Tuesday, 7 April 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৭

 


খামারবাড়ির গাজন ও গাজনমেলা

দোলন পাত্র

গাজন পশ্চিমবঙ্গের এক প্রাচীন ও বহুমাত্রিক লোকউৎসব, যা মূলত গ্রামীণ হিন্দু সমাজে প্রচলিত হলেও এর শিকড় নিহিত রয়েছে রাঢ় বাংলার আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে। যেমন লোধা, বাগদী, ভূমিজ প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মধ্যে। এই উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের জীবনসংগ্রাম, বিশ্বাস এবং উচ্ছ্বাসের এক সম্মিলিত প্রকাশ। এই প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইন লিখতেই হয়—

"..... আজকের এই গ্রাম্য সন্ততির প্রপিতামহের দল হেসে খেলে ভালোবেসে - অন্ধকারে জমিদারদের চিরস্থায়ী ব্যবস্থাকে চড়কের গাছে তুলে ঘুমায় গিয়েছে।

ওরা খুব বেশি ভালো ছিল না; তবুও

আজকের মন্বন্তর দাঙ্গা দুঃখ নিরক্ষরতায়

অন্ধ শতচ্ছিন্ন গ্রাম্য প্রাণীদের চেয়ে

পৃথক আর-এক স্পষ্ট জগতের অধিবাসী ছিল।" - (কবিতা ১৯৪৬ - ৪৭) - জীবনানন্দ দাশ। শিবের আরাধনার মাধ্যমে জীবনের দুঃখ-কষ্ট ও প্রতিকূলতাকে জয় করার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষাই গাজনের মূল সুর। গাজনের অন্তিম পর্বে অনুষ্ঠিত চড়ক পূজা এই উৎসবকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। চড়ক আমাদের জীবনের গতিময়তা হাসি কান্নার উত্থান পতনের এক লৌকিক প্রতীক।

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনীর অদূরে অবস্থিত খামারবাড় গ্রাম এই গাজন উৎসবের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। শালবনী বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রত্যন্ত গ্রাম প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরপুর। কাজুবাদাম, শাল ও মহুলের সুবাসে ভরা পথ, সবুজে ঘেরা পরিবেশ এবং ছোটো নদী তমালের শান্ত প্রবাহ এই গ্রামকে এক অনন্য আবহ প্রদান করেছে। নদীর উপর নির্মিত সেতু সংযুক্ত করেছে খামারবাড় ও আমচুড়া গ্রামকে, যা এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতীক।

খামারবাড়ির গাজন উৎসব প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন, যা আট পুরুষ ধরে ধারাবাহিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে, নিমাইচাঁদ দন্ডপাট মহাশয়ের সময় থেকেই এই উৎসবের সূচনা। তখন এই অঞ্চল ছিল ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত। শীতলনাথ দন্ডপাটের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় শিবমন্দির, এবং তাঁর নামানুসারেই শিবঠাকুর ‘শীতলনাথ’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। একটি উল্লেখযোগ্য কাহিনি অনুসারে, দন্ডপাট পরিবারের একটি গরু প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট স্থানে দুধ দিত, যা লক্ষ্য করে গ্রামবাসীরা সেখানে শিবলিঙ্গের আবিষ্কার করেন। এই অলৌকিক ঘটনাই মন্দির প্রতিষ্ঠা ও গাজন উৎসবের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গাজন উৎসব চৈত্র মাসের অন্তিম পর্বে শুরু হয়। চৈত্র মাসের ২২ তারিখের পূর্বে শীতলা মাতার মন্দিরে পূজার মাধ্যমে উৎসবের সূচনা ঘটে। পরদিন ভোরে ‘ক্যামলা ওঠা’ বা গাজনের ঘাট তোলার মধ্য দিয়ে মূল আচার শুরু হয়। এদিন থেকেই ভক্তরা উপবাস ও কঠোর কৃচ্ছসাধনে ব্রতী হন। প্রায় ৫০০ জন ভক্ত এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। এই ভক্তদের মধ্যে প্রধান ভক্তকে বলা হয় ‘পাট ভক্তা’, দ্বিতীয় ভক্ত ‘কোটাল ভক্তা’ এবং যিনি সমগ্র আয়োজনের তত্ত্বাবধান করেন তিনি ‘ধর্মকর্ণী’ নামে পরিচিত। আট দিনব্যাপী চলা এই উৎসবের প্রধান দিন হলো চৈত্র সংক্রান্তি। এই দিনে অনুষ্ঠিত হয় ‘আগুন সন্ন্যাস’ ও ‘হিন্দোলা’। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, গ্রামের প্রয়াত ব্যক্তিদের চিতার কাঠ দিয়েই আগুন জ্বালানো হয়। সেই আগুনের উপর ভক্তদের নৃত্য এবং হিন্দোলায় দোল খাওয়া একদিকে যেমন ভক্তির চরম প্রকাশ, তেমনি অন্যদিকে তা জীবন-মৃত্যুর দার্শনিক উপলব্ধির প্রতীক।

গাজন উৎসবকে কেন্দ্র করে খামারবাড়িতে আট দিনব্যাপী এক বৃহৎ মেলার আয়োজন করা হয়। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম—যেমন যাত্রা বিস্টুপুর, ভাদুতলা, চাঁদাবিলা, জগন্নাথপুর, মন্ডল কুপি, তিলাখুল্যা, বরাকুলি প্রভৃতি এলাকা থেকে মানুষ এই মেলায় অংশগ্রহণ করেন। ভক্তরা শিবঠাকুরের মাথায় জল ঢেলে মানত করেন এবং বিশ্বাস করেন যে, তাঁদের মনস্কামনা পূর্ণ হয়। মেলা প্রাঙ্গণে বিভিন্ন পণ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সমাহার এই উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

১লা বৈশাখে একটি বিশেষ রীতি পালিত হয়, যেখানে গ্রামবাসীরা গান গেয়ে ভক্তদের পথরোধ করেন—

"কোথায় চলেছ তোমরা যতেক সন্ন্যাসী

পথ মাঝে দাঁড়ায়েছে বিরাট রাক্ষসী"

এই গানের মধ্যে থাকে হাস্যরস ও কৌতুক, যা ভক্তদের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও ক্লান্তি কিছুটা লাঘব করে।

এই মন্দিরের পূজার দায়িত্ব পালাক্রমে ১২ জন চক্রবর্তী পরিবারের সদস্য পালন করেন। তাঁদের প্রত্যেকে একেক বছরে গাজন উৎসবের সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা একটি সুসংগঠিত ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির নিদর্শন।

প্রথমদিকে মন্দিরটি ছিল মাটির ও খড়ের তৈরি। পরবর্তীকালে তরুণনাথ দন্ডপাট মহাশয়ের উদ্যোগে বর্তমান পাকা মন্দির নির্মিত হয়, যা আজও গ্রামবাসীদের ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

খামারবাড়ির গাজন উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি গ্রামীণ জীবনের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের এক অমূল্য সম্পদ। স্বয়ং আবির্ভূত শিবলিঙ্গ ও শতাব্দীপ্রাচীন এই ঐতিহ্য শালবনী অঞ্চলের এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। তবে এত সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও এই মন্দির ও উৎসব এখনও যথাযথ সরকারি স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত। প্রয়োজন যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে এবং এর মহিমা আরও বিস্তৃতভাবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

No comments:

Post a Comment

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৭

  খামারবাড়ির গাজন ও গাজনমেলা দোলন পাত্র গাজন পশ্চিমবঙ্গের এক প্রাচীন ও বহুমাত্রিক লোকউৎসব, যা মূলত গ্রামীণ হিন্দু সমাজে প্রচলিত হলেও এর শিক...