা বসন্ত রায়ের পূজারি বা সেবাইত আছেন মৃণালকান্তি পলসাঁই। তিনি বসন্ত রায় জীউ এর পুজো যেমন করেন তেমনই অদূরেই আছে শ্রী শ্রী শ্যামামায়ের মন্দির তারও পুজো করেন। শিবের পাশাপাশি তাই শক্তিদায়িনী দেবী কালী মাও বিরাজ করছেন। একই সঙ্গে শিব ও শক্তির আরাধনা চলে এই বসন্ত রায়ের মন্দির চত্বরে। শিব ও শক্তির একটি অপূর্ব মিলন স্থল হিসাবেই গণ্য এই রসকুণ্ডু অঞ্চলটি।  

   রসকুণ্ডুতে বাবা বসন্ত রায় জীউ এর আবির্ভাব কখন ঘটেছিল তা সঠিকভাবে জানা যায়নি অনুমান করা হচ্ছে প্রায় চারশো থেকে সাড়ে চারশো বেশি সময় ধরে বাবা দেবাদিদেব মহেশ্বর এখানে পূজিত হচ্ছেন। তা যাই হোক বাবা বসন্ত রায়ের মন্দির অনেক প্রাচীন। আর সুদীর্ঘকাল ধরে এখানে গাজন মেলাও অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এখানকার গাজনের নিয়ম-নীতি আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে অনেক কথাই জানালেন মন্দিরের বর্তমান পুরোহিত শ্রী মৃণালকান্তি পলসাঁই মহাশয়। রসকুণ্ডুর গাজন মেলার ঢাকের কাঠি পড়ে যায় ঘেঁটু সংক্রান্তি থেকেই। চৈত্র মাসের ২১ কিংবা ২২ তারিখে শনিবার বা মঙ্গলবার দেখে  কামিল্যা পূজার ঘটস্থাপন শুরু হয়। চলতি কথায় যাকে ক্যামলা উঠা বলে। এটাই গাজনের সূচনা। এরপর ২৫ শে চৈত্র একজন বাবার পাটভক্ত হন। তারপরে ২৭ শে চৈত্র দেউল ভক্ত হন। পাটভক্ত যিনি হন তাঁর গলাতে উত্তরীয় প্রথমেই পরিয়ে দেওয়া হয় না। সেটা সংকল্প করে তুলে রাখা হয়। এর কারণ হচ্ছে এখানে বসন্ত রায় জীউ-এর গাজনে অসংখ্য সাধারণ ভক্ত হন। সাধারণ ভক্তদের আবার অনেকেই এখানে উত্তরীয় নিয়ে তাঁরা পছন্দমতো নিজের এলাকায় অন্য কোনো শিবের মন্দিরে ভক্ত হয়ে থাকেন। এবং সেখানকার নিয়ম-নীতি-আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। এদের মধ্যে আবার কেউ কেউ নিয়ম ভঙ্গের দিন এখানে এসে পুরোহিতের মাধ্যমে গলার উত্তরীয় খুলে দেন। পাট ভক্ত হওয়ার পর থেকে সাধারণ  ভক্ত হওয়ার ভিড় পড়ে যায়। তাঁরা সকলেই নিজের নিজের গোত্র ছেড়ে শিবগোত্র ধারণ করেন। সকলের গলায় থাকে উত্তরীয়, পরনে ধুতি এবং হাতে বেতের তৈরি লাঠি। ২৮ চৈত্র সবশেষে হন রাজার ভক্ত। এই রাজার ভক্ত যারা সাধারণ ভক্ত হতে ইচ্ছুক থাকেন সকলকে ডেকেডুকে নিয়ে  বাবার মন্দিরে হাজির করান। রাজার ভক্ত একবার হয়ে গেলে আর সে বছর কোনো সাধারণ ভক্ত হওয়া যাবে না এটাই এখানকার নিয়ম। রাজার ভক্তই শেষ ভক্ত হিসাবে গলায় উত্তরীয় পরিধান করেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে এই বাবা বসন্ত রায়ের গাজন মেলায় চার রকম ভক্ত থাকেন। তাঁরা হলেন পাটভক্ত, দেউল ভক্ত, রাজার ভক্ত এবং সাধারণ ভক্ত। 

   গাজনকে কেন্দ্র করে বিশেষ কিছু  ক্রিয়াকলাপ ও আচার অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এগুলো এখানে পালন করতেই হবে। এটাই এখানকার নিয়ম। প্রথম দিন আলম কাটা। এই আলম কাটা ঘটকদের বাড়ির কাছে বলা যেতে পারে বাবার নিজস্ব যে পুষ্করিণী বা বড়ো দিঘিটি আছে তার বায়ু কোণে একটি বাঁশঝাড় আছে সেখানে গিয়ে একটি বাঁশ কাটা হয়। সেই বাঁশটির মাথায় গাজনের পতাকা বাঁধা হয়। সেই পতাকা বাঁধা বাঁশটি নিয়ে ভক্তরা বাদ্যবাজনা সহযোগে নাচ করতে করতে মন্দিরে নিয়ে আসেন। এটি পুজো দিয়ে  মন্দিরের এক কোণে ঠেসিয়ে রাখা হয়।  একে বলে আলম কাটা। ওইদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে সূর্যপূজা হয়। তারপরে হয় হরগৌরীর পুজো। সারি সারি ভক্তরা বসে পড়েন। মন্ত্র উচ্চারণ করেন। হরগৌরী পূজা শেষে হ্যাদোলা শুরু হয়। মনের মধ্যে অনির্বচনীয় এক আনন্দ নিয়ে ভক্তদের অনেকেই সেই হ্যাদোলাতে দুলতে থাকেন। রাত বারোটায় ওইদিনের গাজন শেষ হয়। 

   পরের দিন হল গামার কাটার পালা। রসকুণ্ডু গ্রামের উত্তর পাড়ায় আছে একটি গামার গাছ। ভক্তরা সেখানে যান । গামার গাছের একটি ডাল কেটে তাকে পতাকার মতো করে নিয়ে আসেন মন্দিরস্থলে। এদিনও আগের দিনের মতো সূর্য পূজা হয়। হরগৌরীর পুজো শেষে ভক্তরা হ্যাদোলাতে দুলে আনন্দ উপভোগ করেন। পরের দিন মেল ও রাত গাজন। মেল বলতে বোঝায় শিবের মাথায় জল ঢালা। রসকুণ্ডু গাজনে মেল ও জলঢালা একটা বিরাট ব্যাপর। জলঢালাকে ঘিরে ব্যাপক আনন্দ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায় এদিন মন্দির স্থলে। ভক্তদের জলঢালা তো আছেই সেইসঙ্গে আশেপাশের গ্রামগুলি থেকে বাবার মাথায় জল ঢালতে আসেন পুণ্যার্থীরা। মহিলা পুণ্যার্থীর সংখ্যা চমকে দেওয়ার মতো। দেবাদিদেব মহাদেব বাবা বসন্ত রায়ের একটুখানি কৃপা ও দয়া লাভের আশায় পুণ্যার্থীদের ছুটে আসা। সংসারের সুখ-শান্তি লাভ, সন্তানের মঙ্গলকামনা করেন শিবের কাছে। এদিন প্রথমে পুরোহিত, ভক্তরা জল ঢালেন। তারপর সাধারণ ভক্ত ও সাধারণ পুণ্যার্থী। জল ঢালাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ভিড় ও জমায়েত লক্ষ্য করা যায়। একেবারে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট পথ আছে সেই পথ দিয়ে শিবের মাথায় ঢালা ঘটি ঘটি জল বেরিয়ে যায়। ভক্ত ও পুণ্যার্থীরা শ্রদ্ধাবনত চিত্তে, শুদ্ধ বস্ত্র পরে ঘটি ভরে জল নিয়ে এসে বাবর মাথায় ঢালেন। মন্দিরের পিছনে উত্তরদিকে ৫০ মিটার দূরে বাবার নিজস্ব পুষ্করিণী আছে সেই পুকুর থেকে স্নান করে জল নেন ভক্তরা। সকাল থেকেই ভিড়ে ঠাসা হয়ে যায় মন্দির চত্বর। মেলের দিনই রাত্রিতে রাত গাজন। বিকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় সূর্যপূজা। তারপর হরগৌরীর পূজা। রাত দশটার পর থেকে আদাগা ভক্তদের দাগার কাজ শুরু হয়। আদাগা ভক্ত বলতে যারা এর আগে কোথাও কোনো শিব মন্দিরে ভক্ত হয়নি। এই প্রথম ভক্ত হয়েছে। তাদের দাগা হয়। কাকেও আমপাতা গরম করে দাগা হয়, কাউকে গরম ধুনোচুর দিয়ে দাগা হয়। যে যেমনটি চায় সেই মতো দাগা হয়। দেগে দেওয়া ভক্তদের মাথা ঢেকে মন্দিরের চারপাশ ঘোরানো হয়। ভক্তের বাড়ির লোকজন বা তার আত্মীয় স্বজনেরা এই ভক্ত ঘোরানোর কাজটি করে থাকেন।

   ভক্তরা এরপর হ্যাদোলাতে দুলতে থাকেন। মাথা নিচু করে উপর দিকে পা বেঁধে হ্যাদলা দুলানো। নিচে ধুনোর আগুন জ্বলতে থাকে। অনেকে হ্যাদোলা দুলতে ভীষণ পছন্দ করেন। হ্যাদোলা থেকেই নামতেই চান না। অনেকে আবার ভয়ে কুঁকড়ে যায়। ওদিকে মহাদেবের ষোড়শপোচারে ব্যস্ত থাকেন পুরোহিত মশাই। ‘জয় বাবা বসন্ত রায়’, ‘বাবা বসন্ত রায়ের চরণে সেবা লাগে-মহাদেব’ এই সব জয়ধ্বনিতে সারা গাজন মেলা প্রাঙ্গণ সরগরম হয়ে উঠে। রাত তিনটা পর্যন্ত এই রাত গাজন চলে। একই সঙ্গে চলে ধুনুচি নাচ। এই গাজনের ক’টা দিন প্রতিটি ভক্তকেই হবিষ্যান্ন রান্না করে খেতে হয়। নিজের হাতেই মাটির সরা বা  মাটির হাঁড়িতে এই রান্না করতে হয়। মেলের দিন সন্ধেবেলা আর একটা অনুষ্ঠানের রীতি আছে যা চিরাচরিত প্রথা হিসাবেই পালন করে আসা হচ্ছে। তা হল কোনো জিওল মাছ বিশেষ করে মাগুর মাছ এনে তার পুজো দেওয়া হয়। এবং এই মাছটি নির্দিষ্ট একটি যন্ত্র আছে মন্দিরের সেখানে বিশেষ পদ্ধতিতে রাখা হয়। এমনভাবে রাখা হয় যাতে মাছটি মরে না যায়। এই মাছটি বিশেষ একজন জেলের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় যিনি একডুবে এই মাছটি পুকুর বা খাল-নদী থেকে ধরে এনেছেন। মাগুর মাছ না পাওয়া গেলে অন্য কোনো জিওল মাছ  ধরে আনা হয়। রাত গাজনের দিন রাত্রিবেলা বাজি পোড়ানো হয় নির্দিষ্ট দিঘিতে। পাশের রাজ্য ওড়িষ্যা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বাজি কারিগররা আসেন এবং বাজি খেলার কেরামতি দেখান। প্রতিযোগিতা ভিত্তিক এই বাজি পোড়ানো হয়। উড়িষ্যা ছাড়াও হুগলী জেলার কয়াপাট, বদনগঞ্জ, ফুলুই, তাতারপুর প্রভৃতি গ্রাম থেকেও অনেক বাজি কারিগররা এসে থাকেন এবং বাজি পোড়ানো প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। আসাবধান হলে বিপদও ঘটতে পারে।  

    রাত গাজন শেষে আসে দিন গাজন। দিন গাজন শুরু হয় আগুন সন্ন্যাস দিয়ে। আগুন সন্ন্যাসও একটি মজার অনুষ্ঠান। শ্মশানে যাদের দাহ করা হয় সেখানে অনেক আধপড়া কাঠ বা অব্যবহৃত কাঠ পরে থাকে। সাহসী ভক্তরা সেই কাঠ নিয়ে এসে কামদেবকে স্মরণ করে তাকে দাহ করা হয়। রীতিমতো চিতা সাজানো হয়। সেই চিতার আগুনকে সামনে রেখে ঢাক ও নানারকমের  বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়। বিশেষ করে ঢাকিরা ঢাকের মাধ্যমে নানারকম ক্রিয়াকৌশল প্রদর্শন করতে থাকে। গাজনের মূল বাজনা হল এই ঢাক। কোনও বাজনা না হলেও চলবে কিন্তু ঢাক থাকতেই হবে। ঢাকের তালে তালে ভক্তবৃন্দের দল সেই চিতার আগুনকে নিয়ে খেলা করতে থাকে। কেউ গনগনে আগুন কাঠের অঙ্গার হাতে নিয়ে নানান কসরত করতে থাকে, কেউ গনগনে অঙ্গার দিয়ে হাঁটতে থাকে। সে এক মজার আগুন সন্ন্যাস খেলা। আগুন সন্ন্যাস শেষ হয়ে গেলে প্রতিদিনকার মত বিকালে পুজোয় মত্ত হয়। হরগৌরীর পুজো শেষে ভক্তেরা বাবার পুকুরে স্নান করে প্রণাম সেবা খাটে, যাকে দন্ডি কাটা বলে। দন্ডি কাটার সময় সে এক বিরাট ব্যাপার। পুরো মন্দির চত্বরে হুলস্থুল পড়ে যায়। ঢাক অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র তুমুলভাবে বাজতে থাকে। হরগৌরীর মন্দির ও বাবা বসন্ত রায় মন্দিরকে মাঝে রেখে তিনবার প্রদক্ষিণ করে প্রণাম সেবা খাটা ভক্তবৃন্দের দল। ভক্তদের অনেকেই খুব তাড়াতাড়ি এই কাজটি শেষ করে। অনেকে প্রণাম সেবা খাটতে খাটতে রাস্তার মধ্যে শুয়ে থাকে উঠতে চায় না। অনেকে ঢাক ও অন্যান্য বাজনার সঙ্গে সঙ্গে বিভোর হয়ে নাচতে থাকে নাচতেই থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত সকল ভক্তবৃন্দের দন্ডি খাটা বা প্রণাম সেবা খাটা শেষ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত গাজনের অন্যান্য পুজোর কাজ শুরু করা যায় না। তাই কমিটির তরফ থেকে তাড়া দেওয়া হয় যাতে ভক্তবৃন্দ প্রণাম সেবা খাতার কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করেন। ভক্তদের প্রণাম সেবা খাটা শেষ হলে তাঁরা আবার পুকুরে স্নান করে ঘটি ভরে জল নিয়ে বাবার মাথায় ঢালেন। এরপর পুরোহিত তাঁকে স্নান জল খাওয়ান। এরপর মন্দিরের কাউন্টার থেকে গুড় ছোলা সংগ্রহ তা খেয়ে নিয়মভঙ্গ করেন। এইদিন রাত্রে ভক্তরা নিরামিষ রান্না ভাত খান। এইভাবে দিন গাজন শেষ হয়। এইদিনটি হল ৩০শে চৈত্র। পরের দিন ১লা বৈশাখ নতুন বছরের দিন ভক্তরা দাঁড়ি কেটে, গায়ে হলুদ মেখে স্নান করেন। এই দিন হয় আঁশ পাটনা। মন্দিরের নিজস্ব ব্যবস্থায় সমস্ত ভক্তকে মাছ রান্না ভাত খাওয়ানো হয়। রসকুণ্ডু গ্রামবাসী বিশাল এই কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেন। বিপুল সংখ্যক ভক্তকে মাছ ভাত খাওয়াতে প্রায় ৪০ কুইণ্ট্যল মাছ লাগে। এই এত পরিমাণ মাছ বাবার নিজস্ব পুকুর থেকে ধরা হয়। অন্য জায়গা থেকেও কিছু কেনা হয়। বেলা পাঁচটার মধ্যে ভক্তদের খাওয়ানোর কাজ শেষ হয়। আর খাওয়ানো শুরু হয় বাবা বসন্ত রায়ের পুজোর পর পরই। ভক্তরা যখন খেতে বসেন তখনই পুরোহিত মশাই নিজে গিয়ে ভক্তদের গলা থেকে উত্তরীয় খুলে নেন। সঙ্গে সঙ্গে ভক্তরা পুনরায় শিবগোত্র ত্যাগ করে নিজ নিজ গোত্রে ফিরে যান। এইভাবে শেষ হয় বাবা বসন্তরায় জীউ-এর গাজন পর্ব।  

   এত বড়ো মেলা। এত ভক্ত, এত লোকজন। সবকিছু সামাল  দেওয়া হয় কী করে? আর এত আর্থিক ব্যয়ভারই বা বহন করে কে? খোঁজ নিয়ে জানা গেল এখানে একটি ট্রাস্টি বোর্ড তৈরি করা হয়েছে। সেই ট্রাস্টি বোর্ডের তিনবারের প্রাক্তন সম্পাদক অরুণকান্তি ভুঁইয়া, বর্তমান সম্পাদক শ্রী সমীর, এখানকার শ্রী শ্রী শ্যামামায়ের সেবিকা কল্যাণী মা, ট্রাস্টি বোর্ডের প্রাক্তন সদস্য সত্যসাধন চৌধুরী এবং পুরোহিত ত্রিপুরানন্দ পলসাঁই জানালেন সেই ট্রাস্টি বোর্ডই মন্দিরের যাবতীয় বিশাল কর্মকাণ্ডকে সুষ্ঠু ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করে থাকেন। এই ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান সদস্য সংখ্যা মোট তেরো জন। ১২ জনকে মনোনীত বা নির্বাচিত করা হয়। একজনকে রসকুণ্ডু গ্রামবাসীরা ঠিক করেন। এই বোর্ডের মেয়াদ তিন বছর। তিন বছর ছাড়া ছাড়া বোর্ডের সদস্যদের পরিবর্তন করা হয়। সদস্যদের মধ্য থেকে সম্পাদক, সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ ঠিক করা হয়। বর্তমান বোর্ডে অর্থাত্‍ ২০২৬ সালে সভাপতি আছেন বাদল দাস, সম্পাদক হলেন সমীর বারিক এবং কোষাধ্যক্ষ আছেন রাজীব ভুঁইয়া।  রসকুণ্ডু গ্রামে আছে ছয়টি পাড়া। জানপাড়া, ঘটকপাড়া, বারিকপাড়া ,দক্ষিণপাড়া, উত্তরপাড়া এবং পশ্চিমপাড়া। প্রতি পাড়া থেকে দু’জন করে সদস্য নেওয়া হয়। রসকুণ্ডু বোর্ডের সদস্য ছাড়াও রসকুণ্ডু গ্রামবাসীরাও মেলাটিকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। 

   আরও জানা গেল মন্দির চত্বর এবং পুষ্করিণী এইগুলি ছাড়া মন্দিরের আয়ের উত্স তেমন নেই। এখানে সারা বছর ধরে যে সকল পুণ্যার্থী ও ভক্তরা আসেন তাঁরা ভক্তিভরে যা দেন এবং প্রণামী দেন তাতেই চলে যায়। এখানে পুণ্যার্থীদের আসার ভিড় এই কারণে হয় বাবা খুব জাগ্রত। বাবার স্বপ্ন দেওয়া বাতের ওষুধ আছে এখানে। যে সকল রোগী বাতের ব্যথায় ভুগছেন তাঁরা এসে বাতের ওষুধ নেন। সে ওষুধ গায়ে মাখতে হয়। ভক্তদের বিশ্বাস এখানকার ওষুধে বাত সেরে যায়। বাতের ব্যথায় আক্রান্ত রোগীদের এখানে রেখেও চিকিত্‍সা করা হয়। রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য বেশ কয়েকজন সেবিকাও আছেন। তাঁদের মাসি বলে সবাই ডাকেন। ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান সম্পাদক শ্রী সমীর রঞ্জন বারিক মহাশয় জানালেন এখানে বাতে আক্রান্ত রোগীদের সেবা করার জন্য ৮৫ জন মাসি রয়েছেন। প্রতিদিনই প্রায় দশ থেকে বারো জন বাতের রোগী ভর্তি হন। এক সপ্তাহ এখানে থেকে চিকিত্‍সা পরিষেবা পাবার জন্য রোগীদের মাত্র ৯০০ টাকা দিতে হয়। তার মধ্যেই রোগীদের থাকা, ওষুধ এবং মাসিদের সাম্মানিক দেওয়া হয়।  রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে যান, আবার নতুন রোগী ভর্তি হন। সুস্থ হচ্ছেন বলেই তো আসেন নইলে তাঁরা আসবেন কেন। বাবার দেওয়া ওষুধে সুস্থ হয়ে আমলাগোড়া শ্রী গোপীকিষাণ ইঞ্জিনিয়ারিং প্রাইভেট লিমিটেড এর পরিচালক শ্যামসুন্দর কাজোরিয়া  বাবার মন্দিরের সামনে ভক্তবৃন্দের সুবিধার জন্য নিজ ব্যয়ে একটি সুদৃশ্য নাট মন্দির নির্মাণ করে দেন। সেটা ১৯৭৫ সালের কথা। অনেক বাতের রোগী ভালো হয়ে মানত করেন এখানে গাজন মেলায় ভক্ত থাকার। গাজনের সময় ভক্ত হয়ে তাঁরা সে মানত পরিশোধ করেন। গাজন মেলায় এত সংখ্যক ভক্ত বা সন্ন্যাসী হওয়ায় এটাও একটা অন্যতম কারণ। ২০২৫ সালের শ্রাবণ মাস থেকে বসন্ত রায় জীউ মন্দিরে অন্নভোগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেসকল ভক্তরা এখানে পুজো দিতে আসেন তাঁরা ৪০ টাকার বিনিময়ে এই অন্নভোগ পাবেন। কাউন্টার থেকে সেজন্য টিকিট কেটে নিতে হয়। ভক্তরা যাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জায়গায় বসে  অন্নভোগ খেতে পারেন তারজন্য বিরাট এক পান্থশালা ও রন্ধন শালা নির্মাণ করা হয়েছে। এই নির্মাণ কাজ এখনো চলছে। নাম দেওয়া হয়েছে অন্নপূর্ণার মন্দির। সবে মিলে বাবা বসন্ত রায় জীউ-এর মন্দির এখন জমজমাট। এখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন সবই বাবার কৃপাতেই সুসম্পন্ন হচ্ছে। বেঁচে যাক বাবার প্রতি মানুষের এই বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভক্তি। দেবাদিদেব বাবা বসন্ত রায় জীউ-এর চরণে প্রণাম।  “বাবা বসন্ত রায়ের চরণে সেবা লাগে – মহাদেব-।” 

ঋণ স্বীকার :-

১. মৃণালকান্তি পলসাঁই (পুরোহিত-বাবা বসন্ত রায় জীউ মন্দির)।

২. অরুণকান্তি ভুঁইয়া (প্রাক্তন সম্পাদক-বাবা বসন্ত রায় জীউ ট্রাস্টি বোর্ড)।

৩. সমীর রঞ্জন বারিক ( বর্তমান সম্পাদক-বাবা বসন্ত রায় জীউ ট্রাস্টি বোর্ড)।

৪. সত্য সাধন চৌধুরী ( প্রাক্তন সদস্য–বাবা বসন্ত রায় জীউ ট্রাস্টি বোর্ড)।

৫. ত্রিপুরানন্দ পলসাঁই  (পুরোহিত-বাবা বসন্ত রায় জীউ মন্দির)

৬. তুলসীদাস মাইতি (সম্পাদক-টেরাকোটা)

৭. কাঞ্চন পাল (গীতি অর্ঘ্য : নম:বাবা বসন্ত রায় )

৮. প্রশান্ত পাল ( প্রবন্ধ – ‘শিব শক্তি ধাম-রসকুণ্ডু’)

৯. কল্যাণী মা (সেবিকা -শ্রী শ্রী শ্যামা মায়ের মন্দির) 

ছবি ঋণ : সুমন ভুঁইয়া (শিক্ষক-রসকুণ্ডু)

                 ................................ 


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

প্রচ্ছদ - বিশ্বজিৎ ভৌমিক

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


Sunday, 29 December 2024

অমৃত মাইতি এর গদ্য // ই-কোরাস ১০৮

 



আমি এক নদী

অমৃত মাইতি


আমি এক আঁকাবাঁকা নদী। জন্মের পর থেকেই শুধু বাধা বাধা আর  বাধা। বাধার পাহাড় বেরিয়ে আমি কিন্তু এগিয়ে যাচ্ছি মোহনার দিকে। আমার সিদ্ধান্ত নির্ভুল। বাধা পেয়ে আমি বিচলিত হই না। অনতিক্রম্য হলে আমি আমার পথ ঘুরিয়ে নিই লক্ষ্যবস্তু কিন্তু ঠিক থাকে। চলার পথে আমার কৌশল বদলাতে হয়। কিন্তু মোহনায় যাওয়ার স্থির সিদ্ধান্ত আমি বদলাই না। বাধা পেলে আটকে যাই না। কৌশল বদলাই ঠিকই কিন্তু কৌশলটা আমার শেষ কথা নয়। আমার শেষ কথা মোহনায় যাওয়া। আঁকাবাঁকা পথে মনে হয় আমি বোধহয় কোথাও হারিয়ে গেছি। কিন্তু না। আমার সঙ্গে এগোতে থাকো দেখবে আবার বাঁক নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি সামনের দিকে। চপলমতি মানুষ আমাকে ভুল বুঝতে পারে। বাঁক নেওয়ার সময় মনে  হতে পারে আমি হারিয়ে গেছি। পরক্ষণে তুমি দেখবে তোমার ভুল ভেঙ্গে গেছে। আমি কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার জন্য জন্মাইনি। নদীর স্থবিরতা তার কলঙ্কময় জীবন। গতিময় নদী তার বৈশিষ্ট্যকে ধরে রাখে। সে কিছুতেই শ্যাওলা জমতে দেয় না তার দেহে। শ্যাওলা জমে যাওয়া তার সৃষ্টির অসম্মান। শ্যাওলা শরীরকে অসুস্থ করে দেয়। তার গতিপথ সমাজদেহ ভূমিপৃষ্ঠ তার বক্ষস্থল । তার অবলম্বন। বালি মাটি কাঁকর পাথর ভাঙ্গা নুড়ি নদীর অলংকার। নদীর দুই পাড়ে সবুজ বনানী জনপদ জনতার আদালত তার পাহারাদার। আমি এমনি এক নদী কখনো আমার ভাঙ্গনের রুপ দেখে মানুষ মনে করে এই বুঝি নদী হারিয়ে গেল অন্য পথে। সজাগ জনপদ সজাগ জনতা ঠিক আমার পাশে সতর্ক প্রহরার মতো আমাকে সঠিক রাস্তায় প্রবাহিত করার শত চেষ্টা তাদের। কত অন্ধকার রাত্রি নক্ষত্র তাকিয়ে থাকে নদীর দিকে। বেগবতী নদী সব দেখে। নদীর নির্ঘুম রাত কাটে অমাবস্যার সৌন্দর্য আর তার শরীরের ঢেউ গুনতে গুনতে। রাতের স্নিগ্ধ বাতাস আর ভাটিয়ালি সুরে মাঝির গান নদীকে পাগল করে দেয়। নদী যেন নান্দনিক তত্ত্বের জন্মদাত্রী। বুড়িগঙ্গা থেকে বরিশালের পথে লঞ্চের ডেকে বসে বসে রাতের গঙ্গার মোহিনী রূপ আর দুই তীরের অপরূপ রূপে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। নিজেরই অজান্তে কখনো নদী হয়ে যাই । মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনটা  সত্যিই যদি নদী হয়ে যায় তাহলে এক আদর্শ জীবনের খোঁজ পাই।নদীকে অস্বীকার করে না কেউ ,যদিও সে হারিয়ে যায় মোহনায় । কিন্তু উৎসকে অস্বীকার করা মুর্খামি এবং স্থূল-বুদ্ধির পরিচয়ক। মোহনাও জানে তার সমস্ত নির্জনতা নদীর সঙ্গমস্থল। আমি এখন মোহনায় যাব সেখানে কি সীমাহীন নির্জনতা। মোহনা আমাকে হাতছানি দিচ্ছে। মোহনা আমাকে ডাকছে তার সীমাহীন সৌন্দর্য আর নির্জনতায় ভরিয়ে দিবে আমাকে। জীবনানন্দ তখন আমাকে কানে কানে বলে,"তুমি জল, তুমি ঢেউ -সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন /তোমার দেহের বেগ তোমার সহজ মন/ভেসে যায় সাগরের জলে আবেগে"।

সেদিন রাতের অন্ধকারে জল আর ঢেউ ভালবেসে লঞ্চে উঠেছিলাম।"তোমাকে কে ভালবাসে,তোমারে কি কেউ/বুকে ধরে রাখে/জলের আবেগে তুমি চলে যাও/জলের উচ্ছ্বাসে পিছে ধুধু জল তোমারে যে ডাকে/। আমি তখন তাকিয়ে বরিশালের দিকে। হয়তো বরিশালও আমার দিকে তাকিয়ে আছে আপ্যায়নের জন্য।যেন " নিশীথের বাতাসের মতো/একদিন এসেছিলে,/দিয়েছিলে এক রাত্রি দিতে পারি যত"/কেবিনে গিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করি।"ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে"।"ওইদিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর"। আদিম রাত্রির ঘ্রাণ/বুকে লয়ে অন্ধকারে গাহিতেছে গান"। ইচ্ছে তো জাগেই নদী হয়ে যেতে।"ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকব-ধীরে ধীরে পৌষের রাতে-কোনদিন জাগবো না আর/কোনদিন জাগবো না আমি কোনদিন আর"।

আমিও মনে করি আমি নদীর মত। আমিও নদী ভালবেসে তার জল আর ঢেউ ভালোবেসে নিজের শরীরটাকে ভেঙ্গে চুরে তার সমস্ত গুণাবলী গায়ে মেখে নিয়ে নদী হয়ে যাই।


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৩

  দেউলতলার গাজন সায়ন সামন্ত  History is always written by the winners। ইতিহাস নিয়ন্ত্রিত হয় বিজয়ীদের হাতের ইঙ্গিতে। অথচ যারা নিম্নবর্গীয়...