Friday, 27 March 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৪

 


৺শ্রী শ্রী যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্র শিব মন্দির 

জনার্দনপুর • উত্তরধানখাল • দাসপুর • পশ্চিম মেদিনীপুর

বিশ্বজিৎ ভৌমিক 


আজ থেকে আনুমানিক ৩৫০ বছর পূর্বে, বর্ধমান রাজা শোভা সিংহের অর্থানুকূল্যে চুন, সুরকী এবং পোড়া পেটের ভিতে এই মন্দির নির্মিত। বর্তমানে এই পুরাতন আদলের উপর পেমেন্টের কলেক আবৃত হয়েছে মন্দিরের প্রাচীনতা। বিলীন হয়ে গেছে নাটমন্দির, নহবতখানা, ভোগশালা, ভান্ডারঘর। মন্দিরের পশ্চাৎ ভাগে কংসাবতী নদীতে ভগ্নপ্রায় অবস্থায় এখনো পাকার ঘাট বিদ্যমান রয়েছে। ঘাটটিও নির্মিত হয়েছিল পোড়া মাটির ইট ও চুন সুরকীতে। বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনো শতাধিক যাত্রী একস‌ঙ্গে স্নান করতে পারে। সুপ্রাচীন বটবৃক্ষ (বয়স আনুমানিক চারশত বৎসর) ছায়ায় নদীর শীতল বাতাসে পথিকজন এখনো ক্ষনিক বিশ্রাম করেন। মন্দির গাত্রের টেরাকোটার কাজ বর্তমানের শিল্পকলায় ঢাকা পড়েছে। চলে আসা পরম্পরা অনুযায়ী জানা যায় যে যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্র শিব শম্ভু রাজনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের যদপুর গ্রামে প্রথম ভাগে পূজিত হতেন। বর্তমান সেবাইতগণের পূর্বপুরুষোত্তম তুই যজ্ঞেশ্বর চক্রবর্তী ছিলেন যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্র শিবের নিত্য সেবক। প্রত্যহ নদী পার করে যদুপুরে পুজোর জন্য আসতেন। বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বয়সের ভার প্রভৃতি কারণে তিনি মনোদুঃখ যজ্ঞেশ্বরের শ্রীচরণে নিবেদন করলে যজ্ঞেশ্বর যজ্ঞেশ্বরের সেবা গহনে যদুপুর ত্যাগ করে জনার্দনপুরে কংসাবতী নদী তীরে বটবৃক্ষ তলে স্বয়ম্ভু অবস্থায় অবতীর্ণ হয়ে স্বপ্নাদেশ দ্বারা পূজা প্রচলনের নির্দেশ দেন। অদ্যাবধি সেই ধারায় নিত্য পূজা সেবাকার্য যথা নিয়মে প্রতিপালিত হয়ে চলেছে। গর্ভগৃহের গভীর কুণ্ড মধ্যে স্বয়ম্ভু মহারুদ্র যজ্ঞেশ্বর শিব অধিষ্ঠিত। কথিত আছে যজ্ঞেশ্বর স্বপ্নাদেশ দ্বারা বলেছিলেন যে তার পূজার বন্দোবস্ত তিনি নিজেই করে নেবেন। কোথাও সেই সত্য আজও যেন সুরক্ষিত। কোথাও সেই সত্য আজও যেন সুরক্ষিত। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও থেকে তার নিত্য পূজার গোদগ্ধ, শর্করা, ডাব এবং গঞ্জিকা কোন না কোন ভক্ত সূর্যাস্তের পূর্বেই মন্দিরে নিয়ে আসেন। এই ধারা বিজ্ঞানের বাড় বাড়ন্তের যুগেও অব্যাহত। তাই মন্দিরে সবার মাথা আজও শ্রদ্ধায় নত হয়ে যায়। যদুপুরের সেই সুপ্রাচীন শিব গহ্বর যেখানে যজ্ঞেশ্বর অবস্থান করতেন সেটি আজও অবিকল রয়েছে ঘাস, পাতা ঢাকা অবস্থায়। প্রতি বছর গাজন উৎসবের নবম দিনে সেখানে পূজা করা হয়। 

বর্তমানে যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্রের মন্দির এক ভোগশালা সহ মূল গর্ভগৃহে সজ্জিত। সুউচ্চ চূড়া‌।  চুড়াশীর্ষে একটি তাম্র ত্রিশূল বিদ্যমান, উচ্চতা প্রায় ৫০ ফিট। মন্দিরটি দক্ষিণ দুয়ারী। পশ্চিম ভাগে নদী থেকে সোজা প্রবেশ করা যায়। মন্দিরের পশ্চিমাংশে সুপ্রাচীন বটবৃক্ষমূলে যজ্ঞেশ্বরের বাহন নন্দী শায়িত রয়েছেন। আর রয়েছে সন্ন্যাসীদের শপথ গ্রহণ সূর্যস্তম্ভ। অদূরেই অগ্নি উপাচারে শিব সাধনার হিন্দোল মঞ্চ। আগে ছিল কাঠের তৈরি দরজা বর্তমানে সেটি লৌহ নির্মিত।

প্রতিবছর চৈত্র মাসে ১৬ তারিখ সন্ধ্যায় ঢাক বাদ্য এর (ম‌উলা) পূজা দ্বারা (ধুম্বুল) যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্রের গাজন উৎসবের মন্দিরে পূজার সূচনা হয়। এখানে নয় দিবস ধরে গাজন উৎসব সম্পন্ন হয়। যা এখানকার গ্রামীণ ভাষায় ন-ভোগের মাড়ো। অতঃপর ১৬,১৭,১৮,১৯ শে চৈত্র পর্যন্ত ঢাকা সহযোগে নিত্য পূজা চলে। ১৯ শে চৈত্র বিকালে যজ্ঞেশ্বর ১৭ গ্রামের ঠাকুর হওয়ায় তার ভক্তদের বাড়ি বাড়ি পুরোহিত ঠাকুর ভিন্ন পত্র বিতরণের মাধ্যমে গাজনের আমন্ত্রণ জানান গ্রাম্য কোথায় এর নাম 'মালা কেরানো'। পরদিন ২০শে চৈত্র অতি প্রত্যুষে চাঁচর ঢাকের বাধ্য সহযোগে দেউল তোলা হয় এবং মাগুর মাছ বলি দেওয়ার কথা আজ‌ও অব্যাহত। এর নাম কামিন্যা উঠানো। এরপর নতুন বাঁশের মাথায় ত্রিকোণ লাল নিশান বেঁধে মন্দির বাঁচতে রাখা হয়। একে বলা হয় দেউল বাঁশ। 

প্রতিদিন চলতে থাকে ভোগ মোদার পূজা। প্রথম দিন পুরোহিত ব্রাহ্মনের ভোগ। পাশাপাশি সবাই ঐ দিন পুরোহিত ব্রাহ্মণের গৃহে আমন্ত্রিত হয়ে জলযোগের দ্বারা শিব প্রসাদ গ্রহন করেন। দ্বিতীয় দিন পাট ভোক্তার ভোগ। ক্রমান্বয়ে তৃতীয় চতুর্থ পঞ্চম ও ষষ্ঠ দিন গুলিতে যথারীতি মোদা হয় রাজার ভোগ, দেশের ভোগ, গোয়ালার ভোগ এবং পাখিরার ভোগ। ৭ম দিবস এর নাম ছোট ভোগ। ঐ দিনই গ্রাম বা দূরের গ্রাম  এখন শহর থেকেও বাবার মানত পরিশোধের নিমিত্ত সবাই মন্দিরে উপস্থিত হয়ে নব বস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কংসাবতী তে স্নান সেরে মন্দির দ্বারে উপস্থিত হয়ে সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন। কোনো কোনো বৎসর সংখ্যা ৬০ এর অধিক হয়ে যায়। স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে ব্রত গ্রহন করতে পারেন। কোনো বাধা কারুকে করা হয় না। ৮ম দিন বড়ভোগ, ভোগ সংখ্যা ২৯ টি পরিবার, অধিক রাত্রে সন্ন্যাসীরা ফেরেন, ভোগ রান্না করে নিবেদন করতে রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যায়। নবম দিন ভোগের নাম গুড়ান ভোগ, ঐ দিনই যদুপুরে বাবার পুরানো কুন্ডে পূজা নিবেদন সহ ভোগ মোদা হয়। দশম দিন মহা সমারোহে সহস্রাধিক ভক্ত পূন্যার্থী সমাগমে কংসাবতী নদী থেকে জল নিয়ে সবাই মন্দিরে বাবার মাথায় ঢালেন। চলে বেলা গড়িয়ে এক দিনের মেলা। রাত্রিতে মহাসমারোহে বাবার মহা মিলন পূজা বাদ্য বাজি আলোক সজ্জা সহযোগে সম্পন্ন হয়। পর দিবস অখণ্ড পোড়ানো, তারপর কাঁটা গড়ানো সন্ন্যাসীদের ব্রতভঙ্গের মধ্য দিয়ে গাজন পর্বের সমাপ্তি হয়। ছোট ভোগের দিন থেকেই চলতে থাকে প্রতি সন্ধ্যায়, জলন্ত দন্ড সহযোগ নৃত্য, দেউল দৌড় হাত চালা, মাথা চালা প্রভৃতি শিব পূজার আঙ্গিক সহ শিব সাধনা। জলন্ত অগ্নিকুন্ডে ধূনা পুড়িয়ে হিন্দোল দোল। দেখতে ভিড় করে গ্রাম ও পাশাপাশি গ্রামের অসংখ্য নরনারী।

যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্র শিবের ভক্তরা বিশ্বাস করেন যে বাবা খুবই জাগ্রত। এ বিষয়ে অগাধ  বিশ্বাস মানুষ জনের। বন্যা কাতর জনার্দনপুরবাসী যজ্ঞেশ্বরের অপার করুণাতেই নদী ভাঙ রুখতে পারেন। এ সম্পর্কে কথিত আছে ভাঙে ভাঙে বাঁধ, বাবার দয়ায় আর ভাঙে না। অতীত থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর দহতে জল কখনও শুকানো হয় না। নানান প্রজাতির মাছের ঘর যজ্ঞেশ্বরের দহ। অতীত দেখ শুকায়নি। সন্তান হীনাদের কোল আলো করে বাবার কৃপায় সন্তান আসে বলে ভক্তরা আজ‌ও বিশ্বাস করে মানত করে ফল পেয়ে থাকেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে হত্যে দিলে যাতে হাতে হাতে ফল মেলে। এটি ধ্রুব সত্য বলে সবাই বিশ্বাস করে থাকেন। এটিকেই বলা হয় বাবার নিত্যটান বা বিশেষ আকর্ষন। বাবার একটি বিখ্যাত গান গান হচ্ছে...

"যজ্ঞেশ্বরের চরণের সেবা লাগে

তোমার সেবক তোমার ডাকে

মহাদেব মহাদেব"।

যগেশ্বর মহারুদ্র শিবের গাজন উপলক্ষে প্রচলিত বিশাল বড় মেলার প্রচলন নাই। কেবলমাত্র মহামেল উপলক্ষ্যে এক দিবসীয় মেলা ও রাত্রিতে কবিগানের আসর বসে। মাঝে মধ্যে যাত্রা, বাউল, লোকগান অথবা বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়েজন হয়।

যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্র শিবের নিষ্কর সম্পত্তি শিবোত্তরের নামে সেবাইত গণের মধ্যে বিলি বণ্টন করা আছে। সেই চাষাবাদ এবং সামান্য কিছু ভক্তদের দ্বারা সেই সংগৃহীত অর্থে পূজা ও সেবা কার্য চলে আসছে। মন্দির চত্ত্বরটি রক্ষণাবেক্ষণ সহ আকর্ষনীয় পরিবেশ সৃষ্টি হলে ভবিষ্যতে একটি স্থানীয় গ্রাম্য ভ্রমন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। 

তথ্য ঋণ :-

বর্তমান সেবাইতগনের পক্ষে -

সুশান্ত চক্রবর্তী 

সুনীল চক্রবর্ত্তী

অশোক চক্রবর্তী

সুশীল চক্রবর্তী 

অলোক চক্রবর্তী

এবং অন্যান্যরা

চিত্র ঋণ : সুব্রত পাত্র ও নিজস্ব চিত্র



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪






No comments:

Post a Comment

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৪

  ৺শ্রী শ্রী যজ্ঞেশ্বর মহারুদ্র শিব মন্দির  জনার্দনপুর • উত্তরধানখাল • দাসপুর • পশ্চিম মেদিনীপুর বিশ্বজিৎ ভৌমিক  আজ থেকে আনুমানিক ৩৫০ বছর পূ...