Friday, 20 March 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ২

 


ঘাটাল ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদের গাজন ও গাজন মেলা

মহাশ্বেতা দাস

   

নিত্যদিনের টানাপোড়েনের দিনলিপির নদীটা ডিঙিয়ে আমরা সবাই একটা পাহাড়ের খোঁজ করি…. যে পাহাড়টা খুশীর পাথর দিয়ে তৈরী! সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আছে এক মস্ত আনন্দের বাগান! সেই বাগান থেকে দু একটা ফুল নিত্য দিনের মন খারাপের আঙিনায় টুপটাপ করে ঝরে পড়ে, বাগানের লতাপাতা ব্যস্ত জীবনের নিত্য দিনের টানাপোড়েনের ফাঁক ফোকর দিয়ে উঁকি দেয় মাঝে মাঝে…. ছুঁয়ে যায় মন। 

আমাদের ছোটবেলাটা বিলাস বহুল ছিল না মোটেই। ইচ্ছে করলেই গাড়ী নিয়ে এদিক ওদিক মেলা দেখতে চলে যাওয়া সম্ভব হতো না। খুব দামী খেলনাও পাইনি আমরা সেদিন। কিন্তু অনেক না পাওয়ার মধ্যেও যেটা ছিল….. সেই “রাজার বাড়ীর” মতোই আমাদের একটা মস্ত হাসিখুশীর পাহাড় … যে পাহাড়ে ছিল আমাদের  অবাধ বিচরণ, অনায়াস যাতায়াত আর ছোট ছোট আনন্দ নিয়ে ভরা। সেকথাই লিখে রাখবো একটু একটু করে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে।

আজ লিখতে বসেছি ঘাটাল ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদের গাজন ও গাজন মেলা সম্বন্ধে।  লিখতে বসে ভাবছি কোনদিক থেকে শুরু করবো!! এমনটি ভাবার কারণ আমাদের বসত বাড়ীর ভৌগোলিক অবস্থান। সীমানা ভাগ করলে আমরা ঘাটালের  আড়গোড়া গ্রামের বাসিন্দা। কিন্তু বাড়ির একটু দূর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি পার হলেই যে আলামগঞ্জ…. রথতলা…. বানেশ্বর শিব মন্দির!! আর সেই কবেকার ইস্কুল বেলা থেকে ঐ পথেই যে নিত্যদিনের যাওয়া আসা। নিজের গ্রামে খুব কাছাকাছি দুটো শিব মন্দির একটির প্রচলিত নাম বুড়া শিব মন্দির এবং অন্যটি বিশ্বেশ্বর শিব মন্দির। তারও খানিক দূরে আরও কয়েকটি শিব মন্দির আছে ঠিকই। তবে ওদিকটিতে যাওয়া আসা হয় অবরে সবরে। তাই পাশের গ্রাম আলামগঞ্জ…… ঘাটাল পৌরসভা পেরিয়ে রথতলার দিকে হাঁটা দিলে মিনিট পাঁচেক পরেই দেখা মেলে শ্রী শ্রী বানেশ্বর জিউ শিব মন্দিরের। ছোট বেলায় ঠাকুমার হাত ধরে এখানেই গাজন দেখতে আসা। হিন্দলা হতো এখানে। অবাক বিস্ময়ে শৈশব কৈশোরের কৌতূহলী চোখ অভিভূত হয়ে যেত এসব কান্ড দেখে। কথিত আছে বর্ধমানের রাজা রাজচন্দ্র চক্রবর্ত্তী কর্ত্তৃক ১২০৯ বঙ্গাব্দে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। বাবা বানেশ্বর পূজিত হতেন তৎকালীন সেবাইত আশালতা দেবী (চক্রবর্ত্তী) দ্বারা। আশালতা দেবীর কোন পুত্র সন্তান ছিল না। তাই তাঁর পরবর্তী সময়ে হুগলী জেলার রাজহাটি নিবাসী জামাতা শম্ভুনাথ চক্রবর্ত্তী এই মন্দিরে পৌরোহিত্যের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন। শম্ভুনাথ চক্রবর্ত্তীর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর দুই পুত্র গোপাল চক্রবর্ত্তী ও নেপাল চক্রবর্ত্তী মন্দিরে পৌরহিত্যের দায়িত্ব পালন করছেন। এই মন্দিরে শিবরাত্রি, গাজন ইত্যাদি অনুষ্ঠান খুবই সাড়ম্বরে পালিত হয়। পাশাপাশি গ্রাম থেকে বহু মানুষ আসেন এখানে ব্রত পালন করতে, শিবের আরাধনা করতে। চৈত্র মাসের শেষে গাজন উপলক্ষে প্রায় তিন দিন ধরে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। 

   সেদিন বিকেলে সৎসঙ্গ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে ঢালাই রাস্তা বরাবর হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম আমাদের গ্রামের শ্রী শ্রী শীতলানন্দ জিউ শিব মন্দিরে। যদিও ছোটবেলা থেকে বুড়া শিবের মন্দির বলেই আমরা জানি। মন্দিরের উঠোনেই দেখা হয়ে গেল মন্দিরের সেবাইত অরুণা দেবীর সাথে। উনি যোগেন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্রবধূ। প্রায় চার পুরুষ ধরে এঁদের পরিবার এই মন্দিরের সেবাইতের কাজে যুক্ত আছেন। তাই এমন সুযোগ আর হাতছাড়া করতে মন চাইলো না। দেখতে দেখতে গ্রামের আরও কয়েকজন এসে জুটে গেল উঠোনে। সবে মিলে বিকেলের গল্পটা জমে উঠলো দারুণ। আরে হ্যাঁ সেই গল্পটাই তো বলবো।

     এই গ্রামের গৌর মাঝি ছিলেন প্রচুর জমির মালিক।  আজ যেখানে বুড়ো শিবের মন্দির, গৌর মাঝির এই তেরো কাঠা জমিতে তুঁত চাষ হতো। একদিন চাষীর কোদালে ঠেকলো এক লম্বা আকৃতির পাথর। চাষীরা সেটিকে তুলে ফেলে রেখে এলো ধানের খামারে। বাড়ির মেয়েরা দেখলো… বাঃ বেশ সুন্দর একটি চকচকে মসৃণ পাথর! তুলে নিয়ে গিয়ে মশলা বাটার কাজে লাগিয়ে দিল। কিন্তু এ তো যে সে পাথর নয়!! তাই তাঁর গা জ্বালা জ্বালা করতে লাগলো। সহ্য করতে না পেরে পাথরটি  নেমে গেল পাশের পুকুরে। রাজেন্দ্র বেরা  প্রাতঃক্রিয়া সারতে এসে ঘাটে নেমে দেখলেন একটি বাচ্চা ছেলে শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। তুলে নিয়ে গেলেন নিজের ঘরে। ক্রমে ক্রমে বুঝতে পারলেন এ ছেলে কোন সাধারণ ছেলে নয়। রাতে স্বপ্নে জানতে পারলেন ইনি বাবা তারকেশ্বরের ছোট ভাই শীতলানন্দ। রাজেন্দ্র বেরা তাঁর উপলব্ধির কথা জানালেন পাশাপাশি গ্রামের বাসিন্দাদের। আড়গোড়া, শুকচন্দ্রপুর, রঘুনাথচক, শ্যামপুর ও গম্ভীরনগর এই পাঁচটি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সভা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো এখানে বাবা শীতলানন্দের মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১৩৪৫ বঙ্গাব্দে নারায়ণ চন্দ্র মন্ডল এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের পূজারী হিসেবে নিযুক্ত করা হয় যোগেন্দ্র চক্রবর্তীকে। ক্রমে ব্রতীদের আনাগোনায় এবং নারায়ণ চন্দ্র মন্ডলের তত্ত্বাবধান ও যোগেন্দ্র চক্রবর্তীর নিষ্ঠা সহকারে পূজার্চনায় মন্দিরটি ধীরে ধীরে একটি জনপ্রিয় মন্দিরের রূপ নিল। যোগেন্দ্র চক্রবর্তীর অবর্তমানে মন্দিরের পূজারী হিসেবে নিযুক্ত হন তাঁর পুত্র ফকির চন্দ্র চক্রবর্তী এবং তাঁর পরবর্তী সময়ে ফকির চন্দ্র চক্রবর্তীর পুত্র দীপক চন্দ্র চক্রবর্তী। নিত্য পূজার্চনা তো ছিলই…. এছাড়াও মকর সংক্রান্তি, গাজন, চড়ক, শিবরাত্রির মতো দিনগুলিতে মন্দির প্রাঙ্গণ উৎসবের আমেজ বিরাজ করে এগিয়ে চললো। কিন্তু এতদিনের পুরানো মন্দিরের চারদিক দিয়ে গাছ উঠে দেওয়ালে ফাটল ধরলো….. ছাদ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো…. একসময় মন্দিরটির বেহাল দশা!! ১৪০৫ বঙ্গাব্দে এই গ্রামের ভূমিপুত্র প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব একাধারে সাহিত্যিক ও অধ্যাপক গুণময় মান্না মহাশয় এবং ওনার সহধর্মিনী অধ্যাপিকা উমা দেবী এই মন্দিরটি নবনির্মাণ করে সংস্কার সাধন করেন। বর্তমানে দীপক চন্দ্র চক্রবর্তীর স্ত্রী অরুণা দেবী এবং তাঁর দুই পুত্র রাজীব কুমার চক্রবর্তী ও গৌতম চক্রবর্তী এই মন্দিরে সেবাইতের কাজ করে চলেছেন। মকর সংক্রান্তি ও শিবরাত্রি পালন তো আছেই। এছাড়াও চৈত্রের শেষে প্রায় এক সপ্তাহ জুড়ে চড়ক, গাজন, ধুনোপোড়া, হিঁদলা কে কেন্দ্র করে মেলা বসে। 

       এছাড়াও আগেই যে পাঁচ গ্রামের কথা বলেছি তার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র শিব মন্দির। এই তো একটু দূরে মাঝি পুকুরের পাড়ে রয়েছে বাবা বিশ্বেশ্বর শিব মন্দির। আজ এই পর্যন্তই থাক। বাকি মন্দির গুলির সমন্ধে না হয় পরবর্তী পর্বে বলা যাবে।


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

প্রচ্ছদ - বিশ্বজিৎ ভৌমিক

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

No comments:

Post a Comment

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ২

  ঘাটাল ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদের গাজন ও গাজন মেলা মহাশ্বেতা দাস     নিত্যদিনের টানাপোড়েনের দিনলিপির নদীটা ডিঙিয়ে আমরা সবাই একটা পাহাড়ের ...