দেউলতলার গাজন
সায়ন সামন্ত
History is always written by the winners। ইতিহাস নিয়ন্ত্রিত হয় বিজয়ীদের হাতের ইঙ্গিতে। অথচ যারা নিম্নবর্গীয়, যারা অন্ত্যজ তাদের ইতিহাস লেখার জন্য বারংবার রনজিৎ গুহরা এই পৃথিবীতে আসেননা। তাঁদের লোক কথা, লোক শিল্প, লোক উৎসবের কাহিনী শুধুমাত্র লোক মুখেই প্রচলিত হতে থাকে। বাংলায় এমনই কিছু লোক উৎসবের উল্লেখ শাস্ত্রে থাকলেও এমন বেশ কিছু লোক উৎসব রয়েছে যেগুলির উল্লেখ শাস্ত্র গ্রন্থে মিলবে না। যেমন 'অম্বুবাচী' কিংবা 'নবান্ন' শাস্ত্রে উল্লিখিত হয়েছে, কিন্তু আশ্চর্যের, একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর জীমূতবাহনের 'কালবিবেক', পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচিত বৃহস্পতি রায়মুকুটের 'স্মৃতি রত্নহার', ষোড়শ শতাব্দীর গোবিন্দানন্দ কবিকঙ্কণাচার্যের 'বর্ষক্রিয়া কৌমুদী' কিংবা ষোড়শ শতাব্দীর রঘুনন্দনের 'তিথিতত্ত্বে' 'চড়ক' বা 'গাজনের' নাম উল্লিখিত হয়নি। এই লোক উৎসবগুলির মধ্যে গাজন অথবা চড়কের দিকে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি তবে দেখতে পাবো শুধুমাত্র বাংলায় বা এই দেশ ভারতবর্ষে গাজনের শিকড় সীমাবদ্ধ নয়। গ্রিস দেশে Bachchu দেবকে বলা হত Dionysus। এই দেবতার গাজন অনুষ্ঠিত হতো। মিশরে লিঙ্গদেব আসীরসকে গাজন উপলক্ষে ৩৮০ কলসি দুধে স্নান করানো হত। প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তরে হেব্রিদিস দ্বীপপুঞ্জে Bunlap নামে যে দ্বীপের অবস্থিতি, সেখানে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির ১৫ থেকে ১৮ এই চারদিন ৭০ ফুট উচ্চ মঞ্চ থেকে যে ঝাঁপ দেওয়ার রীতি, তার সাথে আমাদের গাজনের সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। তাই এই উৎসবের ব্যাপকতা ও পরিধি একে একটি বহুমাত্রিক উৎসবে পরিণত করেছে।
গাজন শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানান মতভেদ রয়েছে। গাজন যাঁদের মতে শিবের বিবাহোৎসব তাঁদের মতে ভক্ত্যারা হল শিবের বিবাহের বরযাত্রী। তাদের সমবেত গর্জন থেকেই নাকি 'গাজন' শব্দটির উদ্ভব। আবার কেউ বা বললেন গাঁ জনের উৎসব বলেই 'গাজন'। গাজন শিবের বিবাহোৎসব, কারো মতে এটি একটি কৃষিকেন্দ্রিক উৎসব যে উৎসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাদুক্রিয়া এবং Fertility cult। কারো মতে তথাকথিত অন্ত্যজদের উৎসব, 'দরিদ্রের মহোৎসব', কারো মতে বর্ষশেষে সৌরচক্রের সমাপ্তির দ্যোতক। নানা বিষয়ে মতভেদ থাকলেও দুটি বিষয়ে ঐকমত্য পরিলক্ষিত হয়-তা হল চড়ক কিংবা গাজন, গম্ভীরা কিংবা বোলান যাই হোক না কেন, তা শিবকেন্দ্রিক। এসব লোকোৎসবের কেন্দ্রে রয়েছেন শিব। দ্বিতীয়ত চড়ক অথবা গাজন যাই বলি না কেন মূলত এই উৎসবের অংশগ্রহণকারীরা হল তথাকথিত অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ। আজও গ্রাম বাংলা থেকে শহরতলী মহা সমারোহে গাজন উদযাপিত হয়। তবে এলাকাভেদে, স্থানভেদে এই গাজন উদযাপনের নিয়মের কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। বাংলায় মেদিনীপুরের কেশপুর এলাকার চিত্রটিও খানিক এমন। জেলার বিখ্যাত কিছু গাজন অনুষ্ঠিত হয় এই এলাকায় এবং তার মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট বর্তমান আনন্দপুর থানার কানাশোল গ্রামের ঝাড়েশ্বর মন্দিরের গাজন।
মেদিনীপুরের আনন্দপুর থানার কানাশোলে ঝাড়েশ্বর শিবের প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের প্রাচীন মন্দির রয়েছে। প্রাচীন টেরাকোটার মন্দিরটি ভীষণ দৃষ্টিনন্দন। নাড়াজোল এর রাজা অযোধ্যারাম খানের দেওয়ান রামনারায়ন জানা এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। লোকশ্রুতি আছে- মন্দির প্রতিষ্ঠার পূর্বে এইখানের জঙ্গলে এক কৃষ্ণ গাভী বটগাছের নিচে এক জায়গায় রোজ দুধ দিত। এক রাখাল বালক সেটি দেখতে পায়। ঠিক ওই দিন রাত্রে ব্রাহ্মণভূমের রাজা আলাল দেব, ওই গাভীর মালিক এবং আড়িয়াদহের শীতলানন্দ মিশ্র তিনজনই স্বপ্নাদেশ পান! ওই বটগাছের নিচে রয়েছে অনাদি লিঙ্গ। সেই লিঙ্গ কে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নাদেশ পেয়ে বট গাছের নিচ থেকে লিঙ্গ খনন করা হয় এবং ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দের ভাদ্র মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তে এই প্রাচীন ঝাড়েশ্বরের মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। মূল মন্দিরের পাশে মহাকাল ভৈরবের থান, ভোগ মন্ডপ, নাটমন্দির অবস্থিত। প্রাচীন বটের ছায়ায় প্রাকৃতিক পরিবেশে বাবা ঝাড়েশ্বর অধিষ্ঠান করছেন। মন্দিরের পেছনেই রয়েছে ১৪ একরের এক বিশাল দিঘী যেটি রাজা আলাল দেব খনন করেন। রাজা আলালনাথ দেবের নাম অনুসারে এই বৃহৎ দিঘীটি “আলাল দিঘী” নামে পরিচিত। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভাই নদীয়াল দেব দাদার স্মৃতিতে ওই জলাশয় এর মধ্যে এক মাকডা পাথরের জলহরি মন্দির তৈরি করেন যা বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত। অনাদি লিঙ্গের পেছনের পূর্বপাশে দেওয়ালে অষ্টাদশভূজা মা দুর্গার মূর্তি খোদিত আছে। নাড়াজোল রাজবংশের কুলদেবী ইনি। এটি ৬৭ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি বাঁকানো কার্নিশযুক্ত পঞ্চরত্ন মন্দির। মন্দিরগাত্রে রয়েছে অসংখ্য পোড়ামাটির কাজ। পোড়ামাটির মূর্তিগুলির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, রাধাকৃষ্ণের লীলা, রামায়ণের কাহিনী, দশাবতার, মিথুনদৃশ্য সহ বিভিন্ন পৌরানিক কাহিনী। রোগনিরাময়ের দেবতা বাবা ঝাড়েশ্বর। রোগমুক্তিতে বহু ভক্ত বাবার মন্দিরে তিনদিন নির্জলা উপবাস পালন করে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন এবং কথিত আছে এভাবেই বহু ভক্তের রোগমুক্তি ঘটিয়েছেন বাবা ঝাড়েশ্বর। তবে গাজন শুরুর নিয়মকানুন খানিক আলাদা বাবার মন্দিরে। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রায় দশ থেকে বারো লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় এখানে। প্রায় ১৫ দিন ধরে চলতে থাকে গাজনের অনুষ্ঠান।
চৈত্র মাসের ১৫ তারিখের পর প্রথম শনি অথবা মঙ্গলবারে সূচনা হয় এই উৎসবের। গাজন শুরুর দিনে আয়োজিত হয় একটি সার্বজনীন ভোজ অনুষ্ঠানের। যেখানে কানাশোল গ্রামবাসী প্রায় ২০ হাজার মানুষকে সজনে ডাটার ব্যঞ্জন , মুগ-মুসুর মিশ্রিত ডাল, এবং আলাল পুকুর থেকে সংগৃহিত মাছ সহযোগে ভোজ খাইয়ে থাকেন। ওইদিন রাত্রি ২টোর মধ্যে সমস্ত ভোজন ক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। ভোজন সম্পন্ন হলে ওইদিনই গাজনের ঘট প্রতিষ্ঠা হয় এবং সূচনা হয় গাজনের। গাজনের যেই ঘট প্রতিষ্ঠিত হলো তার নাম ‘শিবকামিন্ন্যা’ অর্থাৎ শিবকে কামনা করে প্রতিষ্ঠিত ঘট। প্রতিষ্ঠিত ঘটের সামনে দুজন মূল সন্যাসী একজন কে বলা হয় ধর্মাধিকারী এবং অপরজন পাট ভক্ত্যা - “আত্ম গোত্র পরিত্যজ্য: শিব গোত্রে প্রবেশিত:” এই মন্ত্র তিনবার বলে নিজ গোত্র পরিত্যাগ করে শিব গোত্রে দীক্ষা নেন। পরদিন সকালে শুরু হয় ‘গাছডাক’ প্রক্রিয়া। মূলত গাজন উৎসবটি এসেছে ধর্মঠাকুরের গাজনকে প্রতিস্থাপিত করে। আগে যা ধর্মের গাজন নামে পরিচিত ছিল এখন সেখানে পালিত হয় শিবের গাজন। এই গাছডাক ধর্মের গাজনের সঙ্গে সম্পর্কিত এর অপর নাম ‘ধর্মের ডাক’। এই প্রক্রিয়ায় হিন্দোলা তলায় বাবা ঝাড়েশ্বর, শিবকামিন্ন্যা ঘট, ধর্মাধিকারী (ধর্ম ঠাকুরের প্রধান সন্ন্যাসী), কাউল লাউসেন (ধর্মমঙ্গল কাব্যের প্রধান নায়ক ও বীরপুরুষ), এবং সত্য, দাপর, ক্রেতা, কলি এই চারযুগের ভক্তবৃদদের কাহিনী ৮৩ কলি ছড়ার মাধ্যমে গেয়ে প্রণাম জানিয়ে তাদের আহ্বান করা হয়। গাছডাক প্রক্রিয়া শেষের পর শুরু হয় হিন্দোলা এবং দন্ডখেলা (ধুনিচি বা লোহার দণ্ডে আগুন নিয়ে এক বিশেষ প্রকারের নাচ)। এইদিন শুধুমাত্র পাট ভক্ত্যা হিন্দোলাতে অংশ নেন। দন্ডখেলা শেষ হলে শুরু হয় ভোগ নিবেদন। ১২ - ১৫ টি ভোগ অর্থাৎ পরপর ১২ - ১৫ দিন মাটির পাত্রে খুন্তির ব্যবহার ছাড়া আতপ চাল এবং গুড় সহযোগে পরমান্ন রন্ধন করে সেই ভোগ অর্পণ করা হয় বাবা ঝাড়েশ্বরকে যা ‘ভোগডাক’ নামে পরিচিত। ভোগ অর্পণের সময় একই প্রকারে ১২ কলির ছড়া গেয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। নিবেদিত ভোগ পাট ভক্ত্যা আলাল পুকুরে বিসর্জন দিয়ে আসে।
পরবর্তী দিনগুলিতে একই রীতিতে চলতে থাকে ভোগ নিবেদন। গাজনের ঘট ডোবানোর আগে প্রতিষ্ঠিত হয় আলাম দন্ড। আলাম প্রকৃতপক্ষে কাপড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন ফুলের নকশাসম্পন্ন এক বস্ত্রখণ্ডবিশেষ। রাঙামাটিতে চাকমা সম্প্রদায়ের লোকেরা বয়ন কর্মে এটি ব্যবহার করে। গাজনে একটি উঁচু বাঁশের মাথায় এই কাপড়খন্ড বেঁধে পবিত্র মন্ত্রচ্চারণে তৈরি হয় এই আলাম দন্ড যা মন্দিরের চুঁড়া লক্ষ্য করে রাখা হয়। পরবর্তী পাঁচদিন ব্যাপী চলতে থাকে ‘গাজনভাঁটা’। অর্থাৎ সন্ন্যাসীরা দল বেঁধে গৃহস্থদের বাড়ি বাড়ি যায় বাদ্য সহকারে। সেখানে গৃহস্থের দেওয়া আল্পনায় পিঁড়ি ও হলুদ জলের উপর রাখে ঘাটে পূজিত বাঁশের পতাকা। যথাসাধ্য মান্য দিয়ে থাকে গৃহস্থ। সেরে ফেলেন নিমন্ত্রণের পালা। তারপর ঠাকুর যাবেন অন্য বাড়ি। ঠিক পাঁচদিন চলবে এই গাজনভাঁটা।
অনুষ্ঠানের মূল পর্ব শুরু হয় ২৬ চৈত্র। এইদিন শুরু হবে বেতভাঙা পর্ব। গাজন উৎসবে বাবা ঝাড়েশ্বরের উপাসনায় যারা যুক্ত হবে তাদের দীক্ষা লাভ হয় এই পর্বে। হবু সন্ন্যাসীকে একদিন নিরামিষ আহার গ্রহণ করে মন্দিরে এসে আলাল পুকুরে স্নান সেরে নতুন বস্ত্র পরে মন্দিরের চারদিকে তিনবার দণ্ডী কেটে আবার স্নান করে মন্দিরের পুরোহিতের থেকে উপবীত ধারণ করেন। উপবীত হলো সাদা সুতোয় কাশ ঘাস বেঁধে বানানো এক বিশেষ মালা। এই মালা গলায় পরে হাতে বেত নিয়ে শিব গোত্রে দীক্ষা নিতে হয়। প্রায় ১৭০০০ সন্ন্যাসী এই পর্বে দীক্ষা গ্রহণ করে প্রতিবছর। সারাদিন নির্জলা উপবাসের পর স্নান সেরে বাবার চরণে অঞ্জলী দিয়ে ফলাহার করেন এরা। এবং শেষ রাতে গ্রহণ করে হবিষ্যি। সবার অলক্ষ্যে মাটির পাত্রে তালপাতা বা পাটকাঠির জ্বালানিতে আতপচাল ফুটিয়ে দুধ এবং গুড় সহকারে খাওয়ায় প্রথা রয়েছে এখানে। সেইদিন থেকে সন্ন্যাসীর পরিবারের অসৌচ থাকলেও সন্ন্যাসীর অসৌচ থাকে না।
২৮ চৈত্র অনুষ্ঠিত হয় ‘কলাকাটা’, ‘কাঁটাঝাপ’। বাবার ভক্তরা চিরদিনই ছন্নছাড়া, জাগতিক নিয়ম তারা মানেন না, সেই অনুসারেই কলার কাঁদি, কাঁঠাল, সজনে ডাটা ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার ফল ও সবজি সহযোগে এক প্রকার নাচ চলতে থাকে যাকে বলা হয় কলাকাটা। তার সঙ্গেই অনুষ্ঠিত হয় কাঁটাঝাপ। বাবলা ও কন্টিকারি জাতীয় কাঁটা গাছ পিঠে মারতে শুরু করে সন্ন্যাসীরা। এও এক প্রকার কৃচ্ছ্রসাধন।
২৯ চৈত্র অনুষ্ঠিত হয় নীল পূজা। কয়েক লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় এই দিন। কুমারী মেয়েরা উপযুক্ত স্বামী লাভের আশায় এবং বিবাহিত মহিলারা স্বামী, সন্তান এবং পরিবারের মঙ্গল কামনায় শিবের মাথায় দুধ, জল, মধু, ঘি ইত্যাদি ঢেলে থাকে। দুপুর ১ টায় মন্দিরে শুরু হয় ধ্বজা বাঁধার আয়োজন। যে সমস্ত ভক্তদের ধ্বজা মানসিক থাকে তাদের নামে সংকল্প করে মন্দিরের চূঁড়ায় পুজো দেওয়া হয় এবং তারপরে মন্দিরের চূঁড়ায় ধ্বজা বেঁধে মন্দিরের সামনের বটগাছে সেই ধ্বজা ছুঁয়ে তা মন্দিরে ভেতরে প্রবেশ করে বাবার মাথায় বাঁধা হয়। এরপর পুনরায় চলতে থাকে জলঢালা এবং পূজো। ওইদিন সন্ধ্যায় আয়োজিত হয় শিবের বিয়ে। শিবায়ন গানের আসর বসে মন্দির প্রাঙ্গণে।
বিবাহ সম্পন্ন হলে আগুন সন্ন্যাসের প্রস্তুতি শুরু হয়। এখানে পালন হয় একটি বিশেষ উপাচার। মন্দিরের ভেতরে মন্দিরের সেবাইত আবির দিয়ে অঙ্কন করেন ‘মেল ঘর’। যে সমস্ত নারীর বিবাহের আট - দশ বছর পরেও সন্তান লাভ হয়নি তারা এই মেল আঁকার দৃশ্য দেখার জন্য মন্দিরে ভিড় করেন। কথিত আছে এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলে নারীরা বাবা ঝাড়েশ্বরের কৃপায় সন্তানলাভ করে। এই ক্ষণে সন্ন্যাসীরা শ্মশান থেকে সংগৃহীত মৃতদেহ পোড়া কাঠ, ফুলঘর, মৃত মানুষের হাড়, খড়, মৃতদেহ পোড়ানোর বাঁশ ইত্যাদি হাতে নিয়ে প্রবল নৃত্য করতে করতে মন্দির সংলগ্ন একটি ফাঁকা জায়গায় গিয়ে উপস্থিত হয় এবং কাঠে আগুন ধরিয়ে উদযাপন হয় আগুন সন্ন্যাস। সন্ন্যাসীদের মধ্যে যদি ওইদিন কেউ মারা যায় তবে তাকেও ওই জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হয়। সন্ন্যাসীদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ একজনকে নতুন শাড়ি, সোলার গয়না পরিয়ে সতী সাজানো হয়। তার হাতে দেওয়া হয় কলসী ভরা ধুনো এবং আম শাখা। তাকে কাঁধে তুলে সন্ন্যাসীরা আগুন সন্ন্যাসের জন্য রওনা হয়। জ্বলন্ত আগুনে সতী হাতে ধরা ধুনোর কলসি নিক্ষেপ করে। প্রাচীনকালে সতীদাহ প্রথার একটি প্রতীকী উদাহরণ এই ধুনো নিক্ষেপ। অপরদিকে এই আগুন সন্ন্যাস চলাকালীন ধর্মাধিকারী ও পাট ভক্ত্যা স্নান করে বাবার মন্দিরে গিয়ে মেলঘরে আঁকা বাবার রূপ প্রথম প্রত্যক্ষ করেন এবং পরমুহুর্তেই সেটি হাত দিয়ে মুছে দেন। আগুন সন্ন্যাস থেকে ফিরে এসে অপর সন্ন্যাসীরা মন্দিরের ওই মুছে যাওয়া মেল ঘর দেখতে পান।
পরের দিন ৩০ চৈত্র, সংক্রান্তির দিন সকালে সন্ন্যাসীরা তেল হলুদ মেখে স্নান সেরে মন্দিরে দণ্ডী কাটার পর নিজদের গলার উপবীত খুলে ঘাটে বিসর্জন দেয়। কিছু বছর আগে পর্যন্ত এই স্থানে চড়ক হতো, কিন্তু বর্তমানে প্রশাসনিক অনুমতি না মেলায় সেটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মেলের দিন থেকেই শুরু হয় গাজনের মেলা, মেলা চলে প্রায় বৈশাখ মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত। ওইদিন বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় শেষ লোকাচার ‘পাটরাকাঠ'। দুটি ইউক্যালিপটাস গাছের দন্ড নিয়ে মাঝে কলাগাছের কান্ডের সাহায্যে খাটিয়া তৈরি করা হয়। খাটিয়ায় কলাগাছের ওপরে ছুরি সদৃশ কিছু শলাকা বসানো থাকে। ওই কলাগাছের ওপর পাট ভক্ত্যা শুয়ে থাকেন এবং ধর্মাধিকারী সঙ্গমের অবস্থানে বসে একটি মিলন দৃশ্য রচনা করেন। শিবকে চিরকাল কৃষিজীবী সম্প্রদায়ের মানুষেরা কৃষি এবং যৌনতার দেবতা হিসেবে পুজো করে এসেছেন। কিন্তু বাবা ঝাড়েশ্বরের গাজন শুধুমাত্র শিবের গাজন নয় এটি শিব এবং ধর্মরাজের গাজনের সম্মিলিত রূপ। মন্দিরের দেওয়ালে আজও মূর্তিরূপে খোদিত আছে সঙ্গমদৃশ। এখানে শিব হয়ে উঠেছেন স্বয়ং Fertility cult। সেই সূত্রেই ঐতিহ্যের এই ধারাকে আজও বয়ে নিয়ে চলেছেন কানাশোল গ্রামবাসীবৃন্দ। গ্রামবাসীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অনুষ্ঠিত হয় গাজন, শিবরাত্রি, শ্রাবণ মাসে জলদানের জন্য আজও মন্দিরে ছুটে আসেন লক্ষ লক্ষ ভক্তবৃন্দ।
কানাশোল ঝাড়েশ্বর মন্দির থেকে 10 মাইল পূর্বে কেশপুরের নেড়াদেউল গ্রামে অবস্থিত কামেশ্বর মন্দির। ঝাড়েশ্বর মন্দিরের সঙ্গে কামেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের ব্যাপক মিল রয়েছে। ষোল শতকের শেষের দিকে রাজা উমাপতি রায় ভট্টদেব এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। উমাপতি কামেশ্বর শিব লিঙ্গের সন্ধান পেয়েছিলেন স্বপ্নে। তখন ব্রাহ্মণভূম পরগনার এই অঞ্চলে লাটা জঙ্গল ছিল। অদ্ভুতভাবে কানাশোলের মতো এই স্থানেও মন্দির প্রতিষ্ঠার পূর্বে জঙ্গলে এক কৃষ্ণ গাভী এক শিলাখণ্ডে রোজ দুধ দিত। এক রাখাল বালক সেটি দেখতে পায়। এবং সেইদিনই রাজা উমাপতি স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নাদেশ পেয়ে উমাপতি জঙ্গল পরিষ্কার করে শিলাখণ্ড আবিষ্কার করেন এবং গড়ে তোলেন মন্দির।
কামেশ্বর বাবা এখানে স্বয়ং প্রভু জগন্নাথ হিসেবে মন্দিরে বিরাজ করেন। এই দেবমন্দির এক রাত্রির মধ্যে নির্মাণ করা হয়েছিল। মন্দিরে নির্মাণের ভার অর্পণ করা হয়েছিল স্বয়ং বিশ্বকর্মার ওপর। কিন্তু সম্পূর্ণ রাত্রি কাজ করার পরেও মন্দিরের চুঁড়া নির্মাণ কিছুটা বাকি থেকে যায়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্দির অসম্পূর্ণ রেখেই ওই স্থান পরিত্যাগ করেন বিশ্বকর্মা। ন্যাড়া ছাদের নিচেই অধিষ্ঠান করেন কামেশ্বর বাবা। সেই থেকেই এই স্থা নের নামকরণ করা হয় নেড়াদেউল। বাবা কামেশ্বর উমাপতিকে জগন্নাথ রূপে দেখা দেন এবং আদেশ করেন মন্দিরের পূজা পরিচালনার জন্য উৎকল থেকে দুইজন ব্রাহ্মণ আনা আবশ্যক। বাবার আদেশে উমাপতি উৎকল থেকে দুজন পন্ডা ও দুইজন ত্রিপাঠী পুরোহিতকে নিয়ে এসে মন্দিরের নিত্য পূজার ভার অর্পণ করেন। বর্ধমানরাজ তেজচন্দ্র বাহাদুরকে বাবা কামেশ্বর মন্দিরের ভেতরেই জগন্নাথ দর্শন করান। মুগ্ধ হয়ে বর্ধমানরাজ একশো বিঘা বাস্তু, পুকুর এবং দুইশত বিঘা কৃষি জমি প্রদান করেন। তখন থেকেই আজ পর্যন্ত কামেশ্বর মন্দিরে প্রতিদিন জগন্নাথ ভোগ নিবেদন হয়। নিত্য ভোগের পাকাপাকি বন্দোবস্ত করার জন্য মন্দিরের নামে ৩৬৫ বিঘা কৃষিজমি রয়েছে। এক বিঘা জমি থেকে প্রাপ্ত বার্ষিক আয়ে একদিন মন্দিরের ভোগের বন্দোবস্ত করা হয়। উৎকলের শিল্প রীতিতেই তৈরি এই মন্দির। বাবা কামেশ্বরের দর্শনে শ্রীক্ষেত্র দর্শনের ফল হবে, তিনিই বিশ্বনাথ তিনিই জগন্নাথ, মানুষের এই বিশ্বাস। নানান রোগ ব্যাধি থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে আজও বাবার স্মরণাপন্ন হন বহু বহু মানুষ। কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে এই মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। পৌষ সংক্রান্তিতে বিরাট মেলা বসে এই মন্দিরে। মহা সমারোহে পালিত হয় গাজন উৎসব।
তবে বর্তমানে কামেশ্বর বাবা মন্দিরে গাজন শুরু হয় চৈত্রের শেষের দিকে। এখানে গাজনের শুরুতে নয় গাজনের শেষে হয় মহাভোজের আয়োজন। গাজনের শুরুতে এখানে দীক্ষা নেন পাট ভক্ত্যা, তারপর কোটাল ভক্ত্যা এবং শেষের চারদিন বাকি সন্ন্যাসীরা দীক্ষা নিয়ে থাকেন। পাট ভক্ত্যা দীক্ষা নেওয়ার পর ক্রমানুযায়ী চলতে থাকে একের পর এক গাছডাক, হিন্দোলা, ভোগডাক প্রভৃতি আচার অনুষ্ঠান। তবে কামেশ্বর বাবার মন্দিরের ভোগ মাটির পাত্রে রান্না হয়না। ২৬ চৈত্র থেকে পালিত হয় বেতভাঙা, কাঁটাভাঙার মতো আচার। ২৯ চৈত্র অর্থাৎ মেলের দিন বাবার মাথায় জলঢালা শুরু হয়। দুপুরে ধ্বজা বাঁধার রীতিও চলতে থাকে তবে বাবার মন্দিরে শুধুমাত্র সাদা ধ্বজা বাঁধা হয়। সন্ধ্যার শিবের বিয়ে সম্পন্ন হলে আগুন সন্যাসের আয়োজন হয়। সংক্রান্তির দিন বাণ ফোঁড়া ও চড়ক। ‘বাণ ফোঁড়া’ নিয়ে এক বিশেষ প্রবাদ রয়েছে। হরিবংশের বাণ রাজা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধে ঘোরতর আহত হন। রাজা বাণবিদ্ধ অবস্থায় শোণিতাপ্লুত দেহ নিয়ে শিব সন্নিকটে নৃত্য করেছিলেন। তাতে শিব খুশি হয়ে বাণকে অমরত্বের বর প্রদান করেছিলেন। এবং তিনি আরও বলেছিলেন - ‘সত্যপরায়ণ ও সরলতা সম্পন্ন আমার যে ভক্ত নিরাহার থাকিয়া এইরূপ নৃত্য করিবে, সে আমার পুত্রত্ব লাভ করিবে'। এই কারণে চৈত্রোৎসবে ভক্ত্যারা বাণবিদ্ধ শোণিতাপ্লুত কলেবরে শিবসকাশে তাণ্ডব পৈশাচিক নৃত্য করে থাকে। এতে পরমায়ু, ধন, মান ও জীবনান্তে অমরত্ব লাভ হবে এই বিশ্বাস। বাণরাজা এর পথ প্রদর্শক বলে এই উৎসবের নাম 'বাণফোঁড়া' হয়েছে। বাণ ব্যবহারের আগে বাণ-কে বালির সাহায্যে ঘষে মেজে নেওয়া হয় ও ঘি লাগানো হয়। বাণের পূজা হয়। এরপর কামার স্নান সেরে দেবতার ফুল নিয়ে বাণফোঁড়ার কাজে ব্রতী হয়। বাণ খোলার পর ঘি ব্যবহার করা হয়। কেউ কেউ আবার তিল গুঁড়ো ঘি-র সঙ্গে মিশিয়ে ক্ষত স্থানে লাগায়। কেউ কেউ আবার পদ্মফুল কুঁড়ি চিবিয়ে নেয়। কেউ আবার মন্দিরের গায়ে বা চড়ককাঠে পিঠ ঘষে নেয়। দেহের একই স্থানে দু'বার বাণ ফোঁড়া নিষিদ্ধ। বাণ ফোঁড়ার পর ভক্ত্যারা পিশাচ, ডাকিনীর বেশে সেজে নৃত্য করতে করতে নেড়াদেউল বাজার ও মন্দির প্রদক্ষিণ করে। বিভিন্ন মন্দিরে চড়ক উল্টে দুর্ঘটনার কথা প্রতি বছরই আমরা শুনতে পাই, এর স্থায়ী সমাধান হিসেবে কামেশ্বর বাবার মন্দিরে চড়ক কাঠটি স্থায়ীভাবে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ১লা বৈশাখ সমাপ্ত হয় গাজন। বিসর্জন দেওয়া হয় গাজনের ঘট।
বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কোনো না কোনো সময়ে গাজন অনুষ্ঠিত হয়। ধর্মনিরপেক্ষ এই অনুষ্ঠানে সকলের মঙ্গল কামনায় সঙ্গে সঙ্গে বাংলার মানুষ তাদের সাংস্কৃতিক কুশলতা এবং শিল্পচর্চার নিদর্শনকে মেলে ধরে। গাজন শুধুমাত্র একটি লৌকিক অনুষ্ঠান নয়, এটি ত্যাগ, সংযম, ভক্তি, কৃচ্ছ্রসাধনের এক মেলবন্ধন। সকলের চাষাবাদ ভালো হোক, সকলে সুখে থাকুক, হাসি-খুশিতে থাকুক এবং প্রাণবন্ত থাকুক এটাই বোধহয় গাজন উৎসবের মূল প্রার্থনা।
যে পাথর ঘষে মানুষ একদিন আগুন জ্বালাতে শিখেছে, হাতিয়ার হিসেবে যে পাথর একদিন হাতে তুলে নিয়েছে, যে পাথরে তারা একদিন ফুল ফুটিয়েছে, সেই পাথরকে মানুষই মাটি থেকে তুলে এনে দেবত্ব প্রদান করেছে। তাকে বিশ্বাস করেছে, তাকে দেখে দুহাত মাথায় ঠেকিয়েছে, ভেবে এসেছে যুগে যুগে এই দেবতা রক্ষা করেছে মানব জাতির অস্তিত্ব, তবে সিন্ধু সভ্যতার পশুপতি হোক বা মিশরীয় সভ্যতার ওসিরিস, কিংবা মেসোপটেমিয়ার এলনিন হোক বা রোমান সভ্যতার জুপিটার থেকে আজকের মহেশ্বর সবার ওপরে ‘মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই।’
সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল
সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা
কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪












No comments:
Post a Comment