Tuesday, 31 March 2026

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৫

 


গাজনের গর্জনে ভুবনেশ্বর : এক প্রাচীন উৎসবের আখ্যান

বিশ্বজিৎ ভৌমিক 


বাংলার লোকসংস্কৃতির মানচিত্রে রাঢ় অঞ্চল এক আদিম ও অকৃত্রিম জনপদ, যেখানে কংসাবতী বা স্থানীয়দের প্রাণের নদী 'কাসাই' তার আপন ছন্দে বয়ে চলে। এই কাসাই নদীর দুই কূলে যখন চৈত্র শেষের তপ্ত বাতাস বইতে শুরু করে, তখন রুক্ষ লাল মাটিতে কান পাতলে শোনা যায় এক উন্মাদনার প্রতিধ্বনি। এটি গাজনের সুর—যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক অবিনাশী লোক-উৎসবের গর্জন। ‘গাজন’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। কেউ বলেন ‘গা’ অর্থাৎ গ্রাম আর ‘জন’ অর্থাৎ জনগণ- যা আসলে জনপদের উৎসব। আবার কেউ বলেন ‘গর্জন’ থেকে গাজন, যেখানে আর্তনাদ আর ভক্তির এক অদ্ভুত মিলন ঘটে। কাসাই পাড়ের এই গাজন মূলত চৈত্র সংক্রান্তির রৌদ্রদগ্ধ দুপুরে শুরু হওয়া এক আদিম উপাখ্যান, যেখানে জাত-পাত, উঁচু-নিচু সব বিভেদ ধুয়ে মুছে একাকার হয়ে যায় শিবের চরণে। 'গাজন' শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে মতান্তর থাকলেও, লোকমুখে এটি 'গর্জনে'রই নামান্তর; যেখানে ভক্তের আর্তনাদ, শিবের আরাধনা আর প্রকৃতির রুদ্ররূপ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। যা  এই অঞ্চলের অন্ত্যজ, শ্রমজীবী মানুষের আত্মদান ও ত্যাগের এক লৌকিক আখ্যান।

প্রখর গ্রীষ্মে যখন ধরিত্রী তৃষ্ণার্ত, যখন কাসাইয়ের বুক চড়া পড়ে ধুধু করে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়ালে দেখা যায় লোকসংস্কৃতির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এখানে মহাদেব বা 'বুড়ো শিব' কোনো মন্দিরের বদ্ধ ঈশ্বর নন, বরং তিনি কাসাই পাড়ের কৃষকের পরমাত্মীয়, যার কাছে চৈত্র সংক্রান্তির এই বিশেষ তিথিতে ভক্তরা নিজেদের শরীর ও মনকে সঁপে দেয়। কাসাই নদীর জল ছুঁয়ে শুরু হওয়া এই গাজন উৎসবের মূলে রয়েছে বৌদ্ধ তান্ত্রিকতা, শৈব সাধনা এবং আদিবাসী সংস্কৃতির এক প্রাচীন রসায়ন। শহরকেন্দ্রিক আধুনিকতার চাকচিক্য যখন সবকিছুকে গ্রাস করছে, তখনও কাসাইয়ের কূলে কূলে শিবের গাজন তার আদিমতা নিয়ে টিকে আছে। শ্মশানের ছাই মেখে, নীলকণ্ঠের নাম জপে, কাঁটা ঝাঁপ কিংবা বান ফোঁড়ানোর মতো দুঃসাহসিক কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা যেন জীবনের চরম সত্যকেই অন্বেষণ করতে চায়। এই গাজন কোনো ড্রয়িংরুমের শোপিস নয়, বরং কাসাই নদীর পলিমাটিতে মিশে থাকা ঘাম আর রক্তে লেখা এক জীবন্ত ইতিহাস। চলুন সেই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে পাথেয় করে আমাদের এলাকার কাঁসাই পাড়ের কিছু সুপ্রাচীন গাজন উৎসব সম্পর্কে আলোচনা করা যাক।

প্রথমেই আসি দেবকুল গ্রামের বহু প্রাচীন একটি শিব মন্দিরের গাজন উৎসব ও মন্দির সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায়...

শ্রী শ্রী ভুবনেশ্বর জীউ (শিব ঠাকুর) :

(চর্তু‌ঃসীমা : দক্ষিণ দিকে - বাড়কাশিমপুর গ্রাম, উত্তর দিকে - মাছগেড়িয়া গ্রাম, পূর্ব দিকে - জগন্নাথবাটি গ্রাম, পশ্চিম দিকে - বৃন্দাবনপুর গ্রাম)। মন্দিরের নাম 'ভুবনেশ্বর' হলেও মন্দিরটি দেবকুল গ্রামে অবস্থিত। কথিত আছে গ্রামটি গড়ে ওঠা বা নামকরণের বহু পূর্বেই এই মন্দিরের স্থাপনা হয়। এই গ্রাম এলাকার বেশিরভাগ জায়গা বা সম্পত্তি দেবতার নামেই ছিল। পরবর্তীতে বর্ধমান রাজাদের শাসনকালে এই মন্দিরের কাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনের হাতে সম্পত্তির অংশ চাষবাসের জন্য তুলে দেওয়া হয়। যখন এলাকায় গ্রাম গঠন করা হয়েছে তখন যেহেতু এলাকাটি দেবতার জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল তাই দেবতার কূল থেকেই এই গ্রামটির নাম দেবকুল হয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন করেন যেহেতু প্রথমে এই মন্দিরের আকৃতি দেউল মন্দির হিসেবে ছিল তাই সেখান থেকেই দেবকুল গ্রামের নামকরণ হয়েছে। 

যাই হোক ঐতিহ্যের ক্যানভাসে দেবকুলের ভুবনেশ্বর গাজন বাংলার লোকসংস্কৃতির এক প্রাণবন্ত অধ্যায় হলো গাজন উৎসব। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার দাসপুর থানার অন্তর্গত হাট সরবেড়িয়া পোষ্ট অফিসের দেবকুল গ্রাম এই ঐতিহ্যের এক সগৌরব বাহক। এখানকার প্রাচীন ভুবনেশ্বর শিব মন্দিরকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে যে গাজন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, তা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং শৌর্য, ভক্তি এবং লৌকিক বিশ্বাসের এক অনন্য মহামিলন। ঘাটাল মহকুমার এই জনপদে ভুবনেশ্বর মহাদেব কেবল বিগ্রহ নন, তিনি গ্রামবাসীর পরম নির্ভরতার প্রতীক। চৈত্র মাসের তপ্ত দ্বিপ্রহরে যখন গ্রাম বাংলার আকাশ-বাতাস ‘বম বম ভোলানাথ’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়, তখন দেবকুল গ্রাম যেন এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। কঠোর কৃচ্ছসাধন, উপবাস এবং লৌকিক আচারের মধ্য দিয়ে ‘ভক্ত্যারা’ যেভাবে নিজেদের উৎসর্গ করেন, তা এই অঞ্চলের লড়াকু মানসিকতা ও আধ্যাত্মিক চেতনারই বহিঃপ্রকাশ।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগেও দেবকুলের ভুবনেশ্বর শিব মন্দিরের গাজন তার নিজস্ব গরিমা ও গ্রামীণ সংহতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই উৎসব একদিকে যেমন লৌকিক ইতিহাসের সাক্ষী, অন্যদিকে মেদিনীপুরের লোকশিল্প ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল। লোকশ্রুতি ও প্রবীণ মানুষজনের এই মন্দিরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায় মন্দিরের যে বিগ্রহ দেবতা অর্থাৎ শিবলিঙ্গটি মানুষ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং স্বয়ং মাটি ফুঁড়ে আবির্ভূত হয়েছেন। শিবলিঙ্গের ধরনটিও অন্যান্যদের থেকে আলাদা। তাই এটিকে 'স্বয়ম্ভু শিবলিঙ্গ' বলে উল্লেখ করা হয়। আনুমানিক ৫০০ বৎসরের প্রাচীন এই মন্দিরের প্রাথমিক নির্মাণ শৈলী ছিল দেউল মন্দির হিসেবে, পরবর্তী কালে সংস্করণ করে এটিকে চাঁদনী মন্দিরের রূপ দেওয়া হয়। মন্দিরের বর্তমান রূপটি আমরা দেখতে পাই সেটি পূর্ব মেদিনীপুর থেকে আগত এবং অন্যান্য কিছু স্থানের মিস্ত্রী দ্বারা ২০১০ সালে নির্মিত হয়েছে এবং সুদক্ষ ভাবে অলংকরণ করেছেন নাড়াজোলের এক প্রতিমা শিল্পী সুব্রত দাস ও তার সহযোগীরা।

সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ সাত দিন এখানে গাজন উৎসব সম্পন্ন হয়। মন্দিরটি পাঁচ ভোগের মন্দির। তবে বিশেষ কোন চাপ নেই যে সন্ন্যাসীদের এই ৭ দিন ধরেই বাবার সেবায় নিয়োজিত থাকতে হবে। তবে নিজের নিজের ক্ষমতা ও সুবিধা অনুযায়ী শেষ পাঁচ বা তিন দিন এই কৃচ্ছ্রসাধনের অধিকার রয়েছে। প্রতিবারই এলাকার ৫০ জনের অধিক মানুষ ভোক্ত্যা বা সন্ন্যাসী থাকেন এরমধ্যে প্রচুর সংখ্যক মহিলা সন্ন্যাসী প্রত্যক্ষ করা যায়। পরম্পরা ও বংশানুক্রমিকভাবে পাট ভোক্ত্যা হিসেবে মাজী বংশ এবং দেউল ভোক্ত্যা হিসেবে মূলা বংশের লোক নিযুক্ত থাকে।

এই মন্দিরের গাজন উৎসবের একটি বিশেষ আচার বা রীতি হলো গাজনের শুরুতে মন্দিরের সেবাইত বা পুরোহিত একটি মাগুর মাছের মাথায় তেল, সিন্দুর লাগিয়ে মন্ত্রপাঠ করে বলি দেন। তারপর গাজনের অন্যান্য আনুষঙ্গিক অর্চনা ও পূজা পাট শুরু হয়। এবং শেষ দিন এক‌ইভাবে এই রীতি অনুযায়ী অর্থাৎ মাগুর মাছ বলি দিয়েই সমস্ত আচার অনুষ্ঠান শেষ হয়। এছাড়াও অন্যান্য মন্দিরের গাজন উৎসবের মতো হিন্দোলা, কাঁটাগড়ানো এই দুটি মূল আচার‌ও লক্ষ্যনীয়।

এখানকার গাজন উৎসবের এক অত্যন্ত ভক্তিপূর্ণ ও মাঙ্গলিক অধ্যায় হলো ‘নীল পূজা’ বা ‘নীল ষষ্ঠী’ এলাকার এই উৎসব জলঢালা নামে পরিচিত। দেবকুল গ্রামের ভুবনেশ্বর শিব মন্দিরে এই দিনটি এক বিশেষ মর্যাদা পায়। লৌকিক বিশ্বাস মতে, নীল পরমেশ্বর শিবের এবং নীলমণি বা নীলচণ্ডিকা দেবী দুর্গার প্রতীক। এই দিনেই মহাদেব ও দেবী চণ্ডিকার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল বলে ভক্তরা বিশ্বাস করেন। দেবকুল ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের মায়েরা তাদের সন্তানদের বা স্বামী ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় এই দিন নির্জলা উপবাস রাখেন। শুধু মায়েরা নয় অনেক পুরুষ ব্রতীও এই উপবাস করেন। উপবাসের পর ভুবনেশ্বর জীউ শিবের মাথায় জল ঢালেন এবং মন্দিরের পুরোহিত তাদের হাতে সাদা সুতো বেঁধে দেন। 'সন্তানের আয়ু যেন পাথরের মতো শক্ত হয়'—এই কামনাই থাকে নীল পূজার মূল ভিত্তি।

কাঁসর, ঘণ্টা আর ঢাকের আওয়াজে দেবকুল গ্রামের প্রতিটি অলিগলি মুখরিত হয়ে ওঠে। গৃহস্থ বধূরা ভক্তিভরে নীলের চরণে তেল-সিঁদুর অর্পণ করেন। সন্ধ্যার আকাশ যখন গোধূলির রঙে রাঙায়, তখন ভুবনেশ্বর শিব মন্দিরের চত্বরে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। শত শত মা ও বোনদের হাতের প্রদীপের আলোয় মন্দির প্রাঙ্গণ এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শিবের মাথায় ডাব বা গঙ্গার জল ঢালার দৃশ্যটি ভক্তি ও নিষ্ঠার এক পরম নিদর্শন। নীল পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি গ্রামীণ বাংলার সামাজিক মেলবন্ধনের প্রতীক। এই দিনটিতে জাতপাত নির্বিশেষে গ্রামের মানুষ ভুবনেশ্বর শিবের চরণে প্রণত হন। এটি ত্যাগের মাধ্যমে মঙ্গলের আবাহন করার এক চিরন্তন উৎসব।

এবার আসি এই গাজন কে কেন্দ্র অনুষ্ঠিত মেলার বিষয়ে। বর্তমানে এই মেলা অনেক বেশি বাণিজ্যিক ও আধুনিক হলেও, শতাব্দী প্রাচীন এই মেলার রূপ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগেকার মেলাটি আজকের মতো আলোকসজ্জায় ঝলমলে ছিল না। বিজলি বাতির বদলে হ্যাজাক লাইট বা মশাল ব্যবহার করা হতো। মন্দির বা সংলগ্ন এলাকাগুলোতে তখন এত ভিড় থাকলেও তার মধ্যে একটা শান্ত, গ্রাম্য ভাব ছিল। মানুষ পায়ে হেঁটে বা গরুর গাড়িতে করে দূর-দূরান্ত থেকে মেলায় আসত। বিনোদন বলতে সারারাত ধরে পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে যাত্রা বা পালাগান চলত। সন্ন্যাসীরা শিবের মহিমা গেয়ে বেড়াতেন। আবার মাঝে মাঝেই তাদের গলায় শোনা যেত "হিন্দোলের চরণে সেবো— মহাদেব!"

মেলার বাজার ছিল মূলত গৃহস্থালির প্রয়োজনে। আধুনিক প্লাস্টিকের খেলনার বদলে পাওয়া যেত: মাটির পুতুল, কাঠের খেলনা এবং বাঁশের তৈরি জিনিস। এখানে পাশাপশি দুটি গ্রাম দাদপুর ও সামাটবেড়িয়ার প্রচুর কুমোর মাটির বাসনপত্র, কলসি, হাঁড়ি ইত্যাদি নিয়ে বসতো। এখানে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হতো মুড়ি ভাজার পোড়া মাটির খাপরি। এছাড়াও পাওয়া যেত কামারদের তৈরি লোহার দা, বঁটি বা চাষাবাদের সরঞ্জাম।

স্থানীয় খাবার যেমন— এখানকার প্রচলিত একটি বিশেষ খাবার ছিল পেটাই পরটা ও ঘুগনি। যা এখনও এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ।

কালের নিয়মে মেলায় অনেক আধুনিকতা এলেও দেবকুলের গাজন তার নিজস্বতা হারায়নি। বর্তমান মেলার প্রধান দিকগুলো হলো বর্তমানে ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি মেলা প্রাঙ্গণে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যাত্রাপালা, বাউল গান এবং স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গীতানুষ্ঠান মেলাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। মেলা উপলক্ষে দাসপুর ও সংলগ্ন অঞ্চলের মৃৎশিল্পী এবং কুটির শিল্পীদের সমাগম ঘটে। মাটির হাড়ি-কুঁড়ি থেকে শুরু করে কাঠের আসবাবপত্র এবং শিশুদের খেলনার এক বিশাল বাজার বসে এখানে। দেবকুলের এই মেলা কেবল হিন্দুদের উৎসব নয়; জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দাসপুর এলাকার সমস্ত মানুষ এই মেলায় শামিল হন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

বর্তমানে যুগে রকমারি চাইনিজ ও অন্যান্য খাবার বিশেষভাবে সমাদৃত হলেও মেলার প্রধান আকর্ষণ হল কিন্তু সেই আগের জিলিপি, গজা এবং স্থানীয় মিষ্টির দোকান। তাই গরম জিলিপি আর পাপড় ভাজা ছাড়া এখানকার গাজন মেলা আজও অসম্পূর্ণ।

সবশেষে আসি মেলা পরিচালনার কথায়, প্রাথমিক পর্যায়ে মেলা পরিচালনার সমস্ত দিকটিই মন্দিরের সেবাইত দ্বারা পরিচালিত হতো, বর্তমান এক সেবাইত বংশধর ভূবন চক্রবর্ত্তীর কথায় তারা অষ্টম পুরুষ হিসেবে এই কাজে নিযুক্ত। কিন্তু বর্তমানে মেলা এবং এর আয়োজন বৃহত আকার ধারণ করায় মেলাটি পাঁচটি গ্রামের মানুষ দ্বারা তৈরী করা কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়। গ্রামগুলি হলো দেবকুল, মাজগেড়িয়া, বৃন্দাবনপুর, বাড়কাশিমপুর ও আংশিক জগন্নাথবাটী। মেলা কমিটির বর্তমান সভাপতি - সুবল চন্দ্র দুয়ারী (দেবকুল গ্রাম), বর্তমান সম্পাদক - সুধীর চন্দ্র মন্ডল (বাড়কাশিমপুর)। বর্তমান গাজন মেলাটি ১০ দিন যাবত চলে।

মন্দিরের বর্তমান অবস্থা খুবই ভালো। কিন্তু আটচালাটি অনেক পুরাতন ও ভগ্নপ্রায়, যদিও এটি পুনঃ নির্মাণ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো এই মন্দির নির্মাণ কার্যে যারা অর্থ দান করেছেন সকলের নাম মার্বেল পাথরের উপর খোদাই করা রয়েছে মন্দিরের মেঝেতে। মন্দিরের চারপাশটি বেশ সাজানো গোছানো পার্কের মতো।

গাজন উৎসবের সমাপ্তি ঘটে কৃচ্ছ্রসাধনের চরম শিখরে পৌঁছে। ভক্তদের এই দেহজ কৃচ্ছ্রসাধন আসলে অহংকার বিনাশ ও ত্যাগের প্রতীক। ভুবনেশ্বর মহাদেবকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই মেলা ও উৎসব গ্রামবাংলার প্রান্তিক মানুষের জীবনদর্শনকে তুলে ধরে। লৌকিক দেবতার প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর লৌকিক আচারের এই অদ্ভুত মিশেল গাজনকে এক অনন্য উচ্চতা প্রদান করেছে। উৎসব শেষে ভক্তরা যখন সাধারণ জীবনে ফিরে যান, তখন তাঁদের অন্তরে থেকে যায় আগামী বছরের প্রতীক্ষা আর এক অনাবিল আধ্যাত্মিক প্রশান্তি। সবশেষে বলি আমরা মন চাইলেই আসতে পারি লোকসংস্কৃতির এই প্রাচীন মেলায়।


তথ্য ঋণ : 

১. ভুবন চক্রবর্তী (সেবাইত)

২. মহাদেব চক্রবর্তী (সেবাইত)

৩. শম্ভুনাথ চক্রবর্তী (সেবাইত)

 এছাড়াও এলাকার বিভিন্ন প্রবীণ মানুষজন

চিত্র‌ ঋণ : সোনাক্ষী পোড়্যা ও কিছু নিজস্ব চিত্র।


সম্পাদক - দুঃখানন্দ মণ্ডল

সহ সম্পাদক - শ্রীজিৎ জানা

কথা - ৯৪৩৪৪৫৩৬১৪


No comments:

Post a Comment

পশ্চিম মেদিনীপুরের গাজন ও গাজন মেলা - পর্ব ৫

  গাজনের গর্জনে ভুবনেশ্বর : এক প্রাচীন উৎসবের আখ্যান বিশ্বজিৎ ভৌমিক  বাংলার লোকসংস্কৃতির মানচিত্রে রাঢ় অঞ্চল এক আদিম ও অকৃত্রিম জনপদ, যেখানে...