Saturday, 4 April 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৬

 


লোকসংস্কৃতির দর্পণে ডেবরা : মাড়োতলা শ্রী শ্রী ঁসত্যেশ্বর মহাদেব জিউর গাজন ও গাজন মেলা

বিশ্বজিৎ ভৌমিক 


পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা ব্লকের সত্যপুর তথা মাড়তলা গ্রামে অবস্থিত সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দিরের গাজন উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং অটুট বিশ্বাসের এক মিলনমেলা। রাজা মুকুট নারায়ণের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হওয়া এই উৎসবের মূল ভিত্তি হলো 'সত্যের জয়গান', যা আজও এই জনপদের আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। তীব্র বৈশাখের তপ্ত দুপুরে যখন ঢাকের গুরুগম্ভীর আওয়াজে মাড়তলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষের সমাগম প্রমাণ করে এই উৎসবের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিরন্তন রূপ। একদিকে গাজন সন্ন্যাসীদের কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ও ত্যাগের মহিমা, আর অন্যদিকে গ্রাম্য মেলার রঙিন পসরা—সব মিলিয়ে সত্যেশ্বরের এই বৈশাখী গাজন মেদিনীপুরের লোকায়ত সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল, যা যুগ যুগ ধরে ভক্ত হৃদয়ে ভক্তি ও ঐতিহ্যের সেতুবন্ধন রচনা করে চলেছে। বাংলার গ্রাম্য জনপদে শিব উপাসনা এক অতি প্রাচীন প্রথা, যেখানে দেবতাকে কেবল মন্দিরে নয়, বরং সমাজের রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখা হয়। সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দির এমনই এক আধ্যাত্মিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। জনশ্রুতি আছে যে, এই মন্দিরের মহিমা ও 'সত্যের' শক্তির কারণেই এই জনপদটি 'সত্যপুর' নামে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রাচীন 'মাড়তলা' প্রাঙ্গণে অবস্থিত এই মন্দিরটি আজও মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্য এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার স্মৃতি বহন করে চলেছে।

সত্যেশ্বর মহাদেব মন্দিরের ইতিহাস মূলত স্থানীয় জনশ্রুতি এবং অলৌকিক ঘটনার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বলা হয়, এই শিবলিঙ্গটি কোনো মানুষের দ্বারা নির্মিত নয়, বরং এটি একটি 'স্বয়ম্ভু' লিঙ্গ (যা মাটি ফুঁড়ে নিজে থেকেই আবির্ভূত হয়েছে)।

লোককথা অনুযায়ী, বহু বছর আগে এই অঞ্চলটি যখন ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল, তখন এক মেষপালক বা গোয়ালা লক্ষ্য করেন যে তার একটি গাভী প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট ঝোপের মধ্যে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুধ দিচ্ছে। কৌতূহলী হয়ে গ্রামবাসীরা ওই স্থানটি খনন করলে এই অলৌকিক শিবলিঙ্গটি খুঁজে পান।

গড়কিল্লা রাজা মুকুট নারায়ণ ছিলেন এই অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী এবং প্রজাবৎসল শাসক। তাঁর শাসনকালেই ষোড়শ শতাব্দীতে সত্যেশ্বর মহাদেবের মন্দিরটি একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। লোকগাথা অনুযায়ী, রাজা স্বপ্নদেশ পেয়ে বা অলৌকিক কোনো ঘটনার সাক্ষী হয়ে এই 'স্বয়ম্ভু' লিঙ্গটির ওপর মন্দির নির্মাণ করেন। অর্থাৎ প্রায় ৬০০ বৎসরের প্রাচীন এই শিব মন্দির নবরত্ন আকৃতির। 

সত্যপুরের সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দিরের গাজন উৎসবের রীতিনীতি হলো ভক্তি, কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন এবং প্রাচীন লোকচারের এক অনন্য সংমিশ্রণ। এই মন্দির ন'য় ভোগের মন্দির। প্রতিবৎসর এই উৎসবে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন স্থান থেকে আগত শতাধিক ভক্ত যাঁরা 'সন্ন্যাসী' বা 'ভক্ত্যা' নামে পরিচিত, তাঁরা সাদা বস্ত্র পরিধান করে এবং গলায় উত্তরীয় ধারণ করে এক পবিত্র ব্রত পালন করেন। উৎসবের দিনগুলিতে তাঁরা সম্পূর্ণ নিরামিষ আহার বা হবিষ্যান্ন গ্রহণ করেন এবং খালি পায়ে হেঁটে ও মাটিতে শয়ন করে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করেন। প্রতিদিন ভোরে স্থানীয় জলাশয়ে উত্তরমুখী হয়ে স্নান সেরে ভেজা কাপড়ে মন্দিরের গর্ভগৃহ পর্যন্ত 'দণ্ডী কাটা' বা সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানানো এই উৎসবের এক আবশ্যিক রীতি। বৈশাখী গাজনের বিশেষ আকর্ষণ হলো 'ফল গাজন', 'নীল পুজো' এবং রোমাঞ্চকর 'চড়ক উৎসব' (বর্তমানে এই চড়ক উৎসব আর হয়না)। গাজন উৎসবের সূচনা হতো পুকুরে ঘট ডুবিয়ে দুর্গাপূজা করে একটি মাগুর মাছ বলি দিয়ে।  গাজনের শেষ দিন‌ও মাগুর মাছ বলি করা হতো। এছাড়া উৎসবের রাতে 'মাড়তলা' প্রাঙ্গণে ঢাকের বাদ্যি ও ধূপের ধোঁয়ায় উন্মত্ত হয়ে সন্ন্যাসীরা শিব-পার্বতীর মহিমা গেয়ে 'বোলান' নৃত্য পরিবেশন করেন। অনেক ক্ষেত্রে 'আগুন ঝাঁপ' বা 'কাঁটা ঝাঁপ'-এর মতো অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমে ভক্তরা তাঁদের অটল বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক শক্তির পরিচয় দেন, যা আজও সত্যপুরের এই গাজনকে মেদিনীপুরের লোকসংস্কৃতির এক শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়ে রেখেছে।

তৎকালীন সময়ে সত্যেশ্বর মহাদেবকে 'জাগ্রত বিচারক' মনে করা হয়। কথিত আছে, প্রাচীনকালে গ্রামে কোনো চুরি বা বিবাদ হলে অভিযুক্তকে মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে সত্য বলতে হতো। কেউ যদি মিথ্যা বলত, তবে সে তৎক্ষণাৎ রক্তবমন করত বা কোনো দৈব দুর্ঘটনার শিকার হতো। এই ভয়েই চোর-ডাকাতরা সত্যপুর গ্রামে ঢুকতে সাহস পেত না।

একটি পুরনো কাহিনী অনুযায়ী, এক সময় মন্দিরের সেবাইতরা পুজোর জন্য একটি বিশেষ তামার ঘড়া ব্যবহার করতেন। জনশ্রুতি আছে, মহাদেবের কৃপায় সেই ঘড়ার জল কখনো শেষ হতো না, যত মানুষই চরণামৃত গ্রহণ করুক না কেন।

বৈশাখী গাজনের সময় যখন সন্ন্যাসীরা 'আগুন ঝাঁপ' বা 'কাঁটা ঝাঁপ' দেন, তখন অনেকেরই বিশ্বাস যে মহাদেবের আশীর্বাদে তাদের শরীরে কোনো ক্ষত বা পোড়া দাগ সৃষ্টি হয় না। এমনকি তপ্ত বৈশাখের দুপুরে খালি পায়ে জ্বলন্ত পিচের রাস্তায় হাঁটলেও ভক্তরা কোনো কষ্ট অনুভব করেন না বলে দাবি করেন।

সত্যেশ্বর মাড়োতলার গাজন উৎসবটি সাধারণত বৈশাখ মাসের ২১ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত অত্যন্ত ধুমধাম করে পালিত হয়। শেষ দিনে জলঢাকা উৎসব পালন হয়। এছাড়াও চৈত্র মাসের নির্ধারিত নীলপূজার দিন‌ও জলঢালা উৎসবটি পালন করা হয়। এই দুই দিন ছাড়া অন্য কোন দিন ভক্তরা সরাসরি শিবলিঙ্গের মাথায় জল ঢালতে পারেন না। বাকি দিনগুলোতে ঢল ঢালার প্রয়োজন হলে পুরোহিতদের হাত দিয়েই বাবার মাথায় জল ঢালতে হয়। 

জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ শুরু হওয়ার আগে মহাদেবের কৃপা প্রার্থনা এবং বৃষ্টির কামনায় এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। রাজা মুকুট নারায়ণের সময়কাল থেকেই এই নির্দিষ্ট সময়ে উৎসব পালনের রীতি চলে আসছে বলে মনে করা হয়। এখানকার পাটভক্ত্যা গড়কিল্লার মাইতি পরিবারের, দেউল ভোক্ত্যা সত্যপুরের পন্ডিত পরিবারের ও কোটাল ভোক্ত্যা সী পরিবার থেকে হন প্রতিবছর।

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা ব্লকের অন্তর্গত সত্যপুরের সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দিরের 'মাড়তলা'র মেলাটি কেবল একটি ধর্মীয় সমাবেশ নয়, এটি কয়েক শতাব্দীর বিবর্তনশীল ইতিহাসের এক জীবন্ত মহাকাব্য। এই মেলার প্রাচীন ইতিহাসের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে রাজা মুকুট নারায়ণের রাজকীয় ঐতিহ্য; লোকশ্রুতি অনুযায়ী, মধ্যযুগের শেষভাগে রাজা যখন এই 'স্বয়ম্ভু' শিবলিঙ্গটি উদ্ধার করে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, তখন থেকেই বৈশাখী গাজন উপলক্ষে এই মেলার সূচনা হয়। প্রাচীনকালে এই মেলাটি ছিল মূলত একটি আঞ্চলিক বাণিজ্যিক মিলনস্থল, যেখানে ওড়িশা ও বাঁকুড়ার সীমান্ত থেকেও বণিকরা আসতেন। সেই সময় মেলার মূল আকর্ষণ ছিল বিনিময় প্রথা, মাটির তৈরি পুতুল, এবং বাঁশ ও বেতের নিপুণ হস্তশিল্প। রাজা মুকুট নারায়ণের উপস্থিতিতে মেলার সূচনা হতো এবং চড়ক গাছের ঘূর্ণনের সাথে সাথে ভক্তদের অলৌকিক কৃচ্ছ্রসাধন দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাতেন। গভীর রাতে হ্যারিকেনের আলোয় বসত কবিগান, বোলান গান এবং পৌরাণিক পালাগান, যা গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল।

সময়ের সাথে সাথে মেলার সেই প্রাচীন রূপ বর্তমানে এক বিশাল আধুনিক ও বাণিজ্যিক উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে এটি কেবল ডেবরা নয়, বরং সমগ্র পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অন্যতম বৃহৎ মেলায় পরিণত হয়েছে। মেলার পরিসর এখন অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর ব্যাপ্তি ৩০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। আধুনিক যুগে মেলার অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে; এখন আর কেবল মাটির হাঁড়ি-কুড়ি নয়, বরং আসবাবপত্র, আধুনিক গৃহস্থালি পণ্য, ইলেকট্রনিক্স এবং কৃষি যন্ত্রপাতির এক বিশাল বাজার এখানে বসে। বিনোদনের সংজ্ঞাও বদলেছে; এখনকার মেলায় বিশালাকার নাগরদোলা, সার্কাস, এবং বিচিত্রানুষ্ঠানের পাশাপাশি আধুনিক যাত্রা ও লোকসংগীতের আসর বসে। তবে এত পরিবর্তনের মাঝেও মেলার মূল আত্মিক সুরটি আজও অপরিবর্তিত।

এই মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো মচমচে গরম জিলিপি, বড় বড় সাদা কদমা ও চিনির রসালো বাতাসা, যা ভক্তরা পরম ভক্তিতে মহাদেবের প্রসাদ হিসেবে বাড়ি নিয়ে যান। তীব্র বৈশাখের দুপুরে মেলায় আসা মানুষের প্রাণ জুড়াতে একদিকে যেমন থাকে আখের রস, ডাব ও তরমুজের শরবত, অন্যদিকে থাকে মুচমুচে বিশাল পাঁপড় ভাজা, আলু চপ, বেগুনি ও ঘুগনি-মুড়ির জিভে জল আনা স্বাদ।  পেটাই পরটা এছাড়া প্রাচীন আমল থেকে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী খাজা, গজা এবং মুড়ির মোয়ার পাশাপাশি বর্তমানের মেলায় বিরিয়ানী,পকোড়া, মোমো, চাউমিন ও এগরোলের মতো আধুনিক খাবারের সমাহারও ভীষনভাবে চোখে পড়ে। ঐতিহ্যের এই স্বাদ ও গন্ধই সত্যপুরের মেলাটিকে ভোজনরসিকদের কাছে এক অনন্য উৎসবে পরিণত করেছে। 'মাড়তলা'র সেই প্রাচীন পুকুরপাড়ে আজও হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হন, যা রাজা মুকুট নারায়ণের আমল থেকে চলে আসা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের এই অপূর্ব মেলবন্ধনে সত্যপুরের মেলাটি আজও মেদিনীপুরের লোকসংস্কৃতিকে সগৌরবে বহন করে চলেছে।

বর্তমানে সত্যপুরের সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দিরের বৈশাখী গাজন ও মারো তলার মেলা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে এই সেবাইতগনের  শ্রী শ্রী সত্যেশ্বর মহাদেব জিউ দেবত্ব শিবপূজা কমিটি এছাড়াও বর্তমানে এই বৃহত্তর মেলা পরিচালনায় সুসংগঠিত মেলা পরিচালনা কমিটি, যা স্থানীয় গ্রামবাসী, পঞ্চায়েত প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত। রাজা মুকুট নারায়ণের আমল থেকে চলে আসা এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে আধুনিক যুগে সুশৃঙ্খলভাবে টিকিয়ে রাখতে এই কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কমিটির প্রধান কাজ হলো বৈশাখী গাজনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলি শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে সম্পন্ন করা এবং সন্ন্যাসীদের নিরাপত্তা ও সেবার সুব্যবস্থা করা। মেলার সময় হাজার হাজার মানুষের সমাগম সামাল দিতে কমিটি স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় পানীয় জল, আলোকসজ্জা, এবং শৌচাগারের ব্যবস্থা করে। এছাড়া, মাড়তলা প্রাঙ্গণে মেলার দোকানদারদের স্থান বণ্টন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা যাত্রাপালার আয়োজন এবং শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী নিয়োগও এই কমিটির অধীনে থাকে। রাজা মুকুট নারায়ণের সেই অসাম্প্রদায়িক আদর্শকে পাথেয় করে কমিটি আজও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে এই বৃহৎ মিলনমেলা পরিচালনা করে আসছে, যা ডেবরা অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। কমিটির বর্তমান সভাপতি ধুর্যটিপ্রসাদ চক্রবর্তী, সম্পাদক অজিত কুমার চক্রবর্তী এবং কোষাধ্যক্ষ মৃনালকান্তি চক্রবর্তী।

বর্তমানে সত্যেশ্বর মহাদেব মন্দিরটি তার সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে আজও সগৌরবে দণ্ডায়মান। যদিও শতবর্ষের ঝোড়ো হাওয়া এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মূল কাঠামোর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, দেবত্ব ট্রাস্টের তহবিল ও কমিটির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মন্দিরটির আমূল সংস্কার করা হয়েছে।  প্রাচীন 'আটচালা' স্থাপত্যরীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে মন্দিরের দেওয়ালে নতুন করে পলেস্তারা এবং রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে, যা দূর থেকে ভক্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মেঝেতে মার্বেল পাথর দেওয়া হয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে সেই ঐতিহাসিক 'স্বয়ম্ভু' শিবলিঙ্গটি আজও অত্যন্ত ভক্তিভরে নিত্যপূজিত হন।

রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে সত্যেশ্বর মহাদেব মেলা পরিচালনা কমিটি এবং স্থানীয় সেবাইত পরিবার একযোগে কাজ করে। মন্দিরের প্রাত্যহিক ভোগ-রাগ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং আলোকসজ্জার দায়িত্ব তাঁরাই পালন করেন। বিশেষ করে বৈশাখী গাজনের আগে 'মাঢড়তলা' প্রাঙ্গণ এবং মন্দিরের চারপাশ বিশেষভাবে সজ্জিত করা হয়।  মন্দিরের সামনের চাতাল এবং দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জায়গাটি আগের চেয়ে অনেক বেশি সুসংগঠিত হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, সত্যপুরের সত্যেশ্বর মহাদেব জিউর মন্দির কেবল একটি মন্দির বা স্থাপত্য নয়, বরং এটি মেদিনীপুরের মাটি ও মানুষের প্রাণের স্পন্দন। রাজা মুকুট নারায়ণের হাত ধরে যে ঐতিহ্যের সূচনা হয়েছিল, তা শত শত বছরের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও সামাজিক পরিবর্তনের ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আজও স্বমহিমায় ভাস্বর। 'মাড়তলা'র সেই ধুলিকণায় মিশে আছে গাজন সন্ন্যাসীদের কঠোর ত্যাগ, ভক্তের অটল বিশ্বাস এবং গ্রাম্য মেলার চিরায়ত আনন্দধারা। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই মন্দির ও মেলাটি একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক শান্তির নীড়, অন্যদিকে তেমনই এক প্রাচীন লোকসংস্কৃতির জীবন্ত পাঠশালা। আধুনিকতার প্রবল জোয়ারেও সত্যপুরের মানুষ যেভাবে তাঁদের এই শিকড়কে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন, তা সত্যই প্রশংসনীয়। সত্যেশ্বর মহাদেবের এই 'সত্যের জয়গান' আগামী দিনেও ডেবরা অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক গৌরবকে অক্ষুণ্ণ রাখবে—এটাই আমাদের একান্ত কামনা।

সবশেষে ধ্বনিত হোক গাজন উৎসবে সন্ন্যাসীদের সেই মন্দির কাঁপানো ধ্বনি : "বাবা সত্যেস্বরের চরণে সেবা লাগে - মহাদেব, মহাদেব"।


তথ্যসূত্র

 শ্রী কমল চক্রবর্ত্তী - সেবাইত

শ্রী মৃনালকান্তি চক্রবর্ত্তী - সেবাইত

এছাড়াও মাড়তলা এলাকায় দোকানদার ও ব্যবসায়ীগণ

চিত্র : নিজস্ব চিত্র

                      লেখক - বিশ্বজিৎ ভৌমিক 


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

No comments:

Post a Comment

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৬

  লোকসংস্কৃতির দর্পণে ডেবরা : মাড়োতলা শ্রী শ্রী ঁসত্যেশ্বর মহাদেব জিউর গাজন ও গাজন মেলা বিশ্বজিৎ ভৌমিক  পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা ব্লকের...