Friday, 10 April 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৮

 


চন্দ্রকোণার গাজন উৎসব 

বিলাস ঘোষ


"আমরা দুটি ভাই শিবের গাজন গাই

ঠাকুমা গেছেন গয়া কাশি ডুগডুগি বাজাই।৷"

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। বারো মাসের বিভিন্ন পার্বণের মাধ্যে গাজন উৎসব অন্যতম৷ গাজন শব্দটি শুনলে শিবের গাজনের কথা মনে ভাসে৷ যদিও গাজন বাঙালি হিন্দুদের একটি লোকউৎসব। পশ্চিমবঙ্গে মা মনসা, ধর্মঠাকুর, শিবঠাকুরের পূজাকেন্দ্রিক উৎসবকে গাজন হিসেবে পালন করা হয়৷ এখানে গাজন বলতে মূলত দেবাদিদেব মহাদেব বা শিবঠাকুরের গাজন উৎসবকে প্রাধান্য দেওয়া হয়৷ চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে চৈত্র সংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখ চড়ক পূজার মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। অনেকের মতে গাজন শব্দটি গর্জন শব্দ থেকে এসেছে৷ অনেকে আবার মনে করেন গাজন অর্থাৎ গ্রামীণ জনসাধারণের উৎসব৷ পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রতিটি গ্রামের শিব মন্দিরকে কেন্দ্র করে গাজন উৎসব পালিত হয়৷ 


পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঘাটাল মহকুমার চন্দ্রকোণা জনপদটি হিন্দু সংস্কৃতির অন্যতম স্থান হিসাবে ধরা হয়৷ কথিত আছে, চন্দ্রকোণার বাহান্ন বাজার ও তিপান্ন গলির কথা৷ আজও সেই বাজার ও গলিগুলি বিদ্যমান। বর্তমান সময়ের সাথে তাদের ভোল পাল্টেছে মাত্র৷ রাজা চন্দ্রকেতু চন্দ্রকোণা প্রতিষ্ঠা করেন বলে মনে করা হয়। বিষ্ণুপুরের মত চন্দ্রকোণাতেও প্রচুর মন্দির ছিল৷ বর্তমান সময়েও তার নিদর্শন পাওয়া যায়৷ চন্দ্রকোণার প্রাচীন শিবমন্দির গুলির মধ্যে মল্লেশ্বরপুরে উজাননাথ শিবমন্দির অন্যতম। চৈত্র মাসে প্রায় সব শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করে গাজন উৎসব পালিত হয়৷ কোথাও কোথাও বৈশাখ মাসের শেষে আপাল গাজন বা অকাল গাজন পালন করা হয়। যেমন - পুরুষোত্তমপুরের শান্তিনাথ শিবমন্দির৷ 

চন্দ্রকোণার বেশিরভাগ শিবমন্দির গুলিতে গাজন উৎসবের আচার প্রায় এক। যেমন - কাঁটা গড়ানো, হিন্দোল, গড়ান সেবা, আগুন সন্ন্যাস, দুধ সন্ন্যাস, ঝাঁপ ভাঙা, ধূণুচি নাচ ইত্যাদি। কোথাও কোথাও মাথাচালা, বেতচালা, ডানা নাচের মত অদ্ভূত ধরণের রীতির প্রচলন আছে৷ কোন কোন শিবমন্দিরে চড়ক পূজা ও জিভ ফোঁড় সহ বিভিন্ন ধরনের ফোঁড় প্রথা লক্ষ্য করা যায়৷ তারমধ্যে মেঠানি স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র গাজন উৎসবে ফোঁড় প্রথা, শালেভর, জোড়া গাছ হিন্দোল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। চন্দ্রকোণার রাধাবল্লভপুরের ফোঁড় প্রথা বেশ জনপ্রিয়৷ সাধারণত যেসব শিবমন্দিরে চড়ক পূজার প্রচলন আছে তা পয়লা বৈশাখ চড়ক পূজা সেরে মহাদেবের ভক্তরা আঁশপান্না অনুষ্ঠান বা সাধারণ জীবনে ফিরে আসার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন৷ তবে হীরাধরপুরে উজাননাথের ফোঁড় প্রথা একটু অন্যরকম। বেশিরভাগ জায়গাতে পয়লা বৈশাখ চড়ক পূজা হয়, কিন্তু এখানে পয়লা বৈশাখ ফোঁড় প্রথার প্রচলন আছে। আবার বেশকিছু জায়গায় চৈত্র সংক্রান্তি দিনই ফোঁড় প্রথা ও চড়ক পূজা হতে দেখা যায়৷ যেমন - চন্দ্রকোণা ২নং ব্লকের শীলাবতীর তীরে অবস্থিত ভুবনেশ্বর শিবমন্দির।

চন্দ্রকোণার বেশকিছু স্থানে গাজন উৎসবকে ঘিরে মেলা বসে৷ উৎসব মুখরিত পরিবেশে শিবঠাকুরের সন্ন্যাসীরা বিভিন্ন ধর্মীয় আচার আচরণে ব্যস্ত থাকেন, অন্যদিকে দোকানদানি বিকিকিনি জনসমাগম৷ এমন একটি গাজন উৎসব হল চন্দ্রকোণার মেঠানি গ্রামে অবস্থিত স্বয়ম্ভূনাথের গাজন মেলা। স্বয়ম্ভূনাথ মন্দিরে এক সহস্রাধিক ভক্ত সন্ন্যাসী থাকেন৷ স্বয়ম্ভূনাথকে ঘিরে একটি লোককাহিনী প্রচলিত আছে৷ অনেক অনেকদিন আগে আজ যেখানে স্বয়ম্ভূনাথ মন্দির জায়গাটিতে অগভীর জঙ্গল ছিল। মেঠানি গ্রামের মণ্ডলমশাই রাখাল বালকদের (বাগাল) ঐ জঙ্গলে গরু চরাতে পাঠাতেন৷ মণ্ডলমশাই প্রায় লক্ষ করতেন, পাল থেকে ফিরে এসে গাভিগুলি আর দুগ্ধ দেয় না৷ তিনি রাখালদের দোষারোপ করতেন৷ রাখালরা পরেরদিন আবার গরুর পাল নিয়ে জঙ্গলে চলে যেত। তারা সেখানে পাথরের উপর তালের আঁঠি কেটে খেত। একদিন তারা দেখল যে পাথরটির উপর তালের আঁঠি কাটত সেটির উপর গাভি দুগ্ধ দান করছে৷ এই ঘটনাটি মণ্ডলমশাইকে জানায়৷ তিনি পরেরদিন গাছের আঁড়াল থেকে সেই অলৌকিক স্বর্গীয় দৃশ্যটি চাক্ষুস করেন এবং অবাক হন৷ অন্যদিকে মেঠানি গ্রামের পাশের নদী (বর্তমানে তার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না) দিয়ে কোন এক সদাগর বানিজ্য করতে যাচ্ছিলেন। তিনি ভয়ানক তুফানের কবলে পড়েন৷ তার সপ্ততরী নদীর জলে নিমজ্জিত হয়৷ তিনি বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে ভগবান শংকরকে স্মরণ করেন। গভীর রাতে নিদ্রামগ্ন সদাগরকে স্বয়ম্ভূনাথ স্বপ্নে দেখা দেন৷ তিনি পরেরদিন সকালে মণ্ডলমশাইকে সব বলেন এবং বনের সেই পাথরটি অন্যত্র স্থাপনের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন৷ সেদিন রাতে স্বয়ম্ভূনাথ পুনরায় সদাগরের স্বপ্নে আসেন এবং তিনি জানান পাথরটি স্থানান্তর করা যাবে না, সেটি কাশির বিশ্বেশ্বর শিবের সঙ্গে যুক্ত আছে। স্বয়ম্ভূনাথের স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেখানেই স্থাপিত হয় মন্দির এবং দীর্ঘ্যগ্রামের হরিপদ চট্টোপাধ্যায়কে পূজারী হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। সেই থেকে মেঠানি গ্রামে স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র নিত্য পূজা ও চৈত্রমাসে গাজন উৎসব পালিত হয়৷ (উপরোক্ত লোককাহিনী আজও স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র নাটমন্দিরে রংতুলিতে ছবির মাধ্যমে আঁকা আছে)। নীল পূজার দিন অগনিত ভক্ত স্বয়ম্ভূনাথকে জল অর্পণ করতে আসেন৷ গাজন ক'দিন নহবতখানায় সানাই ও ঢোলের মঙ্গলসুর ধ্বনিত হয়। চৈত্র সংক্রান্তির বিকেলে কাঁটা ও বান সহযোগে জিভফোঁড়, সরু নাইলনের দড়ি দিয়ে দুই বাহুতে ফোঁড়, সন্ন্যাসীদের দ্বারা শালেভর, গাছ হিন্দোল ইত্যাদি দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে মুখরিত হয় রাস্তার দু'ধার৷ মেঠানি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে চাঁদা নামক গ্রামে স্বয়ম্ভূনাথের গাজন পুকুর থেকে ফোঁড়গুলি শুরু হয়, শেষ হয় বাবার মন্দিরে এসে৷ শুধু ফোঁড় নয় অনেক সন্ন্যাসী প্রণামসেবা দিয়ে এই দূরত্ব অতিক্রম করেন৷ অনেক মহিলা ভক্ত স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র সন্ন্যাসী ব্রত পালন করেন। বর্তমানে অবশ্য চন্দ্রকোণার অনেক শিবমন্দিরে মহিলারাও সন্ন্যাসী থাকেন৷ ঐদিন সবশেষে আসে রাতগাজন৷ পাঠসস্ন্যাসী ও দেউল সন্ন্যাসী সহ আরও কয়েকজন সন্ন্যাসী দুই বাহুতে ধারালো সূঁচ দিয়ে ফোঁড় করেন, যা কালকা ফোঁড় নামে পরিচিত৷ সাথে থাকে মশালের আলো৷ কালকা ফোঁড় স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র মন্দিরে আসার আগে কালীমাতার মন্দিরে ভাঙ্গর ভোলার গান ও তরজা গান গাওয়া হয়৷ পরেরদিন বিকালে অনুষ্ঠিত হয় চড়কপূজা৷ সারাবছর চড়ককাঠ ডোবানো থাকে স্বয়ম্ভূনাথ জীউ'র শিবপুকুরে৷ সন্ন্যাসীরা সেই কাঠ কাঁধে তুলে ভোলেবাবার নাম করতে করতে নিয়ে যায় মেঠানি গ্রামের পূর্বপ্রান্তে চড়ক মাঠে৷ সেখানেও প্রচুর মানুষের সমাগম হয়৷ চড়ক সুসম্পন্ন হলে সন্ন্যাসীরা পুনরায় সেই চড়ককাঠটি নিয়ে এসে শিবপুকুরে ডুবিয়ে রাখেন। সবশেষে সন্ন্যাসীরা পুরহিতের অনুমতিতে উত্তরি খুলে আঁশপান্না অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন এবং সাধারণ জীবনে ফিরে আসেন।

চন্দ্রকোণার রঘুনাথপুরে পার্বতীনাথ শিবের রাতগাজন বেশ উল্লেখযোগ্য। রাতগাজনে সন্ন্যাসীরা বাদ্য বাজনা সহ শিবকে (প্রতীকী) নিয়ে গোটা গ্রাম প্রদক্ষিণ করেন৷ যাত্রাপথে ঠাকুরবাড়ি বাজারে সঙ্ প্রদর্শন হয়৷ হাজার হাজার উৎসাহী জনতার ভিড়ে মুখরিত হয় এসময়৷ যে সকল গাজন উৎসবে চড়ক পূজার প্রচলন আছে সেখানে সঙ্ দেখতে পাওয়া যায়৷ এছাড়া চন্দ্রকোণার উল্লেখযোগ্য গাজন উৎসবগুলির মধ্যে রামগঞ্জের বুড়াশিব, গোপসাই গোপেশ্বর, লালসাগর ভুবনেশ্বর, গোঁসাইবাজার ও দক্ষিণবাজার শান্তিনাথ, মানিককুণ্ডুর খেয়ালনাথ, জাড়ার বাঁকারায়, বওড়ার কালুরায়, হিরাধরপুরে উজাননাথ, ভগবন্তপুরের বাসি গাজন, কমরপুরে কুমোরেশ্বর, রামজীবনপুরের পার্বতীনাথ ও বুড়ো শিবের গাজান। আগে মহামেল বা নীলপূজায় সাধারণত মহিলারা শিবলিঙ্গে জল অর্পণ করতেন ও ব্রত রাখতেন। বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়েই এই ব্রত করেন।

চন্দ্রকোণার বেশকিছু শিবমন্দিরে শিবঠাকুরের নামের সাথে মিল আছে। যেমন - নুতনহাট, বৈদ্যনাথপুর, বাঁকা সুলতানপুর, জগন্নাথপুর (রাতগাজনে তরজা গানের প্রথা চালু আছে), ভবানীপুর, কালাপাট শিবমন্দিরে শিবের নাম শীতলানন্দ। নয়গঞ্জ, মিত্রসেনপুর, ইলামবাজার, গোসাঁইবাজার, দক্ষিণবাজার, পুরুষোত্তমপুর শিবমন্দিরে শিবের নাম শান্তি নাথ। মাল্লেশ্বরপুর, হীরাধরপুরে শিবের নাম উজাননাথ। রঘুনাথপুর, রামজীবনপুরে শিবের নাম পার্বতীনাথ ইত্যাদি। বর্তমানে এখানকার প্রায় সব গ্রামেই গাজন কেবলমাত্র একটি প্রথা নয় এটি গ্রামভিত্তিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

No comments:

Post a Comment

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৮

  চন্দ্রকোণার গাজন উৎসব  বিলাস ঘোষ "আমরা দুটি ভাই শিবের গাজন গাই ঠাকুমা গেছেন গয়া কাশি ডুগডুগি বাজাই।৷" বাঙালির বারো মাসে তেরো পা...