Tuesday, 14 November 2023

রবীন্দ্র পরম্পরা // ই-কোরাস ৪৪

 



রবীন্দ্র পরম্পরা 

পর্ব - ৪৪

আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার

মহাশ্বেতা দাস 


         

     "দুখের রাতে নিখিল ধরা যেদিন করে বঞ্চনা

             তোমারে যেন না করি সংশয়।।"

    

           সারা জীবন ধরে বিশ্ববাসীর মনের ভার লাঘব করেছেন বিশ্বকবি। ব্যক্তিগত জীবনে নিরন্তর যন্ত্রণা ভোগ করেও ঈশ্বরের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই, উল্টে বলেছেন…. 

 "পুণ্য সঞ্চয় করলেই স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে এই কথাই চলতি কথা; কিন্তু আমি বলছি যে, আমি স্বর্গ থেকেই পুণ্যের জোরে মর্তে নেমে এসেছি।"  


            তবু আজ যখন (১৯৪১সালের শ্রাবণ মাস)                                             

       "সময় হয়ে এল এবার, 

    স্টেজের বাঁধন খুলে দেবার।"         


    এ বাঁধন তো আজকের নয়, সেই শিশুকালে পিতৃদেবের সাথে হিমালয় ভ্রমণে বেরিয়ে প্রথম ভুবন ডাঙায় আসা.... তারপর পরিণত বয়সে সারা বিশ্ববাসীকে এক ছাদের তলায় নিয়ে আসার ভাবনা নিয়ে "বিশ্বভারতী"র সৃষ্টি। দীর্ঘ সত্তর বছর ধরে একটি একটি ভালবাসার ফুল দিয়ে, আন্তরিকতা আর স্নেহ মমতার সুতোয় গাঁথা হয়েছে যে মালা, তাকে খুলে দেওয়া তো সহজ কথা নয়।! সে মালার বাঁধন ছিঁড়তে গেলে তো বাজবেই! 

     

      ১৯৪০ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর শান্তিনিকেতন থেকে কালিম্পংয়ে পুত্রবধু প্রতিমা দেবীর কাছে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কালিম্পংয়ে ২৬শে সেপ্টেম্বর রাতে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে ছুটে এলেন দার্জিলিংয়ের সিভিল সার্জন। রক্ত পরীক্ষার পর জানা গেল প্রস্টেট গ্ল্যান্ডে সমস্যা…. দ্রুত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ কলকাতা থেকে চিকিৎসক নিয়ে এলেন কালিম্পংয়ে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথকে কলকাতায় নিয়ে আসা হলো…..  প্রায় এক মাস শয্যাশায়ী থাকলেন। একটু সুস্থ হলে কবি  ফিরে যেতে ব্যকুল হলেন প্রাণপ্রিয় শান্তিনিকেতনে। শান্তিনিকেতনে কবির থাকার ব্যবস্থা হলো উদয়ন ঘরে…..   এবং সবসময় দেখাশোনার জন্য রইলো চিকিৎসক ও নার্স।  রবীন্দ্রনাথ নিজের হাতে লিখতে পারেন না আর….. তাই বলে লেখনী কি থেমে থাকতে পারে!!!! কবি মুখে মুখে বলে চলেন কবিতার লাইন আর শ্রুতিলিখনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সচিব অনিলকুমার চন্দের স্ত্রী ও রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা রাণী চন্দ খাতা কলমে লিখে রাখেন কবির সেই সময়ের অমর সৃষ্টি।


      কিন্তু কোন চিকিৎসাতেই আর তেমন কোন সাড়া মিলছে না। কবির শরীরের  অবনতি হচ্ছে ক্রমশঃ। কলকাতা থেকে ডাক্তার ইন্দুভুষণ বসু, বিধানচন্দ্র রায়, ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ও পারিবারিক বন্ধু জ্যোতিপ্রকাশ সরকার এলেন শান্তিনিকেতনে । আলোচনার এক পর্যায়ে বিধানচন্দ্র রায় রবীন্দ্রনাথকে বললেন, 'আপনি আগের থেকে একটু ভালো আছেন। সে কারণে অপারেশনটা করিয়ে নিতে পারলে ভালো হবে, আর আপনিও সুস্থ বোধ করবেন।' সবাই অপারেশনের পক্ষে মত দিলে রবীন্দ্রনাথ সবার অনুরোধে রাজি হলেন। এরপরই সিদ্ধান্ত হলো রবীন্দ্রনাথের অপারেশন করা হবে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে। ১৯১৬ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসা করছিলেন কবির বন্ধুবর বিখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক  নীলরতন সরকার। বিশেষভাবে উল্লেখ্য চিকিৎসক  নীলরতন সরকারও চাননি এই বয়সে অপারেশন হোক রবীন্দ্রনাথের…… রবীন্দ্রনাথ অপারেশন পরবর্তী ধকল নিতে পারবেন না বলেই তাঁর ধারণা। তাই তিনি ওষুধ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মত দিয়েছিলেন। হঠাৎ ওনার স্ত্রী মারা যাওয়ায় গিরিডিতে চলে যান তিনি এবং গিরিডিতে পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন। ওনাকে না জানিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেলো অস্ত্রপ্রচারের। ভারাক্রান্ত মনে সায় দিলেন কবি।

     

         "খেলনা খোকার হারিয়ে গেছে, 

                  মুখটা শুকনো।

                  মা বলে দেখ, 

        ওই আকাশে আছে লুকোনো।"

    

          ১৯৪১সালের ২৪শে জুলাই সঙ্গীতভবনের অধ্যাপক শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কথায়…. 

"বিকেলের দিকে সঙ্গীত ভবনে বসে আছি। হঠাৎ করেই খবর পেলাম যে, কালই (২৫শে জুলাই) গুরুদেব কে অপারেশনের জন্য কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। মনে আছে- বিকেলের পড়ন্তবেলা, দিনের শেষে পশ্চিমের আকাশে রবি ঢলে পড়েছে। আর ঠিক সেই সময় আমাদের সবার পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রাণের রবি ঠাকুরের আশ্রম ছেড়ে কলকাতা যাত্রার খবরে মনটা কেমন উদাস ও বিষণ্ণ হয়ে গেল। তাই মনে মনে ঠিক করলাম যে, আমরা বৈতালিকের গানে গানে তাঁর ঘুম ভাঙিয়ে দেবো।" 


          কিন্তু আজ কবির চোখে ঘুম এলে তবে তো ঘুম ভাঙানো...!! সারা জীবন ধরে এতো বিচ্ছেদ বেদনা সহ্য করেছেন। এই বোধয়  কবি জীবনের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিচ্ছেদবেদনা!!

             

      "পথে চলা এই দেখাশোনা

           ছিল যাহা ক্ষণচর

      চেতনার প্রত্যন্ত প্রদেশে,

  চিত্তে আজ তাই জেগে ওঠে;

      এই সব উপেক্ষিত ছবি 

    জীবনের সর্বশেষ      

               বিচ্ছেদবেদনা    

    দূরের ঘণ্টার রবে 

           এনে দেয় মনে।।" 

            ………………….



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


Sunday, 12 November 2023

তুষারকান্তি ঘোষ এর গুচ্ছ কবিতা // ই-কোরাস ১৫৪

 


তুষারকান্তি ঘোষ এর গুচ্ছ কবিতা

১.

আমি যেমন, খেলা তেমন


তুমিও জানো না কেন একদিন শূন‍্যতার অন্ধকার মেখে গাছ হয়ে গেলাম

আকাশের গোপন রাস্তা জেনে ছুঁয়ে এলাম কেটে-যাওয়া ঘুড়ির সুতো


একদিন একটুকরো ভালোবাসা ঝর্ণা থেকে নদী হয়েছিল-------


তুমি জানো না কখন কি হব, কার কাছে ধরা পড়ব

কে আবার  ধরা দেবে বলেও দেবে না ধরা

আয়ুষ্কাল পুড়বে জেনেও, ঢেউ ভাঙবে জেনেও আকর্ষন বিকর্ষনের মাঝে শূন‍্য থেকে শুরু করি বারবার


তুমি জানো না সব খেলাই ঘুর্নাবর্ত, নিজেকে পুড়িয়ে সত‍্যিকারের নিজেকে জানা 

এইসব মিছিমিছি খেলা আসলে তোমার হাত ধরে অনন্ত পথের পথিক হবার উদগ্র  বাসনা!


২.

বিনিময়


(পরাণ আমার বধূর বেশে চলে চিরস্বয়ম্বরা)


আগুনের ঢেউ দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আছি 


এতদিন বুদ ছিলাম জ‍্যোৎস্না-ঘুমে

সামাজিকতাও সেভাবে শিখিনি

কিভাবে আপ‍্যায়ন করি তোমাকে?


নদীজল দিয়ে মুছেছো বিষণ্ণ কাজলের দাগ


এরকম দুঃখ যন্ত্রনা সকলেরই আছে


আগুন ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রানে, মনে, চারিদিকে

আজ বেহিসেবি স্বপ্ন সব হারিয়ে যাক বিনিময়-সুখে


৩.

জল থইথই দিন


আজকাল বাতাস এতই গরম যে জীবন-নাটকে মানুষ বাষ্প হয়ে ভেসে যায় 


আমরা সবাই জটিল প্রশ্নের কাছে জবাববিহীন


তুমি কতটা যন্ত্রনাগ্রস্থ, কেন তোমার শুশ্রুষার কেউ নেই, কেন তাচ্ছিল্যের মত পরিধির বাইরে রাত কাটাও

তারও কোন মীমাংসা হয়নি 


শেষ সত‍্য জানতে একটি জল-থইথই দিন চাই

শরীর ভিজলে তবেই শুরু হবে মনের কাঁপন


আসলে মেঘ দেখলেই ভালোবাসা  মালা পরে, গায়ে মাখে হলুদ -চন্দন!


৪.

বনবাংলোয়


কখনো কখনো অনামী বিকেলে বনবাংলোয় উড়ে আসে পাতা ও পালক


রূপকথামন যে হাসির প্রতীক্ষায় ছিল সে হাসি

 ভরিয়ে দেয় আকাশ বাতাস, বেজে ওঠে সপ্তসুর


নীল-নির্জন-নিঃশ্বাস চুম্বকের মত টানে 

প্রজাপতি-রাতে ঘাসের ভিতর থেকে মুখ তোলে অজস্র গোলাপ


প্রতিটি মুহূর্ত সাহস যোগায়


ভেতরে যখন বৃষ্টির ধারাপাত, পরকীয়া হোক বা না হোক

পটভূমি আনমনা সুগন্ধে একটি ভালোবাসার ছবি আঁকে 


৫.

এক কবির কথা


জমানো অপমান আগুনে পুড়িয়েছি

দুঃখ খেয়েছে পরমায়ূ


তবু

নিষ্পত্র বৃক্ষেরও প্রতিবাদী স্বর থাকে


দান গ্রহন করতে পারিনি

 দাতার অহংকার আমাকে আহত করেছিল


রক্ত -নিংড়ে- লেখা সব কবিতাই মন্ত্রের মত


কেউ জানতো না সূর্য চন্দ্র গ্রহ নক্ষথ্র পেরিয়ে 

নীহারিকা ও ছায়াপথে আমার ছিল অনায়াস যাতায়াত 

                ……………….. 


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


Tuesday, 7 November 2023

রবীন্দ্র পরম্পরা // ই-কোরাস ৪৩

 


রবীন্দ্র পরম্পরা 

পর্ব -৪৩

সকল গানের ভাণ্ডারী

মহাশ্বেতা দাস 


   "আমার যে সব দিতে হবে সে তো আমি জানি 

               আমার যত বিত্ত প্রভু 

       আমার যত বাণী সব দিতে হবে।" 


বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যের সমস্ত শাখায় রবীন্দ্র প্রতিভা হিমাদ্রি চূড়ার মতোই জাজ্বল্যমান। তবুও বিশ্বের দরবারে তাঁর অন্যান্য সৃষ্টি অপেক্ষা সঙ্গীত স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ বেশী মাত্রায় মনোগ্রাহী। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, তাঁর অন্যান্য সৃষ্টিকর্ম মূল্য হারালেও সঙ্গীত কালজয়ী গরিমা লাভ করবে। 

   

       "আজি হতে শতবর্ষ পরে

   কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি 

                কৌতূহলভরে 

       আজি হতে শতবর্ষ পরে!" 

    

রবীন্দ্রজন্মের পর পেরিয়ে গেছে দেড়শোটি বছর৷ সার্ধ শতবর্ষ পরেও কতটা প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্র সঙ্গীত? সে প্রশ্ন  জরুরি মনে হতেই পারে৷ কিন্তু এত বছর পেরিয়ে গেলেও আজও  মনে হয়না রবীন্দ্রসঙ্গীত তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে৷ বরং  বারেবারে বাঙালি মননকে ঋদ্ধ করছেন, আপ্লুত করছেন সেই রবীন্দ্রনাথ৷ লালন ফকির যাঁর প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘সত্যদ্রষ্টা বাউল৷'


রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিশীলতার নেশায় একের পর এক গান রচনা করেছেন এবং সেই গানের সুরও দিয়েছেন  তাৎক্ষণিক। কিন্তু যে মানুষটি রবীন্দ্রনাথের এই কালজয়ী সৃষ্টিকে সংরক্ষণ ক’রে অনাগত কালের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি শান্তিনিকেতনের সবার প্রিয়  "দিনু দা"  আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "সকল গানের ভাণ্ডারী"। তাঁর সম্বন্ধে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন…..


“তার (দিনেন্দ্রনাথ) চেষ্টা না থাকলে আমার গানের অধিকাংশই বিলুপ্ত হত। কেননা নিজের রচনা সম্বন্ধে আমার বিস্মরণ শক্তি অসাধারণ। আমার সুরগুলি রক্ষা করার এবং যোগ্য এমনকি অযোগ্য অপাত্রকে সমর্পণ করা তার যেন সাধনার বিষয় ছিল। তাতে তার কোন দিন ক্লান্তি ধৈর্যচ্যুতি হতে দেখিনি”।

        

শান্তিনিকেতনের সবার প্রিয়  "দিনু দা" আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "সকল গানের ভাণ্ডারী" দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন রবীন্দ্রনাথের জ্যৈষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্র নাথ ঠাকুরের পৌত্র অর্থাৎ দীপেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র। ১৮৮২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি তে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। 

       

প্রেসিডেন্সি কলেজের পাঠ সমাপ্ত করে ১৯০৪ সালে আইন নিয়ে পড়াশোনার জন্য লন্ডনে গেলেও পাঠ সমাপ্ত না করেই দেশে ফিরে আসেন... তখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পৌঁছে গেছেন জীবনের শেষ লগ্নে.. এসে গেছে "মেঘের পালা সাঙ্গ" করবার সময়। ১৯০৬ সালে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর আবার লন্ডনে যান.... কিন্তু প্রথাগত শিক্ষা কী বাঁধতে পারে এসব প্রতিভা কে!! ছকে বাঁধা জীবনে সৃষ্টিশীলতার ছন্দ কোথায়!!! আবার পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই ফিরে আসেন তবে এবার পাশ্চাত্য সঙ্গীতের তালিম নিয়ে এসেছেন বটে। 

     

সম্পর্কে নাতি হলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের। দিনেন্দ্রনাথ প্রায় বেশিরভাগ সময়ই রবীন্দ্রনাথের কাছাকাছি থাকতেন। রবীন্দ্রনাথ গান লিখে সেই গানে সুর দিলে দিনেন্দ্রনাথকে বলতেন শিখে নিতে। রবীন্দ্রনাথ সংশয়ে থাকতেন, গানের যে সুর তিনি করেছেন তা হয়তো তিনি ভুলে যাবেন! তাই তিনি এই বিষয়ে দিনেন্দ্রনাথের উপর ভরসা করতে ভালোবাসতেন। কবিকন্যা মীরা কথায়….

 "বাবা নতুন নতুন গান তৈরি করে তখনই দিনুকে ডেকে পাঠাতেন, পাছে সুর ভুলে যান।" জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে কবিগুরু এই বিষয়ে বলেছিলেন…. "আমার মুশকিল এই যে সুর দিয়ে আমি সব ভুলে যাই। দিনু কাছে থাকলে তাকে শিখিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ভুলতে পারি,।"

 

গান শেখার জন্য দিনেন্দ্রনাথের উৎসাহছিল অন্তহীন। একবার ডাক পেলেই হল….হাজির হতেন তখনই। এইভাবে একটু একটু করে রবীন্দ্রনাথের গানের বিশাল ভাণ্ডার নিজ আয়ত্তে নিয়ে আসেন দিনেন্দ্রনাথ। সেই কারণেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, তাঁর সকল গানের ভাণ্ডারি হচ্ছেন দিনেন্দ্রনাথ। নিজের উদ্যোগেই বেশিরভাগ রবীন্দ্র সঙ্গীতের স্বরলিপি তৈরী করেছিলেন এবং সেগুলি সংরক্ষণের উদ্যোগও গ্রহণ করেছিলেন। ২৫ বছর বিশ্বভারতীর সঙ্গীত শিক্ষকের ভূমিকা দায়িত্ব সহকারে পালন করেছিলেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য রবীন্দ্রনাথের গান কে "রবীন্দ্র সঙ্গীত" বলে তিনিই  পরিচিতি দেন। ভীমরাও শাস্ত্রী, নকুলেশ্বর গোস্বামী এবং দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্ত্বাবধানে শান্তিনিকেতনে গড়ে উঠেছিল সঙ্গীত ভবন। 


রবীন্দ্রনাথে ঠাকুরের বহু নাটকে অসামান্য অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর "ফাল্গুনী" নাটকের উৎসর্গ পত্রে তাঁকে…. 

"সেই বালকদলের সকল নাটের কাণ্ডারি, আমার সকল গানের ভাণ্ডারী"  আখ্যায় অভিহিত করেন। 


শান্তিনিকেতন ছিল দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাণ। তবু এই প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ, কবি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ দিকে একান্ত অপমানিত হয়েই বিশ্বভারতীর সাথে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে চলে এসেছিলেন।  এক্ষেত্রে কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খামখেয়ালী মন অনেকখানি দায়ী। 


জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শান্তিনিকেতনের শিশুদের স্মৃতিতে উদ্বেলিত ছিল তাঁর হৃদয়। ১৯৩৫ সালের ২১শে জুলাই অমৃত লোকে পাড়ি দেন এই মহান মানুষটি। 

              ………………. 



সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


Saturday, 4 November 2023

তুষারকান্তি ঘোষ এর গুচ্ছ কবিতা // ই-কোরাস ১৫৩

 



তুষারকান্তি ঘোষ এর গুচ্ছ কবিতা

১.

সময় ফুরিয়ে গেলে


সময় ফুরিয়ে গেলে সময় ফিরে আসে না আর


একদিন বাড়িটির চারদিক ঘিরেছিল হুলুদফুল আর সাদা কাশ

নিঝুমআলোয়  বাড়ির ভিতরে  ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যেত 

রাজহাঁস ডাকত পাশের পুকুরে 


একদিন জ‍্যোৎস্নারাতে বাড়িটির ছাদে তোমার শেষ খড়কুটোও সরিয়ে দিয়েছিল প্রেম


ডুবে মরব বলেই রোজ  দুপুরে তোমার কাছে আসতাম নদী পেরিয়ে  


সময় ফুরিয়ে  গেলে সময় ফিরে আসে না আর 


 সব কথা ও ছবি স্বপ্নে হাঁটে, মাঝদুপুরে ব‍্যাথায় বুক ছুঁয়ে থাকে সাদা  কাঞ্চনফুল

জমাট অন্ধকারে শূণ‍্য আকাশের নীচে হাহাকার ঘূর্ণিপাক খায় 


সময় ফুরিয়ে গেলে সময় ফিরে আসে না আর


২.

বেনুদিকে 


সবাই বলে তুমি নাকি ভুট্টাদানা ছড়িয়ে রাখো  ছাদে পাখি ধরবে বলে


পাখিরা আসে, তারা উপবাসী


তুমি একটি একটি পাখি ধরো, হাতের উপর বসাও, বুক ভরে গন্ধ নাও, তারপর ছেড়ে দাও উদাত্ত আকাশে


বেণুদি খিদে পেয়েছে খুব 


তোমার খেলার সংসারে কিছু ভুট্টাদানা রেখে দাও আমার জন‍্য 

তুমি তো জানো তোমার জন‍্যই পাখি হয়ে এতটা পথ উড়ে এসেছি 


৩.

স্বপ্ন


আসলে কিছুই হয়নি এতদিন

যে স্বপ্ন দ‍্যাখে তাকে আমি ঈর্ষা করি


কিছুদিন আগে চাঁদের উপর যে নামলো তার কোন প্রেম নেই, নেই কোন সহাস‍্য প্রেমিকা 


অতিলৌকিক চাঁদের আলোয় আমি কোনদিন ঘরসংসার করতে চাইনি 



৪.

তলিয়ে যাবার আগে


কি করে প্রচারবিমূখ থাকি বলো!


রাতে চন্দ্র চুরি করি

চুরি করি গুগুল থেকে ছবি


ভেবে অস্থির হই আমার কোন বিক্রয়মূল‍্য নেই বলে 


আমার হলুদরঙের বাড়িটি সবার সামনে তুলে ধরেছে আমার ক্লেদ, আমার অপবিত্রতা 


আজ আমি স্বপ্নেও অনাত্মীয়


আজকাল কোন মেঘ নীচু হয়ে এসে আমাকে আড়াল করে না 


দুঃখ এই,  যারা ভালোবাসার কথা বলত এতদিন 

পাতালে তলিয়ে যাবার আগে নতমুখ আমাকে বাঁচাতে  তাদের কেউ একবারের জন‍্যও হাত বাড়াল না!


৫.

ফিনিক্স পাখি


দেহাতি চাঁদ যখন দেখা দেয় অরণ‍্যের মাথায় 

আমার ভালোবাসার গভীরতা মায়াঘাস হয়ে জেগে থাকে 


 বেড়ি পরালে আমি নদী জলশূণ‍্য করে দেব 


 সহজিয়া আঁধার পেরিয়ে আসবে আলো ও হাওয়া


সবকিছুর রূপ বদলে যাবে 

 অভিমানে নতমুখ থাকব না , ফিনিষ্ক-পাখির মত পুড়ে গিয়েও ফিরে আসব  আবার 


সাজানো কালবেলা পেরিয়ে সমস্ত নাশকতা সামলে এবারের রতিক্রিয়া হবে আকাশের নীচে বাধা বন্ধন হীন


দহন যতই হোক এভাবেই  ফিনিষ্কপাখি  তার প্রেম ফিরে পাবে গভীর গভীরতায় 

              …………………… 


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ১০

  গ্রামীণ গাজন উৎসব, দাসপুর ২ বঙ্কিম মাজী  বাংলায় গাজন উৎসব শব্দের অর্থ গ্রামের জনসাধারণের উৎসব। এই উৎসবে যারা অংশগ্রহণ করেন আমাদের গ্রামীণ...