Wednesday, 15 April 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৯



ঘাটাল মহকুমায় গাজনের সেসময় এবং এসময়

আশিস করণ

১.

ভারতের যে সকল প্রাগৈতিহাসিক দেবতা পরবর্তীকালে হিন্দু সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠা স্থাপন করতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে শিব সর্বপ্রধান এবং সবার আগে পূজিত। এটা থেকে স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যায় যে,ভূভারতে প্রাকবৈদিক সমাজেও শৈব ধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল।এমনকি মহেঞ্জোদারোর প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকেও এই বিষয়টির একটা প্রামাণ্য সমর্থন পাওয়া যায়।

আদতে ব্রাহ্মণ্যধর্ম বঙ্গদেশ থেকে বহুদূরবর্তী অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছিল।কালের স্রোতে তা বঙ্গদেশে বিস্তৃত হওয়ার আগেই তাকে প্রাগার্য শৈবধর্মের সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল। সুতরাং বঙ্গদেশে প্রথম থেকেই যে শৈবধর্মের প্রভাব শুরু হয়েছিল তার সাথে আর্যেতর সমাজের উপাদান আগে থেকেই মিশে ছিল। শুধু তাই না অনার্য দেবতা হিসেবে সেই ইতিপূর্বে আর্যসমাজে একটি বিশিষ্ট স্থানলাভ করে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। 

বৈদিক রুদ্র দেবতার মধ্যেই অনার্য উপকরণ স্পষ্টভাবে অনুকরণ করা যায়।অতএব দেখা যায়, বৈদিক দেবসমাজের মধ্যেই এই অনার্য দেবতা নিজ জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। পরবর্তী পৌরাণিক সাহিত্যে রুদ্র দেবতার এই বৈদিক পরিকল্পনার সাথে ধ্যানী বুদ্ধের অনুকরণে এক শান্ত সমাহিত শিবমূর্তি পরিকল্পনা করা হয়েছিল।তবে মহেঞ্জোদারোর আবিষ্কৃত সিলমোহরগুলির মধ্যে শিবের মতো যোগাসন রুপী এক দেবমূর্তির পরিচয় থেকে মনে করা হয় যে যোগীন্দ্র রুপী শিবের ভাবনা প্রাগার্য সমাজেই ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হলো। বলা চলে কালক্রমে সেটাও পৌরাণিক কল্পনার মধ্যে এসে মিলিত হলো।মূলত পৌরাণিক সাহিত্যের মাধ্যমে আর্য ধর্ম বঙ্গদেশে প্রচারিত ও প্রসারিত হলো বলে শিবের চরিত্রগত ভিন্নরুপী সত্তা বঙ্গদেশে প্রচার পেল বলে গবেষকদের মত।কোথাও মঙ্গলময় দেবতা,আবার কোথাও ভয়ানক রুদ্ররূপী বিনাশকারী।বলা চলে এই দুই প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপরেই বাংলার লৌকিক শৈবধর্মের ভিত্তি রচিত হলো।

 বঙ্গসমাজে বাইরের থেকে আসা শৈবধর্ম সমাজের উচ্চস্তরেই সর্বপ্রথম প্রচারিত হয়েছিল এবং ক্রমে তা সেখান থেকেই নিম্নতর সমাজে প্রসারলাভ করেছিল।অতঃপর নিম্নতর সমাজে শৈব ধর্মের পুরাণ আদর্শ বিসর্জন হলো বাধ্যতামবশত।

২.

বঙ্গদেশে আর্যসভ্যতা বিস্তৃতির ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে,উত্তর বিহার বা মগধের সংলগ্ন অঞ্চল উত্তরবঙ্গে প্রথম আর্য সভ্যতা বিস্তৃতি লাভ করল এবং ধীরে ধীরে উত্তরবঙ্গে উচ্চতর সমাজ থেকে তা তখনকার নিম্নতর সমাজের মধ্যেও প্রচারিত হলো। শৈবধর্ম বঙ্গদেশে বিস্তৃতি লাভের আগে উত্তরবঙ্গে সাধারণ জনসমাজে একটি স্থানীয় রূপ লাভ করল।এই পরিকল্পনা অনুসারে শিব ছিলেন ঘরের কৃষক। বলাবাহুল্য উত্তরবঙ্গের সাধারণ কৃষক সমাজের মধ্যে শিবের এই অভিনব পরিকল্পনা সম্ভব হয়। কিন্তু কৃষক হলেও প্রত্যক্ষ কৃষিকাজে তাঁর ছিল অসীম অনাশক্তি।কৃষিকাজে উদাসীনতার জন্য নিত্য সাংসারিক অভাব অনটনের যন্ত্রণা ভোগ করেন।ফলে কৃষিকাজে মনোযোগী না হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করলেন।এভাবে বাংলার কৃষকসমাজ একদিকে যেমন কৃষিকাজকে দেববৃত্তি বলে নির্দেশ করে গৌরব দান করেন,আবার তেমনই ভিক্ষা করাকেও দেববৃত্তি বলে উল্লেখ করে নিষ্ক্রিয় জীবনের মহিমা কীর্তন করেন।

উল্লেখযোগ্য বঙ্গদেশে আর্যসভ্যতা বিস্তারের আগে উত্তরবঙ্গে *'কোচ'* জাতির বসবাস ছিল।যাদের প্রধান বৃত্তি ছিল কৃষিকাজ।প্রসঙ্গত যে সকল জাতির মধ্যে কৃষিকাজ প্রচলিত,তাঁদের কৃষিকাজের জন্য এক দেবতার পরিকল্পনা হয়ে থাকে।গবেষকদের মত, এখনও উত্তরবঙ্গে বিশেষ করে দিনাজপুরে কৃষকদের মধ্যে *'মহারাজা'* বলে এক দেবতার পূজা হয়। অগ্রহায়ণ মাসে স্থানীয় কৃষকগণ নবান্নের সময় চাঁদা তুলে বারোয়ারি এই দেবতার পূজা করেন। তাঁদের বিশ্বাস, মহারাজা দেবতার আশীর্বাদে কৃষিতে সুফল হয়। যিনি ব্যাপকভাবে শিব বলে পরিচিত।একারণে প্রাচীনবাংলার কবিগণ শিবকেই কৃষিকাজে সহায়ক বলে বর্ণনা করেন।উত্তরবঙ্গে মহারাজা ঠাকুর এবং পশ্চিমবঙ্গের শিব ঠাকুরের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নেই কোনও।সুতরাং কোচ কৃষক সমাজেই বাংলার লৌকিক শৈবধর্মের  প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর হয়েছিল বলে গবেষকদের ধারণা। যদিও কৃষকের কল্যাণকর দেবতা হিসেবে উত্তরবঙ্গে কোচ সমাজে যে শিবের পরিচয় পাওয়া যায়, বঙ্গদেশের পশ্চিম সীমান্তে অর্থাৎ রাঢ় অঞ্চলে শিবের চরিত্রে ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়।অবশ্য এর মূল কারণ দুই অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে মৌলিক জাতিগত পার্থক্য।শিব চরিত্রের এই অভিনব পরিচয় এবং পার্থক্য বঙ্গদেশের বাইরে অন্য কোনও অঞ্চলে নজরে আসে না।যাইহোক এ তো আলোচিত হলো বঙ্গদেশের শিবপ্রসঙ্গ।

৩.

গাজন নিয়ে আলোচনার আগে বঙ্গদেশের শিবপ্রসঙ্গ এতক্ষণ বললাম,কারণ শিবকে কেন্দ্র করে গাজন বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অঙ্গ।এবার আসা যাক,'গাজন' কথায়।বঙ্গদেশের 'গাজন' উৎসবের কেন্দ্র কিন্ত শিব।যিনি মূলত অনার্যদের দেবতা এবং তথাকথিত শস্য দেবতা।সুতরাং একটা প্রাগৈতিহাসিক লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান কালক্রমে এদেশের কোনও কোনও অঞ্চলে শৈবধর্মের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছিল যাকে 'গাজন' বলা চলে এবং এটি অনার্য উৎসব অবশ্যই।জনশ্রুতি, বাংলায় 'গাজন' শব্দটির উদ্ভব সংস্কৃত 'গর্জন' শব্দ থেকে কমবেশি সবাই জানেন এবং এটাও উল্লেখ,শিবের অনুচর  গাজনের মূল উপাসক ভক্তা বা সন্ন্যাসীরা বাদ্যযন্ত্র সহযোগে যখন উৎসবে যোগ দেন তখনই গর্জন হয়।আর তাই আমার আপনার 'গাজন'।গর্জন (সংস্কৃত)>গজ্জন(প্রাকৃত)>গাজন (বাংলা)।এই শব্দটির উদ্ভব হিসেবে,

'গাজন'-'গা' বা 'গাঁ' হল গ্রাম এবং জন বলতে জনসাধারণ।বলা চলে,গ্রামের জনগণের উৎসব। অন্যদিকে কৃষিকাজ ছাড়াও শিবের আরেকটি গুণ ছিল-ভাঙ বা গাঁজার প্রতি আসক্তি।এই গাঁজা বা গাঁজন হলো অনুজীবের সাহায্যে জৈব যৌগের একপ্রকার রাসায়নিক পরিবর্তন।যা নেশাজাতীয় খাদ্য বা পানীয় তৈরিতে ব্যবহার হয়।এখান থেকেও গাজন শব্দটি উদ্ভব হতে পারে।কিন্ত উৎসব হিসেবে গাজন শিবের ভক্তিভিত্তিক পূজা।তবে, এপ্রসঙ্গে জানা দরকার, গাজন শুধু শিবের হয় এটি অধিকাংশ বঙ্গবাসীর বিশ্বাস।কিন্তু গাজন অনেক ধর্মের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়।যেমন শৈবধর্ম প্রভাবিত অঞ্চলে 'শিবের গাজন'যেমন হয়, আবার ধর্মঠাকুর প্রভাবিত অঞ্চলে 'ধর্মের গাজন' আবার বৌদ্ধ ধর্ম প্রভাবিত অঞ্চলে যে গাজন দেখতে পাওয়া যায় তাকে অনেকে 'আদ্যের গাজন' বলেন।গাজন উৎসবের মূল কেন্দ্র শিবের সাথে হরকালির বিবাহ হয় এইদিন এবং সন্ন্যাসীরা যারা ব্রত পালন করেন,তাঁরা বিয়ের বরযাত্রী হিসেবে যোগ দেন।কোথাও এটি 'নীলের গাজন' নামে পরিচিত।আবার যেখানে ধর্মগাজন,সেখানে ধর্ম ঠাকুরের সাথে দেবী মুক্তির বিয়ের জনশ্রুতি পাওয়া যায়।

৪.

আলোচনার প্রসঙ্গ যেহেতু ঘাটাল মহকুমার গাজনের সেসময় এবং বর্তমান সময়।সেখানে বলা চলে,সময় যত বদলেছে পরম্পরাগত এই লোকউৎসবের আদল পাল্টেছে।শহুরে বনেদি পরিবারগুলিতে এই লোকউৎসবে ভাটা পড়লেও গ্রামের মানুষের কাছে গাজন উৎসবের রেশ দিনে দিনে বর্ধিত হচ্ছে।বিশেষ করে উৎসবমুখর ঘাটালে গাজন কয়েক শত বছরের ইতিহাস বহন করে চলেছে একাধিক শিবালয়।ঘাটাল মহকুমার উল্লেখযোগ্য গাজন উৎসব শিবালয়গুলির মধ্যে বেশিরভাগই দাসপুর ঘিরে।যেমন-সোনাখালির শ্রী পঞ্চাননশিব,গোপালনগরের ঝাগড়েশ্বর মন্দির,চককিশোরের গগনেশ্বর মন্দির, চাঁইপাট হাটতলার শিবমন্দির, খেপুতের শিব মন্দির থেকে খেপুতের আমতলা শিবমন্দিরের রাখাল গাজন,দাসপুরের ভুবনেশ্বর জিউ, আবার ঘাটালের শ্রী বানেশ্বর জিউ শিবমন্দির বা আড়গোড়ার শীতলানন্দের মন্দির থেকে চন্দ্রকোণার মল্লেশ্বরপুর উজাননাথ শিবমন্দিরের মতো বহু প্রাচীন শিবমন্দির গাজনের প্রাচীন ইতিহাসের কথা বলে।কিন্ত ঘাটালে এই উৎসব একাল এবং সেকালের দিকে গভীর পর্যবেক্ষণ করলে গাজনের বেশ কিছু রীতির সংযোজন বিয়োজন ঘটেছে বলা চলে।অতঃপর আমরা একটু সেই বিষয়গুলি বৈশিষ্ট্যের সাথে তুলে ধরবো।

নিষ্ঠা ও কঠোর ভক্তি

গাজন উৎসবের কোথাও একমাস বা কোথাও পনেরো দিন  আগে থেকে সন্ন্যাসীরা বাণ বা সন্ন্যাস গ্রহণ করে কঠোর নিয়ম পালন করতেন।নিয়ম হিসেবে একবেলা হবিষ্যান্ন বা ব্রহ্মচর্য পালন করে কৃচ্ছ্রসাধন করতেন।তবে সময়ের সাথে কঠোর নিষ্ঠা,রীতি সন্ন্যাসীদের সেই সংখ্যা পরিবর্তন করেছে বলে অনুমান অনেকের।সোনাখালি পঞ্চাননশিবের মন্দির প্রায় ৩৫০ বছরের পুরানো।এই শিবালয়ের গাজন  চৈত্র মাসের।প্রসঙ্গত, এখানে গাজন উপলক্ষ্যে ১৫ ভোগের মাড়ো হয়।তারকেশ্বরের পর যা বৃহত্তর ভোগের মাড়ো।কিন্ত আধুনিকতার চাকচিক্য প্রথাগত নিষ্ঠা,আচার থেকে অনেকখানি সরিয়ে আনছে মানুষজনকে।প্রসিদ্ধ এই শিবালয়ে গাজনকে কেন্দ্র করে নানা জনশ্রুতি শোনা যায়।উল্লেখ্য গাজনের জন্য একসময় যেখানে পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে সন্ন্যাসী বা ভক্তা নিষ্ঠার সাথে নিয়ম পালন করতেন,সময়ের সাথে সাথে ভক্তাদের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে এখানে ভক্তার  সংখ্যা এখন তিরিশে নেমে এসেছে বলে জানান মন্দিরের সেবাইত অবনী শঙ্কর চক্রবর্তী,অরূপ শঙ্কর চক্রবর্তীরা।এ প্রসঙ্গে অবনী শঙ্কর চক্রবর্তীর মত,'পনেরো দিন ধরে এই কৃচ্ছ্রসাধন আজকাল আর সবাই পেরে ওঠেন না।ফলে সন্ন্যাসীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে।' আবার কোথাও সময়ের সাথে সাথে মহিলা ভক্তার দেখা মেলে বর্তমানে।দাসপুরের ভুবনেশ্বর জিউ শিবমন্দিরের গাজনের সন্ন্যাসীদের মধ্যে অনেক মহিলা সন্ন্যাসীর দেখা মেলে।


আচারের পরিবর্তন

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি গাজন হলো শিবের বিয়ে কেন্দ্র করে উৎসব।যাকে ঘিরে মানুষের উন্মাদনা তুঙ্গে।কিন্ত এই গাজনের আরেকটি মূল আকর্ষণ হল চড়ক।জিভ ফোঁড়,পিঠ ফোঁড়,কাঁটাঝাপ ইত্যাদির মতো নানা খেলা একসময়ে গাজনের জৌলুস বাড়ালেও,বর্তমানে ঘাটালের বেশিরভাগই চড়কে জিভফোঁড়,জিভে কাঁটা ফোঁড়, হিঁদলা, ধুনুচি নাচ হলেও কাঁটাঝাপ, পিঠফোঁড়ের মতো দুঃসাহসিক খেলাগুলি বর্তমানে আর নেই। এর পেছনে অবশ্যই বেশ কিছু দুর্ঘটনা মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মন্দির কর্তৃপক্ষ। দাসপুরের ভুবনেশ্বর শিব মন্দির, গোবিন্দনগরের গাড়া শিবমন্দির, সোনাখালির পঞ্চাননশিব বা চাঁইপাট হাটতলার শিবমন্দিরে চড়কে এমন অনেক চড়কের আচার পরিবর্তন হয়েছে।এমনকি সোনাখালির গাজন উৎসবের একসময় প্রসিদ্ধ ছিল সংযাত্রার অনুষ্ঠান। এখন শুধুমাত্র চড়কের দিনেই এই সংযাত্রার দেখা মেলে।আবার এই সঙ আগে ছিল দেবদেবী,ভূত প্রেত সাজার ধুম।বর্তমানে তা বিজ্ঞানসম্মত হয়ে পড়েছে যা আধুনিকতার বিষয় চোখে পড়ে।

লোকসংস্কৃতির অভাব

গাজন উৎসব যেখানে অনার্যদের অনুষ্ঠান, সেখানে কৃষি কে কেন্দ্র করে এই উৎসবে লোকসংস্কৃতির যে গন্ধ পাওয়া যেত একসময়, বর্তমানে সেই লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্যের অভাববোধ হয়। বেশিরভাগ গাজনের মেলাতে কুমারের তৈরি মাটির বাসন বা কামারের তৈরি লোহার সরঞ্জামের সাথে মাটির পুতুল বা বাঁশের তৈরি জিনিসের দেখা মিলত একসময়।বর্তমানে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র অর্থাৎ আধুনিকতা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে প্রাচীন লোক-সভ্যতাকে। দাসপুরের গোপালনগরের ঝাগড়েশ্বর মন্দির বা ভুবনেশ্বরের শিবমন্দিরের লোক উৎসবের ঐতিহ্য কালের স্রোতে হারাতে বসেছে।গাজন এবং তার মেলা উপলক্ষ্যে মানুষের উন্মাদনা বাড়লেও লোক-ধারা আজকাল আর নেই বললেই চলে।

 ধর্মীয় আবেগ

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গাজন যেহেতু অনার্যদের উৎসব, তাই ব্রাহ্মণ্য,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য, শূদ্র সবার এই উৎসবে থাকার অধিকার থাকলেও ঘাটাল মহকুমার অনেক গাজনেই ধর্মীয় আবেগ কাজ করে। যা বৈচিত্র্যময়। দাসপুরের ভুবনেশ্বর শিব মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ হিন্দুদের সাথে মুসলিমরাও এখানকার চড়কের মেলাতে যোগ দেন।ফলে তৈরি হয়েছে সম্প্রীতির মেলবন্ধন। অন্যদিকে ঘাটালের রামজীবনপুর পার্বতীনাথ মন্দির প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন মন্দির। কিন্ত এই মন্দিরের নিয়ম ছিল বৈচিত্র্যময়। অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল না এই মন্দিরে।এই রীতি নিয়ে বিতর্কও কম ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে ২০০৯ সাল থেকে স্থানীয় মন্দির কমিটি গাজন উৎসবে  সবার জন্যই শিবের মাথায় জল ঢালা থেকে শুরু করে অন্ত্যজদের মন্দিরে প্রবেশ করার অনুমতি দিয়েছেন।এর ফলে একদিকে স্থানীয় অন্ত্যজদের যেমন আনন্দের ছাপ দেখা মেলে অন্যদিকে তেমনই স্থানীয় মন্দির কমিটির মধ্যেও তৃপ্তির যে স্বাদ,তার ছোঁয়া মেলে।

বিনোদনধর্মী এবং বাণিজ্যিক রূপ

কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের এই চড়ক বা গাজন উৎসব ধীরে ধীরে প্রদর্শনী বা মেলায় রূপ নিয়েছে। এমনকি এই চড়ক মেলা এখন স্থানীয় অর্থনীতির একটা বড় অংশ হয়ে উঠেছে। যেখানে হরেক রকমের রকমারি দোকান,সার্কাস বা নাগরদোলার ভিড় জমে।তার পাশাপাশি  আড়ম্বর সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেশ কিছু প্রাচীন রক্ষণশীল মানুষের কাছে। এখনকার গাজনে আলোকসজ্জা,মাইক এবং ডিজে সাউন্ড সিস্টেমের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে লোকসংস্কৃতির মাত্রা ধীরে ধীরে হারাতে বসেছে।তার সাথে বেশিরভাগ মেলার শান্ত এবং গ্রামীণ রূপ ক্ষয় পেয়েছে। সাথে বলা চলে পুরাতনী খাদ্যাভ্যাস ছেড়ে গ্রামের মানুষ মেলাতে ফাস্ট ফুড খাবারের দিকে ঝুঁকছেন।একসাথে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে ড্যান্স ট্রুপ, অর্কেষ্ট্রার প্রতি ঝোঁক কোথাও এককালীন পুতুলনাচ বা যাত্রার মতো বিষয়গুলিকে থামিয়ে দিচ্ছে।

নতুন ধারায় গাজন তথা রাখাল গাজন

দাসপুরের একাধিক ঐতিহ্যের গাজনের পাশাপাশি 

শতাধিক বছরের বেশি পুরোনো এই গাজন খেপুতের রাখাল গাজন বেশ উল্লেখযোগ্য গাজন।স্থানীয়দের মতে,  প্রধানত খেপুত দক্ষিণবাড় নিবাসী -

প্রয়াত নিশি জানা

প্রয়াত রতন জানা 

প্রয়াত সুধন পোড়ে 

 তাঁদের ছোটবেলায় একটি জায়গায় পড়ে থাকা একটা শিবলিঙ্গ নিয়ে এসে তালপাতার ঘর করে প্রতিস্থাপন করে গাজন শুরু করেছিলিন। নিজেরা বাচ্চা বয়স থাকার কারণে বালক সন্ন্যাসীদের  নিয়েই এটার শুরু শতাধিক বছর আগে।এরপর স্থানীয়দের দেওয়া মন্দিরের নাম হয় আমতলা শিব মন্দির এবং রাখাল গাজন।সেই থেকে এখনও চলছে এই গাজন। প্রতি বছর বেশ ঘটা করে পালিত হয় এই গাজন উৎসব। প্রতি বছর প্রায় ৫০ এরও বেশি বাচ্চা এখানে সন্ন্যাসী হয়। ১২-১৩ বৎসর বয়স অবধি পর্যন্ত যে কেউ এখানে সন্ন্যাসী হতে পারে। পরবর্তী তে খেপুতেরই আরেক বাসিন্দা অষ্টপদ বেরা'র উদ্যোগে এই মন্দির এর পুনর্নির্মাণ হয়।যা অনেকেরই অজানা বিষয়।

৫.

পরিশেষে বলা যায়,কৃষিকেন্দ্রিক ঘাটালের আর্থসামাজিক ছবি দেখতে গেলে বিভিন্ন গ্রাম্য উৎসবের অবদানসমূহের সাথে গাজন উৎসবের অবদান কম না। তবে,সময়ের স্রোতে এবং মানুষের রুচির পরিবর্তনে  ঘাটালের গাজন মেলাগুলির বিকিকিনি থেকে শুরু করে নিজ চরিত্র পালটালেও, ভাবের পরিবর্তন হয়নি একথা বলা চলে। আধুনিকতার পাশাপাশি ঐতিহ্যকে সাথে নিয়ে, নতুন পুরাতনীর মেলবন্ধনে আজও ঘাটালের গাজন মেলাগুলি লোকায়ত ইতিহাসের কথা বলে। বহু যুগ ধরে লোকউৎসবের যে পরম্পরা চলে আসছে ঘাটালের মানুষজন তাকেই লালন পালন করে করে চলেছেন। যে লোকউৎসব লোকজীবনের সামগ্রিক রূপ প্রকাশ করে।একটা জনজাতির সর্বজনীন রূপকে ফুটিয়ে তোলে।

  


 ঋণ -

১. অবনী শঙ্কর চক্রবর্তী; সোনাখালি।

২. অরূপ শঙ্কর চক্রবর্তী; সোনাখালি।

৩. উমাশংকর নিয়োগী; চাঁদপুর।

৪. তাপস পাল; খেপুত।

৫. সৌমেন চট্টোপাধ্যায়; খেপুত।

৬. নিমাই রূইদাস; রামজীবনপুর। 

৭. অশোক গোস্বামী; দাসপুর।

তথ্যসূত্র -

১. বাংলার লৌকিক দেবতা: গোপেন্দ্রকৃষ্ণ বসু,দে'জ পাবলিশিং।

২. গাজন : মনোজিত অধিকারী,দে'জ পাবলিশিং।

৩. বাংলা মঙ্গলকাব্য:দীপঙ্কর মল্লিক,দিয়া পাবলিকেশন।



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪






No comments:

Post a Comment

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৯

ঘাটাল মহকুমায় গাজনের সেসময় এবং এসময় আশিস করণ ১. ভারতের যে সকল প্রাগৈতিহাসিক দেবতা পরবর্তীকালে হিন্দু সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠা স্থাপন করতে ...